পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও স্থিতিশীলতার প্রশ্ন

কে বি এম মঈন উদ্দিন চিশতী
২৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’-এর খসড়া সংশোধনী প্রকাশ করে এ বিষয়ে অংশীজনদের মতামত আহ্বান করেছে। জনমত গ্রহণ একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে খসড়া সংশোধনীর কয়েকটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে পুঁজিবাজারে, বিশেষ করে সাধারণ বিমা খাতে, উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ফলে এসব প্রস্তাব নতুন করে বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।

টিটিএম ইপিএস কি অধিক বাস্তবসম্মত নয়

খসড়ায় সর্বশেষ নিরীক্ষিত বার্ষিক ইপিএসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাজার বাস্তবতায় একটি কোম্পানির সাম্প্রতিক আর্থিক অবস্থার যথার্থ প্রতিফলন পাওয়া যায় ট্রেইলিং টুয়েলভ মান্থস (টিটিএম) ইপিএসে। শুধু সর্বশেষ বার্ষিক ইপিএস বিবেচনা করলে অনেক কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটে না। পাশাপাশি বাজারের স্বাভাবিক প্রাইস ডিসকভারি প্রক্রিয়াও ব্যাহত হতে পারে। তাই মার্জিন সুবিধা নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে টিটিএম ইপিএস বিবেচনা করা অধিকতর যৌক্তিক।

সাধারণ বিমা খাতের প্রতি বৈষম্য কেন?

খসড়ায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বুক ভ্যালুর তিন গুণ পর্যন্ত মার্জিন সুবিধা রাখা হলেও সাধারণ বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে তা মাত্র এক গুণ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই বৈষম্যের পেছনে কী তথ্যভিত্তিক যুক্তি রয়েছে?

কোনও খাতকে অন্য খাতের তুলনায় ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হলে তার পক্ষে একটি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট, রেগুলেটরি ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (আরআইএ) বা অন্য কোনও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ থাকা উচিত। কিন্তু খসড়ায় এমন কোনও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে এই বৈষম্য নিয়ে বাজারে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও এসএমই কোম্পানির বিষয়েও পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন

লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান মার্জিন অনুপাত বহাল রাখলে বিধিমালা সহজীকরণের লক্ষ্য পূরণ হবে না। একইভাবে এসএমই বোর্ডের সব কোম্পানিকে একযোগে মার্জিন সুবিধার বাইরে রাখার পরিবর্তে আর্থিক সক্ষমতা, করপোরেট গভর্ন্যান্স, টিটিএম ইপিএস এবং তারল্যের ভিত্তিতে যোগ্য কোম্পানিগুলোকে শর্তসাপেক্ষে মার্জিন সুবিধার আওতায় আনা যেতে পারে।

খসড়া প্রকাশের সময় নিয়েও প্রশ্ন

এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত খসড়া লেনদেন চলাকালীন প্রকাশ করায় বাজারে তাৎক্ষণিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারী অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। এর ফলে বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়েছে এবং ইনফরমেশন অ্যাসিমেট্রি সৃষ্টি হয়েছে।

ভবিষ্যতে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত বাজার বন্ধ হওয়ার পর প্রকাশ করা হলে অপ্রয়োজনীয় অস্থিরতা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হবে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ফোর্সড সেল ঝুঁকি

খসড়া সংশোধনী প্রকাশের পর থেকেই সাধারণ বিমা কোম্পানির শেয়ারসমূহে উল্লেখযোগ্য বিক্রির চাপ ও মূল্যপতন লক্ষ করা যাচ্ছে। যদি এই পরিস্থিতি মতামত গ্রহণের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, তাহলে বহু মার্জিন বিনিয়োগকারীর শেয়ার ফোর্সড সেল-এর আওতায় চলে যেতে পারে। এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে।

যদি পরবর্তী সময়ে কমিশন অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে খসড়া সংশোধন করে, তাহলে ইতোমধ্যে ফোর্সড সেলের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি কীভাবে পূরণ হবে?

এই ক্ষতি একবার হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে এমন কোনও পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া উচিত নয়, যাতে বিনিয়োগকারীরা অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হন।

জনমত গ্রহণ কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা

কোনও খসড়া বিধিমালার উপর জনমত আহ্বানের উদ্দেশ্য হলো অংশীজনদের মতামত বিবেচনা করে একটি উন্নত ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করা।

কিন্তু যদি মতামত গ্রহণ চলাকালীন সময়েই বাজারে বড় ধরনের মূল্যপতন ঘটে, ফোর্সড সেল হয় এবং বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাহলে জনমত গ্রহণের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়।

আরও অংশগ্রহণমূলক নীতিনির্ধারণ প্রয়োজন

বর্তমান খসড়া প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাজারের সব অংশীজনের মতামত কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। শুধু একটি বা দুটি গোষ্ঠীর মতামতের পরিবর্তে বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি, মার্চেন্ট ব্যাংক, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, বিমা খাত, গবেষক এবং বাজার বিশ্লেষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হলে নীতিমালাটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারতো।

এ কারণেই খসড়া চূড়ান্ত করার আগে একটি পাবলিক হিয়ারিং অথবা স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন মিটিং আয়োজন সময়োপযোগী উদ্যোগ হতে পারে।

উপসংহার

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে আস্থা সংকট ও তারল্য সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এ সময়ে যেকোনও নীতিগত পরিবর্তনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং সকল খাতের জন্য সমান ও ন্যায়সংগত নীতি নিশ্চিত করা।

আশা করা যায়, কমিশন অংশীজনদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে খসড়া সংশোধনী পুনর্বিবেচনা করবে এবং এমন একটি মার্জিন বিধিমালা প্রণয়ন করবে, যা একদিকে বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করবে।

লেখক: প্রেসিডেন্ট, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। ভাইস চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিজ অব বাংলাদেশ

/এম/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বর্ষার পাহাড়ে যাবেন? সিদ্ধান্ত নিন বুঝেশুনে
বর্ষার পাহাড়ে যাবেন? সিদ্ধান্ত নিন বুঝেশুনে
বিশ্বকাপ ফাইনাল আবার খেলতে চায় আর্জেন্টিনা, ৮০ হাজার অনলাইন পিটিশন
বিশ্বকাপ ফাইনাল আবার খেলতে চায় আর্জেন্টিনা, ৮০ হাজার অনলাইন পিটিশন
প্রাইভেট পড়তে গিয়ে ধর্ষণের শিকার স্কুলছাত্রী, শিক্ষিকার বাবাকে গাছে বেঁধে রাখলো এলাকাবাসী 
প্রাইভেট পড়তে গিয়ে ধর্ষণের শিকার স্কুলছাত্রী, শিক্ষিকার বাবাকে গাছে বেঁধে রাখলো এলাকাবাসী 
১১ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে ৬৫ বছরের বৃদ্ধ গ্রেফতার 
১১ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে ৬৫ বছরের বৃদ্ধ গ্রেফতার 
সর্বশেষসর্বাধিক