সর্ষের মধ্যে ভূত নাকি ভূতের মধ্যে সর্ষ

বহু কাজে লাগা সরিষা খুবই অর্থকরী ফসল। পাতা, ফুল, বীজ, বীজের তেল সবই  উপাদেয় এবং নানা লৌকিক এবং অলৌকিক চিকিৎসার ধন্বন্তরি উপাদান। তাই বুঝি চরম পরশ্রীকাতর এই সমাজ সর্ষের নামে নানা বদনাম পয়দা করে। বিপদে মাথা নষ্ট হলে বলে চোখে সর্ষে ফুল দেখছি। মন্ত্রী, সচিব, মেয়র একমত হওয়ার পরেও কাজ না হলে বলি ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ আছে। ধারিণা করা হয় প্রাচীনকালে গ্রামীণ সমাজে কারও রোগব্যাধির উপশম না হলে বিশ্বাস করা হতো যে, তার ওপর ভূতের আছর বা অশুভ ছায়া পড়েছে। সেক্ষেত্রে কবিরাজ বা ওঝারা ‘সর্ষে পড়া’ (মন্ত্রপুত  সরিষা) ব্যবহার করে সেই ভূত তাড়ানোর তোড়জোর করতেন। কামিয়াব না হলে দোষ দেওয়া হতো মন্ত্রকে না বেচারা সর্ষেদানাকে বলা হতো— সর্ষের ভেতরেই কোনও কারণে ভূত ঢুকে বসে থাকে, তাই তা দিয়ে আর ভূত তাড়ানো সম্ভব নয়। এই ধারণা থেকেই বোধ করি প্রবাদটির উৎপত্তি। ইংরেজি ভাষায় একই অবস্থা বুঝানোর জন্য অনেকগুলো বাগধারা থাকলেও সেখানে সর্ষকে নিয়ে কোনও টানাটানি নাই। ‘ভাইরাস ইন দি এনটিডট’ বললেই ইংরেজরা বুঝে যায় সর্ষের মধ্যে ভূত আছে। কেউ বলেন, ‘দি ফক্স ইন দি চিকেন কুপ’ (নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিই যদি চোর হয়), অথবা ‘এ উলফ ইন শিপ’স ক্লোদিং' (সহজ-সরল বেশে বিপজ্জনক কেউ) কিংবা সরাসরি ‘দি    গার্জেন  ইজ দি থিফ’ (রক্ষকই ভক্ষক)।

সর্ষের ভেতরে ভুত বা ‘সর্ষের ভূত’ প্রবাদটি আমাদের ভোক্তা অধিকার বা দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। যখন রক্ষকই ভক্ষক হয়ে দাঁড়ায়, তখন সৎ কর্মকর্তাদের লড়াই আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

ভোক্তা অধিকার ও দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে এই ‘সর্ষের ভূত’ মূলত ৩টি রূপে দেখা যায়:

১. ভেতরের তথ্য ফাঁস: অনেক সময় বড় কোনও শিল্পগ্রুপ বা সিন্ডিকেটের গুদামে অভিযানের আগেই অধিদফতরের বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতর থেকে কেউ তাদের সতর্ক করে দেয়। ফলে ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে সবকিছু ‘পরিষ্কার’ পান। ২. প্রভাবশালী মহলের তদ্বির: কোনও সৎ অফিসার যখন শক্ত হাতে কাজ শুরু করেন, তখন প্রশাসনের ওপর মহলেরই কিছু অসাধু কর্মকর্তা সেই অফিসারকে থামানোর জন্য চাপ দেন বা বদলির ফাইল নাড়াচাড়া শুরু করেন। ৩. দীর্ঘসূত্রতা ও আপস: নিচুতলার কিছু অসাধু পরিদর্শক বা কর্মকর্তা মাসোহারা বা উৎকোচের বিনিময়ে ভেজাল কারবারিদের ছাড়পত্র দিয়ে দেন, যা সারোয়ার আলম বা আনোয়ার পাশার মতো কর্মকর্তাদের কাজকে বাধাগ্রস্ত করে।

সরকার যখন এই ‘সর্ষের ভূত’ তাড়ানোর জন্য অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান চালাতে দ্বিধায় থাকে, তখনই সৎ অফিসারদের পরিণতি হয় বদলি বা ওএসডি।

গত ২০০৯ সালের ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন’ পাসের মাধ্যমে  ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা কার্যক্রম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়। ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি  ও বেসরকারি পর্যায়ে বহুমুখী প্রচেষ্টা চলছে। বহুবিধ প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বর্তমান সময়ে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর তাদের প্রচারণা ও দৃশ্যমান অভিযানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে।

বর্তমানে ভোক্তা স্বার্থ রক্ষায় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে  সেগুলি হচ্ছে—

১. বাজার মনিটরিং ও অভিযান: জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর নিয়মিত বাজার তদারকি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য, ভেজাল এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। ২. অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি: ভোক্তারা অনলাইনে বা সরাসরি অধিদফতরে অভিযোগ জমা দিতে পারেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদায়কৃত জরিমানার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারীকে প্রদান করা হয়। ৩. সমন্বিত ভূমিকা: সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এবং ব্যবসায়ীদের নিয়ে সমন্বিত সেমিনার ও সভার আয়োজন করা হচ্ছে যাতে সবার অংশগ্রহণে ভোক্তার স্বার্থ নিশ্চিত করা যায়। ৪. আইন প্রয়োগ: ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে, যা অসাধু ব্যবসায়ীদের দমনে কাজ করে।

এছাড়াও চলে নানা সচেতনতামূলক কার্যক্রম

১. ভোক্তা শিক্ষা: জনগণের মধ্যে অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ, সেমিনার এবং গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ২.বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস: প্রতি বছর ১৫ মার্চ বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালনের মাধ্যমে  ভোক্তাদের মৌলিক ৮টি অধিকার সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। এসব কাজের চ্যালেঞ্জ অনেক  যেমন- ১. উপযুক্ত কুশলী ও স্বউদ্যোগী লোকবল এবং রসদ বা লজেসটিকের  ঘাটতি। ২. উদ্যোগী ও সচেতন নাগরিক সমাজের আভাব।তাই দিনের পর দিন ঠকলেও  উপযুক্ত কতৃপক্ষের কাছে উপ্সথাপিত অভিযোগের হার এখনও অনেক কম। ৩. শাস্তিকে হালকাভাবে নেয়ার প্রবণতা: অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি নামমাত্র জরিমানা দিয়ে অপরাধের পুনরাবৃত্তি। একই অপরাধে বার বার জড়িয়ে পড়া। এবং ৪. নিরাপত্তাহীনতা তো আছেই। অনেক সময় মাঠ পর্যায়ে অভিযান চলাকালে অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে কর্মকর্তারা লাঞ্ছিত বা দুর্ব্যবহারের শিকার হন। 

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে,  ভোক্তা অধিকার রক্ষায় কাজ করা সাহসী কর্মকর্তাদের সরকারিভাবে মুল্যায়ন না করা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা না দেওয়ার  প্রবণতা। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, এসব কার্যক্রমগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান আর জনপ্রিয় কার্যক্রম হচ্ছে বাজার মনিটরিং ও অভিযান। অনেক সময় এসব অভিযান সরাসরি টিভিতে দেখানো হয়। ইলেকট্রনিক সংবাদ মাধ্যমগুলো চেষ্টা করে প্রতিটা অভিযানে উপস্থিত থাকা, আর নিজেদের মতো করে প্রচার করা। সবক্ষেত্রেই যে যেটা দেখানো হয়, সেটাই যে সত্য এবং একমাত্র সত্য (ট্রুথ অ্যান্ড অনলি ট্রুথ) তা নাও হতে পরে। কারও কাছে মদের খালি বোতল পাওয়া যাওয়া মানেই তিনি যে মদখোর মাতাল, সেটা নাও হতে পারে।  কিন্তু মিডিয়া ট্রায়েল হয়েই যায়, অন লাইন দর্শকরা এসবে মজা পান বেশি। ইটিপি বাড়ে প্রচারকদের।

বিপদটা শুরু হয় এখানেই হটাৎ ক্যামেরার আলোতে চলে যাওয়া কলিগকে দেখে অন্য কলিগদের চোখ টাটানো নতুন কিছু নয়। তাঁকে ফেলে দেওয়ার কুৎসিত চেষ্টা নিত্য দিনের চর্চায় চলতে থেকে। প্রশ্ন তলা হয়, ব্রিটিশ আমলে তৈরি কর্মচারী বিধিমালা মধ্যে সে থাকছে না বাক্সোর বাইরে গিয়ে কাজ করছে। চারদিকে রব ওঠে তাকে খাঁচায় ভরার।

ভোক্তা অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে সৎ ও সাহসী কর্মকর্তাদের আকস্মিক বদলি বা চাপের মুখে পড়ার ঘটনা বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বড় কোনও করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরপরই কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলো বহুল আলোচিত।

তরুণ ও সাহসী অফিসারদের যে ধরনের প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয় সেগুলি হচ্ছে—

দ্রুত বদলি ও প্রশাসনিক চাপ: বড় কোনও করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রায়ই তড়িঘড়ি করে বদলি করে দেওয়ার নজির রয়েছে, বিগত ২০১৯ সালে একটি বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ডে অভিযানের পর আলোচিত কর্মকর্তা মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারকে বদলি করা হয়েছিল, যা সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদের মুখে স্থগিত হয়।

হয়রানির চেষ্টা: সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার পর অনেক কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে বা আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে হয়রানি করার চেষ্টা করা হয়। বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের স্বার্থে আঘাত লাগলে নানাভাবে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। মানসিক চাপের আরেকটা নজির হচ্ছে।   অফিস খোলার আগেই রাতের মধ্যেই বদলি করা। একবার এরকম বদলি হওয়া এক কর্মকর্তাকে সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিল, বদলির খবর কখন জানতে পারলেন? তিনি বলেছিলেন, “রাত ১১টায় একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফেরার পর আমি জানতে পারি বদলির খবর।”

 এরকম অন্যায্য কাণ্ড দুদকেও ঘটেছে। দুদকের একজন সক্রিয় কর্মী উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিনকে কোনও আগাম নোটিশ ছাড়াই ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তিনি চট্টগ্রামে কর্মরত থাকাকালীন কক্সবাজারে ভূমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি, রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে এনআইডি প্রদান এবং কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের অনিয়মসহ বেশকিছু প্রভাবশালী মহলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ফলে তিনি প্রভাবশালী মহলের রোষানলে পড়েন এবং প্রাণনাশের হুমকিও পান।

দুদক তাকে ‘অসদাচরণ’ ও ‘বিভাগীয় নিয়ম লঙ্ঘনের’ অভিযোগ এনে এবং সংস্থার ভাবমূর্তি রক্ষার অজুহাতে ৫৪(২) বিধিতে কোনও কারণ দর্শানো ছাড়াই চাকরিচ্যুত করে। স্বাভাবিকভাবে এই অভিযোগগুলো তিনি অস্বীকার করেন এবং একে প্রভাবশালী মহলের ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করে আইনি লড়াইয়ে যান। এক দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের ৯ জুলাই হাইকোর্ট তাঁর চাকরিচ্যুতির আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করে। আদালত তাকে ৩০ দিনের মধ্যে সব বকেয়া বেতন, জ্যেষ্ঠতা এবং সুযোগ-সুবিধাসহ চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। শরীফ উদ্দিনকে      ভাগ্যবান বলতে হবে, সাধারণত কেউ মামলার পথে হাঁটেন না। হাঁটলেও মামলা খরচ পোষাতে পারেন না। আর ‘সন্তোষজনক’ রায়ের অনিশ্চয়তা তো আছেই। আলোচ্য শরীফ উদ্দিন আরেকটা কারণে ভাগ্যবান— এই প্রথম কোন সৎ আমলার অন্যায্য চাকরিচ্যুতির পর সহকর্মীরা সংগঠিত প্রতিবাদে নামে। দুদকের কয়েকশ কর্মকর্তা-কর্মচারী নজিরবিহীনভাবে মানববন্ধন করেন এবং এই সিদ্ধান্তকে ‘ক্রসফায়ারের’ মতো ঘটনা বলে অভিহিত করেন।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান  মাহবুব কবির মিলনের ঘটনা আরও ইন্টারেস্টিং। তিনি ২০১৭ সাল থেকেই লড়ছিলেন খাদ্যে বিষাক্ত ফরমালিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে এবং বিজ্ঞাপন ও লেবেলিংয়ের অনিয়ম বন্ধের জন্য। ২০২০-এর ২৫ মার্চ তাকে হঠাৎ করেই নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে সরিয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে বদলি করা হয়। অথচ সে সময় তিনি খাদ্যে ভেজালবিরোধী অভিযানে বেশ সক্রিয় ছিলেন। রেলে গিয়ে তিনি রেলে টিকিট কালোবাজারি বন্ধ এবং দুর্নীতি দূর করার চেষ্টা করেন। এই কাজের জন্য তিনি মাত্র তিন মাস সময় চেয়ে ১০ জন কর্মকর্তার একটি বিশেষ উইং  করার  অনুমতি চেয়েছিলেন। এই প্রস্তাব দেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই, ২০২০ সালের ৬ আগস্ট তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। মূলত দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থানের কারণেই তাকে কাজ করার সুযোগ না দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। ওএসডি থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয় এবং তিরস্কারসূচক লঘু দণ্ড প্রদান করা হয়। অভিযোগ ছিল, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তর্কালাপ এবং বিধি বহির্ভূতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথা বলেছেন ।

এরমধ্যে প্রতারক প্রতিষ্ঠান ‘ইভ্যালি’কে সামাল দেওয়ার জন্য সরকার একটি বোর্ড গঠন করলে জনাব মিলনকে তার কর্ণধারের দায়িত্ব দেয়। ‘এবার দেখি বাপু তুমি কেমন কামেল’ মনোভাব থেকেই এই পদায়ন। কার্যত বিপুল দায়ে (বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী এক সময় ইভ্যালির মোট দায় ছিল প্রায় ৪০৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২১৪ কোটি টাকা গ্রাহকদের কাছে বাকি ছিল) ডুবতে  থাকা প্রতিষ্ঠানটিকে উদ্ধার করা অসম্ভব বুঝতে পেরেই তাকে সেখানে পাঠানো হয়। মামলা, গ্রাহকের দাবি, মালিকানা নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে কোম্পানি পুনরুজ্জীবন কঠিন হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বোর্ড পদত্যাগ করে হাফ ছেড়ে বাঁচে।

স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ভোক্তার অধিকার রক্ষা আর দুর্নীতির লাগাম টানতে গিয়ে সরকারের পরিকল্পিত হেনস্তার অনেক উদাহরণ থাকলেও স্থান সংকুলানের স্বার্থে এখানেই থামতে হচ্ছে। তবে র‍্যাবের দুইজন তরুণ ম্যাজিস্ট্রেটের কথা উল্লেখ না করলে সর্ষের রকমারি এবং কাঠামোতে মিশে থাকা ভূতদের উৎসাহিত করা হবে। এসব আলোচনায় সরোয়ার আলম আর এ এইচ এম আনোয়ার পাশাদের কথা  এসে যাবেই । এদের দুইজনই অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে অভিযান চালিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন এবং প্রায় একইভাবে আকস্মিক বদলির শিকার হয়েছিলেন। র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন অনেক বড় বড় সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিলেন সরোয়ার আলম। সাল ২০২০’এ তাকে হঠাৎ করে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় পদোন্নতি বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করায় তাকে বিভাগীয় শাস্তির (তিরস্কার) মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সেই সময় তিনি ক্যাসিনো-বিরোধী অভিযান, হাসপাতালে অনিয়ম এবং রিজেন্ট হাসপাতালের সাহেদ করিমের মতো প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এই বদলিকে অনেকেই তার সাহসী কাজের ‘পুরস্কার’ হিসেবে ব্যঙ্গাত্মকভাবে অভিহিত করেছিলেন । শুধু বদলি নয়,  বছরের পর বছর (প্রায় চারবছর) কোনও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব না দিয়ে এক প্রকার ‘সাইডলাইনে’ বসিয়ে রাখা হয়েছিল।

সরোয়ার আলমের আগে র‍্যাবের আরেকজন ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম আনোয়ার পাশা তাঁর দায়িত্ব পালনকালে বেশকিছু বড় এবং দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর পরিচালিত র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যক্রম সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক আস্থা ও জনপ্রিয়তা পায়। তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য দুটি চাঞ্চল্যকর অভিযান ছিল:

১. পুরান ঢাকার নকল ওষুধ ও ভেজাল প্রসাধনী কারখানা: আনোয়ার পাশার অন্যতম বড় সাফল্য ছিল পুরান ঢাকার মিটফোর্ড ও চকবাজার এলাকায় কয়েকশ কোটি টাকার নকল ও ভেজাল ওষুধের গুদাম এবং কারখানা সিলগালা করা। তিনি এমন সব কারখানায় হানা দিয়েছিলেন, যেখানে নামী-দামি বিদেশি ব্র্যান্ডের প্রসাধনী ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরি হতো সাধারণ ক্ষতিকারক রাসায়নিক দিয়ে। এই অভিযানের পর ওষুধ খাতের বিশাল এক সিন্ডিকেট উন্মোচিত হয়েছিল।

২. রিয়েল এস্টেট ও আবাসন প্রতারণা বিরোধী অভিযান: তিনি অনেকগুলো ভুয়া আবাসন কোম্পানি বা রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, যারা সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করছিল। রিয়েল স্টেট কোম্পানিতে হাত দেওয়ার সাথে সাথে ২০১৪ সালের দিকে তাকে হঠাৎ করেই র‍্যাব থেকে তাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সে সময় গুঞ্জন ছিল যে, প্রভাবশালী কোনও মহলের স্বার্থে আঘাত লাগার কারণেই তাকে তড়িঘড়ি করে বদলি করা হয়েছে।

উদ্যোগী তরুণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কেন এমন করা হয়?

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সবার জানা, কিন্তু কেউ উচ্চারন করবে না। সবাই চায় যেমন চলছে চলুক। কে চাইবে বসে বসে জুনিয়রদের পদোন্নতি, আর নিজের সাইড লাইনে বসে থাকার গল্প লিখতে। বিভাগীয় মামলার শিকার হয়ে বেতনের বদলে খোরপোষ ভাতায় সংসার চালাতে। উদ্যোগী আমলারা বলতে শিখুক  ‘চুলায় যাক ভোক্তা অধিকার, প্রমোশন বাঁচলে বাপের নাম।’ এটাই এসট্যাবলিশমেনটের ম্যাসেজ। ‘ম্যালা ফাল দিও না সাইজ কৈইরা দিমু।’

লেখক: গবেষক  

wahragawher@gmail.com