ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: প্রয়োজন ‘কালো দিবস’ স্বীকৃতি

শেখ রফিকুন্নবি সাথী৭৫ এর ১৫ আগস্টে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের জন্য জাতি হিসেবে আমরা শোকাহত হই, লজ্জিত হই। ঠিক তেমনি আরেকটি লজ্জার ইতিহাস তৈরি হয়েছিল ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসে।  এ মাসেই অনুষ্ঠিত হওয়া সংসদের প্রথম অধিবেশনে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার জাতীয় সংসদকে ব্যবহার করে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত অবৈধ সামরিক সরকারের সমস্ত বর্বর, অন্যায্য কাজের বৈধতা আদায় করে নেয় সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী পাস করানোর মাধ্যমে।

বিশ্বব্যাপী মানুষের অধিকারের কথা বলার জন্য যে সংসদ ব্যবহার হয়, বাংলাদেশে সেই সংসদকে ব্যবহার করা হয়েছিল অধিকার হরণ করার কাজে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা হত্যার বিচার বন্ধ করার অধ্যাদেশ ইতিহাসের বর্বরোচিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সংবিধানের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে জাতীয় সংসদকে ব্যবহার করা হয়েছিল।

জাতীয় সংসদকে ব্যবহার করে বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয় ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকাণ্ডের এবং জিয়াউর রহমানের সামরিক আদালতে বিনা বিচারে সহস্রাধিক সৈনিক হত্যার।

৫ এপ্রিল অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের যে দিনটি কুখ্যাত পঞ্চম সংশোধনী বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস হয় সেই দিনটি শুধু আমাদের দেশের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ নয় বরং সারা বিশ্বের জন্যই ৫ এপ্রিলে পাস হওয়া পঞ্চম সংশোধনী তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সর্বোচ্চ অপব্যবহারের মাধ্যমে পঞ্চম  সংশোধনীর দ্বারা বিচার প্রার্থীর বিচার চাওয়ার পথ রুদ্ধ করাকে আইনি বৈধতা দিয়েছিল জাতির সর্বোচ্চ ফোরাম জাতীয় সংসদ। এরকম একটা ঘটনা নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য কলংকের।

কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত কমওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ শাখার সভাপতি বর্তমান স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এমপি। এছাড়া বাংলাদেশ  ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সদস্য এবং গত কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশের সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী। এই দুই আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ প্রস্তাব রাখতে পারে ৫ এপ্রিলকে সারা বিশ্বের পার্লামেন্ট ‘কালো দিবস’ হিসেবে পালন করবে এবং এর জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের পদক্ষেপ নিতে পারে। এতে করে সারা বিশ্ব জানতে পারবে কীভাবে জিয়াউর রহমান ও তার সরকার গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে, কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের মাধ্যমে অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে, কীভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথকে রুদ্ধ করেছে। এবিষয়ে বিশ্বকে সচেতন করতে  জাতিসংঘের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য নিয়মানুযায়ী রাষ্ট্রকেই কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হয়। এধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের সাফল্যের ঝুলিতে যোগ হয় এক অনন্য অর্জন। বাঙালির চেতনার প্রতীক, ভাষার জন্য আত্মত্যাগের দিন মহান একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভের জন্য প্রবাসী কয়েকজন বাংলাদেশিদের উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে ইউনেস্কোর মাধ্যমে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ এর পূর্ণ স্বীকৃতি আদায় সম্ভব হয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে।

জাতিসংঘের সেই স্বীকৃতির পর থেকে পৃথিবীর নানা ভাষাভাষী মানুষ দিনটি পালন করছে। আমাদের আরেকটি বড় অর্জন ১৯৭১ এর ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণকে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেসকো কর্তৃক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি আদায়।

পৃথিবীর বহু দেশে রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, রাজিব গান্ধী, চিলির আলেন্দে, পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান বেনজির ভুট্টো, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট বন্দর নায়েককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও বিচার বন্ধ করার কোনও অধ্যাদেশ জারি হয়নি। পৃথিবীর কোনও পার্লামেন্টে এমন কোনও আইন করা হয়নি যে আইন হত্যার বিচার না হওয়াকে বৈধতা দেয়। খোন্দকার মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেওয়া না হলে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেত। জিয়াউর রহমানই ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, ভবিষ্যতে কেউ যাতে ব্যবস্থা না নিতে পারে সে সুযোগ করে দিলেন এবং ওই সময়ে একটি প্রোপাগন্ডা ছড়িয়ে গেলো যে, যেহেতু এটি সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে এটি আর পরিবর্তন হবে না। এই আইনের মাধ্যমে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেওয়া হয়েছিল। মানুষের মনে এই ধারণার জন্ম দেওয়া হয়েছিল যে, খুন করেও পার পাওয়া যায় শক্তির জোরে। সমাজকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা এবং মন্দ থেকে রক্ষার যে স্বাভাবিক উদ্দেশ্য থাকে আইনের, তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল এই কালো আইন।

প্রাচীন যাজক যুগ এর চিন্তাবিদ ও দার্শনিক  সেন্ট অগাস্টিনের একটা বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে ‘an unjust law is not a law at all’ অর্থাৎ ‘যে আইন অন্যায্য, সেটা কোনও আইন নয়’।

সারা জীবন বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে ও কৃষ্ণাঙ্গদের সমঅধিকার আদায়ে লড়াই করে যাওয়া বিখ্যাত মানবাধিকার নেতা মার্টিন লুথার কিং তার বিখ্যাত ‘লেটার ফ্রম বার্মিংহাম জেল’ লেখাতে এই উক্তির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন। পঞ্চম সংশোধনীর মতো অন্যায্য আইনকে ২০১০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছে। তবে শুধু অবৈধ ঘোষণার মধ্যে  সীমাবদ্ধ না থেকে সারা বিশ্বের পার্লামেন্টের জন্য ৫ এপ্রিলকে ‘কালো দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।

১৯৭৯ সালের ১ এপ্রিল বসে সংসদের প্রথম অধিবেশন। ৪ এপ্রিল যেদিন জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন  সরকারের  প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান সংসদে পঞ্চম সংশোধনী বিলটি উত্থাপন করেন সেদিন যথাযথ নিয়ম না মেনে বিলটি সংসদে আনার বিরোধিতা করে ৪৫ জন সাংসদ ‘না’ ভোট দেয়। পরবর্তীতে কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে ৫ এপ্রিল বিলটি পাস করার জন্য সংসদে উত্থাপন করা হয় এবং পঞ্চম সংশোধনী পাস করিয়ে নেয়। বিল নিয়ে সংসদে বিতর্কের সময় তৎকালীন সাংসদ শাহজাহান সিরাজ এই বিলের বিরোধিতা করে একে ‘কালা কানুন’ বলে অভিহিত করেন। এছাড়াও জনাব রাশেদ খান মেনন, আসাদুজ্জামান খান সহ আরও অনেকেই একে ‘কালো আইন’ বলে অভিহিত করেন এবং এই সংশোধনীকে দেশের জন্য অমঙ্গলজনক হিসেবে চিহ্নিত করেন।

খুলনা-৪ আসনের সাংসদ জনাব আব্দুল লতিফ খান বলেন– ‘আজকের দিনে আমরা কি পাস করতে যাচ্ছি তা আমরা জানি না, আমার মনে হয় হাউসের কোনও মেম্বার তা বলতে পারবে না। যদি পাঠশালার মতো করে জিজ্ঞেস করা হয় ১৫ আগস্ট থেকে আজ পর্যন্ত জিয়াউর রহমান, চীফ ল’ এডমিনিস্ট্রেটর কী কী আইন promulgate (জারি করা) করেছেন তার নাম কেউ বলতে পারবেন না।

আজকের দিনে এখানে কী আছে, জানি না। এক লাইনে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।  এ পর্যন্ত যা হয়েছে সব পাস। কারণ, আমরা জানতে পারবো না, এর ভেতরে কী আছে। নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে, যা জানা হলে সরকারি দলের অনেক সদস্য তার সমালোচনা করতেন।’

বাখরগঞ্জ-১৭ আসনের সাংসদ জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সেইদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পর যে অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছিল, বেয়োনেটের মাথায় কাউকে বঙ্গভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কাউকে জেলের ভেতর নেওয়া হয়েছিল, কাউকে ক্যান্টনমেন্ট নেওয়া হয়েছিল। আজকে যে অবস্থায় আমার মাননীয় সংসদ নেতা এই বিল পাস করতে যাচ্ছেন, তখনকার অবস্থাও ছিল ঠিক অনুরুপ।

আজকে এই আইন পাস হলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর তার তদন্ত হবে না, বিচার হবে না বলে যে আইন হয়েছে সেটাই বহাল থেকে যাবে।

যাদের পরিচালনায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে, বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে  সেই জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান তাদের হত্যার বিচার করা যাবে না।’

বাখরগঞ্জ-৩ আসনের সাংসদ জনাব মো. নজরুল ইসলাম এম.এ বলেন,  ‘মাননীয় স্পিকার সাহেব, আজকে দাবি করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আমরা এই সার্বভৌম সংসদে এসে পঞ্চম সংশোধনী সম্পর্কে যখন আলোচনা করছি, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করে যাচ্ছি যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে আজ পর্যন্ত যে আইনগুলো বা অর্ডিন্যান্স গুলি chief Martial law administrator সাহেব জারি করেছেন, সেই সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।

আমি এখানে শুধু প্রশ্ন রাখতে চাই, যদি আমরা এর প্রত্যেকটা আইন না জানি, না বুঝি, কেমন করে আমরা সে সম্পর্কে পরিষ্কার ভাষায় মতামত দিতে পারি। যদি আজকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এই বিল পাস হয়ে যায়, তাহলে আমরা কি একথা মনে করতে পারি না যে, আমাদের সার্বভৌমত্ব, পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হচ্ছে? আমরা কি একথা বলতে পারি না যে, সার্বভৌম পার্লামেন্টের উদ্দেশ্য থাকে Welfare state সৃষ্টি করা। যদি এধরনের আইন সৃষ্টি করে আমাদেরকে না জানিয়ে তা পাস করা হয়, তাহলে আমার মনে হয়, আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত এসে যাচ্ছে’।

এই বিলের  প্রস্তাবকারী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী  শাহ আজিজুর রহমান এবং উপপ্রধানমন্ত্রী  মওদুদ আহমেদ এই সংশোধনী বিলের পক্ষে দীর্ঘ বক্তৃতা করেন। শাহ আজিজুর রহমান  বলেন, ‘পঞ্চম সংশোধনীর উদ্দেশ্য হচ্ছে গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, জনগণের মৌলিক অধিকার।’

অথচ এই সংশোধনী জাতির পিতাকে হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করার অধ্যাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া সহ আরও অসংখ্য বর্বর হত্যাকাণ্ড, নির্যাতনের বিচার না হওয়ার পথকে প্রশস্ত করেছিল।

সরকারি দলের নেতা ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেছেন। এ কথার প্রসঙ্গে কুমিল্লা -৩ আসনের সাংসদ জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী প্রশ্ন তোলেন, ৭ নভেম্বরের আগে ১৫ আগস্ট থেকে মার্শাল ল’ র অধীনে হয়ে যাওয়া সমস্ত অন্যায়, নির্যাতন, জুলুমকে কেন legal cover দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন,  ‘আমি দুঃখিত যে, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে মানুষের আপিল শোনার যে অধিকার সেটা একটা আইনের মাধ্যমে নিয়ে যাচ্ছেন, আবার বলছেন আপনি গণতন্ত্র দিবেন’। এভাবেই ন্যায্য বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার নষ্ট করাকে তারা নাম দিয়েছিল মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ। এবং এই মৌলিক অধিকার হরণের আইন সংসদে পাস হয়ে পরবর্তীতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাক্ষরে অনুমোদিত হয়।

লেখক: সদস্য, জাতীয় পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ।