পাকিস্তানে ‘জেন-জি’ আন্দোলন কেন ব্যর্থ হয়? 

প্রশান্ত কুমার শীল
০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৪:০০

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গত কয়েক বছর ধরে তরুণদের নেতৃত্বে নানা আন্দোলন বেশ চোখে পড়ছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক কাঠামোতে তাদের অংশগ্রহণ, ভিন্ন এক নতুন মাত্রা যোগ করছে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার সংঘটিত হওয়া ঐতিহাসিক গণআন্দোলন আরাগালয়া, যার অর্থ সংগ্রাম। যার নেতৃত্বে ছিল তরুণরা। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল শ্রীলঙ্কায় তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। আবার ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান, নেপালে ছাত্র আন্দোলনের ফলে কেপি শর্মা অলি সরকারের পতন কিংবা সর্বশেষ ভারতে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে তরুণদের নেতৃত্বাধীন কোকরোচ আন্দোলন। সব মিলিয়ে এই অঞ্চলজুড়ে ‘জেন-জি’ রাজনীতির উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এসব আন্দোলনের প্রভাবে সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে। কখনও কখনও নীতিগত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। আবার বদল করছে রাজনৈতিক সমীকরণও। কিন্তু এই ধারার সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম রয়ে গেছে পাকিস্তান। চরম অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামরিক প্রভাব সবই গ্রাস করেছে পাকিস্তানকে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে প্রতিবাদী হতে দেখা যায়নি কখনও এই দেশকে।

এটা সত্য গণআন্দোলনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপাদানই সেখানে বিদ্যমান রয়েছে। তবু পাকিস্তানে এখন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও দেশব্যাপী ‘জেন-জি’ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আরো গভীরে প্রবেশ করতে হবে।

প্রথমত, পাকিস্তানে রাষ্ট্রের চরিত্র দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তুলনায় ভিন্ন। দেশ ভাগ ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটির রাজনীতিতে সেনাবাহিনী শুধু নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিতে আবির্ভূত হয়েছে। সরকার পরিবর্তন, পররাষ্ট্রনীতি, এমনকি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্যেও সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সুস্পষ্ট লক্ষ করা যায়। ফলে যেকোনও বৃহৎ ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার আগেই তা নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে এখানে। এই নির্মোহ বাস্তবতা তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিসরকে আরও সীমিত করেছে।

দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের ছাত্র রাজনীতির দুর্বলতা একটি বড় কারণ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে বিশ্ববিদ্যালয়

ক্যাম্পাস রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। বাংলাদেশ, ভারত কিংবা নেপালে ছাত্র সংগঠনগুলো জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু পাকিস্তানে ১৯৮০-এর দশকে জেনারেল জিয়া-উল-হকের সামরিক শাসন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ইউনিয়নের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। সেই নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আজও বহাল সেখানে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শক্তিশালী ছাত্র সংগঠনের অনুপস্থিতি তরুণদের রাজনৈতিক সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতাকে ক্ষয় করেছে। ফলে ক্ষোভ থাকলেও তা সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

তৃতীয়ত, পাকিস্তানের সামাজিক বাস্তবতাও একটি বড় অন্তরায়। দেশটির ভাষা, ভিন্ন জাতিসত্তা, দুর্গম অঞ্চল এবং চরম সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে বিভক্তি সবসময়ই তাদের বিভক্ত করেছে। বিশেষ করে পাঞ্জাব, সিন্ধ, বালুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া এর অন্যতম উদাহরণ। এসব অঞ্চলে সবার রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এক নয়। বালুচদের আন্দোলনের সঙ্গে পাঞ্জাবের মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীর সংযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন। একইভাবে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের জনগোষ্ঠীর দাবির

সঙ্গে পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডের জাতীয় দাবির সঙ্গে কখনও মিলে না। ফলে একটি অভিন্ন জাতীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে তরুণদের ঐক্যবদ্ধ করা এখানে কঠিন হয়ে পড়ে। আবার সবাইকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনাও দুঃসাধ্য ব্যাপার। তার ওপরে সুন্নি-শিয়া বিভাজন তো আছেই।

দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় আমাদের। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকট সব শ্রেণির মানুষকে একই প্ল্যাটফর্মে এনেছিল। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের দাবি দ্রুত নাগরিক অধিকারের বৃহত্তর প্রশ্নে রূপ নিয়েছিল। ভারতে শিক্ষানীতির প্রশ্ন থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন পরবর্তীকালে শাসনব্যবস্থার জবাবদিহির আলোচনায় পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট ইস্যু ধীরে ধীরে বৃহত্তর জনস্বার্থের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। সেখানে পাকিস্তানে ঠিক এই রূপান্তরটি ঘটছে না। সেখানে আন্দোলন আছে, কিন্তু আন্দোলনগুলোর মধ্যে সংযোগ নেই।

বালুচিস্তানে মানবাধিকার হরণ, গুম এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের দাবি রয়েছে বহুকাল ধরে। দিনের পর দিন বালুচরা চরম বঞ্চনার শিকার হচ্ছে মূল ভূখণ্ডের মানুষ ও সরকার থেকে। আবার পাক-অধিকৃত কাশ্মিরে বিদ্যুৎ ও প্রশাসনিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। গুলি করা হয় প্রকাশ্যে। নায্যবিচার পায় না তারা। শিক্ষার্থীরা ছাত্র ইউনিয়ন পুনর্বহালের দাবি তোলে। কিন্তু প্রতিটি আন্দোলন নিজস্ব ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমার মধ্যে আটকে থাকে। ফলে কোনও আন্দোলনই জাতীয় অসন্তোষের প্রতীকে পরিণত হতে পারে না। জাতিগত সত্তার কঠিন জাতাঁকলে প্রত্যেক আন্দোলনই সঠিক দিশা হারায়।

চতুর্থত, পাকিস্তানে দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন একটি সংস্কৃতি অব ফিয়ারতৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা একে বলেন—self-censorship under coercive institutions। অর্থাৎ নাগরিকেরা শুধু রাষ্ট্রীয় দমন নয়, সম্ভাব্য দমনের আশঙ্কাতেই নিজেদের সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ তুলনামূলক সহজ হলেও বাস্তবে রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ডিজিটাল প্রতিবাদ বাস্তব আন্দোলনে রূপ নিতে পারে না।

তবে এটাও সত্য যে, পাকিস্তানের তরুণরা রাজনীতিবিমুখ নয়। বরং তারা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের পরিবর্তন গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান কিংবা ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের প্রতি পাকিস্তানি তরুণদের আগ্রহ তারই ইঙ্গিত দেয়। তারা এসব আন্দোলন নিয়ে বেশ সরব হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করছে। আবার নিজেদের অতৃপ্তিটাও বলছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকট। দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ সফল ছাত্র আন্দোলনের পেছনে এমন এক নেতৃত্ব ছিল, যারা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সর্বজনীন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করতে পেরেছিল।

পাকিস্তানে রাজনৈতিক দলগুলো বরং নিজেদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বেই বেশি নিজেরা ব্যস্ত রয়েছে। তরুণদের বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির পরিবেশ এখানে গড়ে ওঠেনি। ফলে ছাত্রসমাজ জাতীয় রাজনীতির চালিকাশক্তির পরিবর্তে পর্যবেক্ষকে পরিণত হয়েছে— যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক নেতৃত্বের বিকাশও সেই অর্থে হয়নি।

তবে পাকিস্তানের বর্তমান নীরবতাকে স্থায়ী বাস্তবতা মনে করারও সুযোগ নেই। আবার পাকিস্তানে জেন জি আন্দোলন সফল হবে না— এমনটা মনে করারও কিছু নেই। পাকিস্তানের চরম অর্থনৈতিক সংকট যেমন রয়েছে, সেখানে আবার প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ, উচ্চশিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীর বিস্তারও রয়েছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে তাদের সংযুক্তি ভবিষ্যতে হয়তো নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। ইতিহাস বলে, দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের মধ্যেও সমাজে যখন ক্ষোভ জমতে থাকে, তখন সামান্য একটি ঘটনাও গণআন্দোলনের সূচনা ঘটাতে পারে।

অতএব, পাকিস্তানে জেন-জি আন্দোলনের দুর্বলতার কারণ তরুণদের উদাসীনতা নয় বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ।

এর সঙ্গে রয়েছে ছাত্র রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি অবক্ষয়, সামাজিক বিভাজন, আন্দোলনের বিচ্ছিন্নতা এবং কার্যকর নেতৃত্বের অভাব। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো দেখিয়েছে যে সংগঠিত ছাত্রসমাজ কেবল সরকারের নীতি পরিবর্তনই নয়, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথও বদলে দিতে পারে। পাকিস্তান সেই অভিজ্ঞতা থেকে এখনও হয়তো অনেকটা দূরে। কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ বলে, কোনও সমাজে অসন্তোষ অনির্দিষ্টকাল চাপা থাকে না। পাকিস্তানের তরুণরা সঠিক সময়ে হয়তো ঠিকই একটি অভিন্ন জাতীয় এজেন্ডায় নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করবে। রাষ্ট্র তাদের সেই রাজনৈতিক পরিসর দিক বা না দিক, তারা তাদের অধিকারে নিশ্চয়ই সোচ্চার হবে। এসব উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে পাকিস্তানে ভবিষ্যতের ‘জেন-জি’ রাজনীতির গতিপথ।

লেখক: গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বেনজীরের জামিন বাতিলে আবেদন করবে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বেনজীরের জামিন বাতিলে আবেদন করবে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিদ্যুতের বিল বেশি আসলে অভিযোগ জানাবেন কোথায়
বিদ্যুতের বিল বেশি আসলে অভিযোগ জানাবেন কোথায়
অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরেছেন নাহিদ রানা, চোটের সবশেষ অবস্থা কী?
অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরেছেন নাহিদ রানা, চোটের সবশেষ অবস্থা কী?
প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানেই উপকূলীয় মানুষের টেকসই জীবিকা: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানেই উপকূলীয় মানুষের টেকসই জীবিকা: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
সর্বশেষসর্বাধিক