কেন কখনও পরাজিত হয়নি ইরান? 

প্রশান্ত কুমার শীল
১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:০২

বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ‘গোটা সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন। যা বিশ্বরাজনীতিতে নতুন করে এক পুরোনো প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে কেন হাজার বছরের ইতিহাসজুড়ে বহিরাগত শক্তির ধারাবাহিক আক্রমণের পরও ইরান বা প্রাচীন পারস্য কখনোই পুরোপুরি পরাজিত হয়নি? সামরিকভাবে পরাজয়, রাজধানীর পতন কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন—এসব ঘটেছে বহুবার ইরানে। কিন্তু সভ্যতা হিসেবে ইরান টিকে গেছে অবিচলভাবে। এই টিকে থাকার পেছনে রয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিচয়, জটিল ভূগোল এবং অভিযোজনের অসাধারণ ক্ষমতা।

ইরানের সভ্যতা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার একটি। এটি প্রায় সাত হাজার বছরের ইতিহাস বহন করে। যেখানে মেসোপটোমিয়া সভ্যতা কিংবা প্রাচীন মিসরের মতো উন্নত সভ্যতাগুলো সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে। সেখানে ইরান তার স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রেখেছে। এই ধারাবাহিকতা কেবল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নয়, বরং ভাষা, সাহিত্য, ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত।

প্রথমত, ইরানের অমরত্বের মূল চাবিকাঠি হলো তার সাংস্কৃতিক শক্তি। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বহিরাগতরা ইরানকে জয় করলেও ইরান তাদের আত্মস্থ করেছে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের অভিযানকে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৪ থেকে ৩৩০ সালের মধ্যে তিনি পারস্য জয় করেন এবং পার্সেপোলিস দখল করে তা ধ্বংস করেন। এই পার্সেপোলিস হলো প্রাচীন পারস্যের অ্যাকামেনিড সাম্রাজ্যের (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০-৩৩০) আনুষ্ঠানিক রাজধানী—যা বর্তমানে ইরানের শিরাজ শহরের কাছে অবস্থিত একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। মহামতি আলেকজান্ডার এই সামরিক সাফল্য সত্ত্বেও তিনি পারস্যের সংস্কৃতিকে মুছে ফেলতে পারেননি। বরং তিনি নিজেই পারস্যের রাজকীয় পোশাক ও আচার-অনুষ্ঠান গ্রহণ করেন। গ্রিক ও পারস্যের মানুষের মধ্যে গণবিবাহের আয়োজন করেন—যা একটি সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের দৃষ্টান্ত। পারস্য সাহিত্যেও তিনি ‘সিকান্দার’ নামে স্থান পেয়েছেন। অর্থাৎ, বিজেতা হিসেবে নয়, বরং এক সময় তিনি পারস্যের অংশ হয়ে ওঠেন।

একইভাবে, চেঙ্গিস খানের মঙ্গোল বাহিনী ১৩শ’ শতকে ইরানকে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে ফেলে। বুখারা, সমরকন্দ এবং নিশাপুরের মতো সমৃদ্ধ নগরীগুলোও ধ্বংস করে। এই নগরীগুলো হলো মধ্য এশিয়া ও ইরানের ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন শহর। পরবর্তীকালে হালাকু খান (১২১৮-১২৬৫) ইরানে শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এই হালাকু খান ছিলেন বিখ্যাত মঙ্গোল বিজেতা চেঙ্গিস খানের নাতি এবং তোলুই খানের ছেলে। যিনি পশ্চিম এশিয়ায় মঙ্গোল সাম্রাজ্য সম্প্রসারণে প্রধান ভূমিকা রাখেন। কিন্তু মঙ্গোলদের দীর্ঘ শাসন সত্ত্বেও পারস্যের সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবোধ মুছে যায়নি। বরং মঙ্গোল শাসকরাই পারস্য সংস্কৃতির প্রভাবে নিজেদের রূপান্তরিত করেন। পারস্য শৈলীতে স্থাপত্য নির্মাণ, পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা—এসবই প্রমাণ করে যে ইরান দখল হলেও পরাজিত হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা উঠে আসে তা হলো—‘সাংস্কৃতিক শোষণক্ষমতা’। ইরানের সমাজ বহিরাগত প্রভাবকে গ্রহণ করে, কিন্তু নিজের মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখে। ফলে বহিরাগত শক্তি শেষ পর্যন্ত ইরানের অংশ হয়ে যায়, ইরান তাদের অংশ হয়ে যায় না।

দ্বিতীয়ত, ইরানের ভূগোল তার প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করেছে। দেশটি বিশাল পর্বতমালা, মরুভূমি ও দুর্গম ভূখণ্ডে ঘেরা। এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বহিরাগত শক্তির জন্য পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কঠিন করে তোলে। রাজধানী দখল হলেও প্রাদেশিক শক্তিকেন্দ্রগুলো টিকে থাকে এবং সেখান থেকেই প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ফলে একটি কেন্দ্রের পতন পুরো সভ্যতার পতনে রূপ নেয় না।

তৃতীয়ত, ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার পতন ও পুনর্গঠনের ধারা লক্ষ করা যায়। সাম্রাজ্যের পতনের পরও সমাজ নিজস্ব কাঠামোয় টিকে থাকে। এই সামাজিক স্থিতিস্থাপকতা ইরানকে বারবার নতুনভাবে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। এমনকি ইসলাম আগমনের পরও এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

ইরানে ইসলাম আগমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ঘটনা। সপ্তম শতাব্দীতে মুসলিম বাহিনী পারস্যে মুসলিম বিজয়ের মাধ্যমে সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটায়। রাশিদুন খিলাফত কর্তৃক ৬৩৩-৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে  সাসানীয় সাম্রাজ্য (বর্তমানে ইরান ও ইরাক) দখলের ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। এটি মূলত পারস্যে ইসলামের প্রচলন এবং দীর্ঘমেয়াদি ইসলামীকরণের সূচনা। ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে শেষ সাসানীয় সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদিগার্দ নিহত হলে পারস্যে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তৃতীয় ইয়াজদিগার্দ ছিলেন পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের ৩৮তম এবং শেষ জরথুষ্ট্রীয় সম্রাট। যিনি ৬৩২ থেকে ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তাঁর শাসনামলে পারস্যে মুসলিম অভিযান শুরু হয় এবং ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে হত্যা করার মাধ্যমে চার শতাব্দীর পুরোনো সাসানীয় শাসনের অবসান ঘটে। তবে ইসলাম একদিনে পুরো ইরানে বিস্তার লাভ করেনি। কয়েক শতাব্দী ধরে ধীরে ধীরে ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে ইরান একটি প্রধান মুসলিম অঞ্চলে পরিণত হয়। কিন্তু এখানেও দেখা যায়, ইরান ইসলামকে নিজের মতো করে গ্রহণ করেছে। ফার্সি ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি এখানে ইসলামি ঐতিহ্যের সঙ্গে এক নতুন রূপে বিকশিত হয়েছে।

এই অভিযোজনশীলতাই ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি। এটি কখনোই কেবল প্রতিরোধ করেনি, বরং পরিবর্তনকে গ্রহণ করে নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে পুনর্গঠন করেছে। ফলে বহিরাগত শক্তি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তারা ইরানের গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি কিংবা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—এসবই একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে পারে। কিন্তু একটি গভীর শিকড়-গাঁথা সভ্যতাকে ধ্বংস করা এত সহজ নয়। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, ইরানকে জয় করা মানে কেবল ভূখণ্ড দখল নয়; বরং এটি একটি সংস্কৃতি, একটি পরিচয় এবং একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে লড়াই করা।

সর্বোপরি, ইরান কখনোই ‘অপরাজেয়’ ছিল না সামরিক অর্থে, বরং এটি ‘অপরাজেয়’ তার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক শক্তির জন্য। আলেকজান্ডার, মঙ্গোল কিংবা আধুনিক শক্তিধর রাষ্ট্র— কেউই ইরানের এই গভীর ভিত্তিকে নড়াতে পারেনি। এ কারণেই সাত হাজার বছরের ইতিহাস পেরিয়েও ইরান আজও টিকে আছে একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত সভ্যতা হিসেবে।

এই বাস্তবতা আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। তা হলো একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রভান্ডারে নয়, বরং তার সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ের গভীরে নিহিত। আর এদিক থেকেই ইরান বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ।

লেখক: গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

/এপিএইচ/এমওএফ/ 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
সর্বশেষসর্বাধিক