বাংলাদেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের না ফেরার খবরে। মেঘনা নদী থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধারের সংবাদ কেবল একটি মানুষের মৃত্যু নয়, বরং পুরো সাংবাদিক সমাজের হৃদয়ে গভীর শূন্যতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভু দা, আমাদের প্রিয় বিভুরঞ্জন সরকার। তিনি শুধু একজন সাংবাদিক নন, ছিলেন একজন দিকনির্দেশক। একজন সহৃদয় মানুষ এবং আমাদের প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার এক অমর নাম। তাঁর মৃত্যুতে আমরা হারালাম এক নক্ষত্র, যে নক্ষত্রের আলো আমাদের জন্য ছিল সাংবাদিকতার অন্ধকার পথচলায় প্রদীপশিখার মতো।
সাংবাদিক জীবনের পথচলা
বিভু দার সাংবাদিকতা ছিল দেশপ্রেম, দায়বদ্ধতা আর সত্য বলার সাহসের এক অনন্য উদাহরণ। তিনি মূলধারার গণমাধ্যমে কাজ করেছেন নিষ্ঠা, সততা এবং নৈতিক দৃঢ়তার সাথে। সংবাদকে তিনি দেখতেন দায়িত্ব হিসেবে, পেশা হিসেবে নয়। প্রতিটি প্রতিবেদন, প্রতিটি বিশ্লেষণে তাঁর ভেতরের তাগিদ ছিল— সত্যকে তুলে ধরা, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠকে স্থান দেওয়া। তিনি বিশ্বাস করতেন সাংবাদিকতা মানে কেবল ক্ষমতাশালী মানুষের বক্তব্য ছাপানো নয়, বরং অসহায়, বঞ্চিত মানুষের ব্যথা ও আশা সমাজের সামনে নিয়ে আসা।
পারিবারিক জীবনের বেদনা
বিভু দা ছিলেন একজন সাদাসিধা, মধ্যবিত্ত পরিবারিক সংগ্রামে টিকে থাকা মানুষ। পরিবারকে তিনি সর্বদা ভালোবেসেছেন। দায়িত্বশীল স্বামী, স্নেহময় পিতা, আর সহমর্মী আত্মীয়—এইসব ভূমিকায়ও তিনি সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে সাংবাদিকতার কঠিন বাস্তবতা, অস্থির কর্মপরিবেশ, এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা তাঁর জীবনেও ছাপ ফেলেছিল। যা নিয়ে তিনি খুব হতাশ ছিলেন। এত বড় সাংবাদিক হয়েও কখনও তিনি অনুদান পাননি। কোপালে জোটেনি কোনও রাষ্ট্রীয় সম্মান। আমরা জানা মতে, বাংলাদেশের অধিকাংশ সাংবাদিকের মতো বিভু দাও অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে লড়াই করেছেন। পরিবারকে সময় দিতে না পারার যন্ত্রণা যেমন আছে তেমনি কর্মক্ষেত্রের চাপ এবং আত্মমর্যাদার টানাপোড়েন তাঁকে মানসিকভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে।
বিডিনিউজের খোলা চিঠি: সাংবাদিক জীবনের প্রতিচ্ছবি
বিভু দার নিখোঁজ হওয়ার পর বিডিনিউজে প্রকাশিত সেই খোলা চিঠি যা সাংবাদিক সমাজকে নাড়া দিয়েছে। আমাকে অঝোরে কাঁদিয়েছে। যদিও তাঁর এই শেষ খোলা চিঠি শুধু লেখা নয়, সেটি হয়ে উঠেছে এক প্রতীকী দলিল। কারণ, ওই চিঠিতে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমকর্মীর বাস্তব জীবন—একটি মার খাওয়া জীবন। যেখানে সাংবাদিকরা হয়ে উঠে রাজনৈতিক দলের পদলেহনকারী। কম বেতন ও আয়েশি জীবনের আশায় বর্জন করে কখনও কখনও তাদের নীতি- নৈতিকতা। তারা হয়ে উঠে মাঝে মাঝে রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল বাহিনীর মতো। যেখানে রাজনৈতিক দলের নেতারা তাদের ব্যবহার করে সুকৌশলে। কাজ শেষ হলে ফেলে দেয় টিস্যু পেপারের মতো। চিঠিতে যে অভিমান, যে বেদনা, যে আত্মসম্মান রক্ষার আর্তি উচ্চারিত হয়েছে—তা আসলে প্রতিটি সাংবাদিকের না বলা গল্প। সমাজ চায় গণমাধ্যম তার অধিকার, তার মর্যাদার কথা বলুক, কিন্তু গণমাধ্যমকর্মীর নিজের অধিকার বা মর্যাদা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলে না। বিভু দার গল্প আসলে সেই নীরব বঞ্চনার প্রতীক।
আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি
আমি বিভু দাকে শুধু একজন সাংবাদিক হিসেবে নয়, পিতৃসম মানুষ হিসেবে দেখেছি। আমার বাবার বয়স থেকেও তাঁর বয়স বেশি। আমি অনলাইন সহ জাতীয় দৈনিক মাসে কয়েকবার লেখালেখি করি। লেখালেখির সুবাদে তার সাথে আমার পরিচয়। বেশ কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে। কখনও যদিও চোখে দেখেনি। তারপরও তিনি কেমন জানি কাছের মানুষ হয়ে উঠেছেন। জাতীয় দৈনিক কিংবা অনলাইনে যখনই তিনি মতামত পাতায় লিখতেন, না পড়ে কখনও ঘুমাতে যেতাম না। সত্যি বলতে কী, তিনি আমার লেখালেখি জীবনের পুরোধা। আমি ভেবেছিলাম, এবার ঢাকা গেলে তাঁকে একদিন ব্যক্তিগতভাবে বলবো আপনি হলেন আমার লেখার অনুপ্রেরণা। আপনার লেখা স্রোতস্বিনী নদীর মতো। আপনি সেকালের না। আমি কীভাবে বলবো সেই কথা। বিভু দা আপনি স্বর্গলোকে বসে আমার অর্তি গ্রহণ করুন।
বড্ড আফসোস তিনি অনেক অভিমান নিয়ে জীবন দিলেন। এক নক্ষত্রের পতন দেখলো রাষ্ট্র । কাদম্বরী দেবীর মতো তিনি প্রমাণ করলেন—তিনি মরেন নাই। সত্যিকার অর্থে কীর্তিমানদের কখনও মৃত্যু হয় না। বিভু দা অমর হয়ে থাকবেন তাঁর কর্মে, তাঁর সাহসে, তাঁর লেখায়। আজ তাঁর শূন্যতায় আমি যেমন ব্যক্তিগতভাবে ব্যথিত। তেমনি সাংবাদিক সমাজও একটি মূল্যবান দিকনির্দেশক হারালো। তিনি আসলে সম্পদ না, সম্পত্তি।
সাংবাদিকতায় তাঁর অবদান
বিভু দার অবদান এক কথায় অনন্য। তিনি কখনও পেশার সঙ্গে আপস করেননি। মিথ্যা, ভণ্ডামি বা ভোগবাদকে কখনও আশ্রয় দেননি। তাঁর কলম ছিল প্রখর, তাঁর বিশ্লেষণ ছিল নিখুঁত। সংবাদ সংগ্রহে তিনি ছিলেন নির্ভীক, লেখনীতে ছিলেন ধারালো। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় যে সত্য বলার সাহস এখনও অটুট, তার পেছনে বিভু দার মতো মানুষের ত্যাগ ও সংগ্রাম রয়েছে। তিনি হলেন প্রজন্মের পথপ্রদর্শক।
সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্ন
বিভু দার মৃত্যু আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—আমরা কি সত্যিই আমাদের সাংবাদিকদের মর্যাদা দিতে পেরেছি? সমাজ চায় গণমাধ্যম তার হয়ে কথা বলুক, কিন্তু সাংবাদিকদের অধিকার, নিরাপত্তা, বা মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি কি আমরা নজর দিচ্ছি? সাংবাদিকতা পেশাকে আমরা বাহ্যিক চাকচিক্যে দেখি, কিন্তু ভেতরে রয়েছে অনিশ্চয়তা, অবহেলা, আর একাকিত্ব। বিভু দার অভিমান সেই চরম সত্যকে সামনে নিয়ে আসে।
বিভুরঞ্জন সরকার ছিলেন আমাদের বিভু দা। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর লেখা, তাঁর সত্য বলার সাহস এবং সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার আমাদের জন্য চিরকালীন শিক্ষা হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ একজন কীর্তিমান সাংবাদিককে হারালো। আমরা হয়তো তাঁর শূন্যতা পূরণ করতে পারবো না, তবে তাঁর কর্ম ও আদর্শকে ধারণ করতে পারলেই তাঁকে সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা জানানো হবে। বিভু দা, আপনি চলে গেছেন, কিন্তু অমর হয়ে আছেন আমাদের হৃদয়ে।
লেখক: গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক