সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ‘রকম-সকম’ ব‍্যবহার

বাংলাদেশে গত দেড় বছরে সবচেয়ে বেশি মানুষ গ্রেফতার হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ও হত‍্যা মামলায়। এসব মামলার কোনও কোনোটিতে আসামি শত শত। হত‍্যারচেষ্টা মামলার আসামিও বেশ। মামলাগুলোর ফিরিস্তি পড়লে শুধু হাস‍্যকরই নয়, বরং দেশের বিচার-আইন সব কিছু নিয়েই যে কারও কাছেই গভীর সংশয় তৈরি হতে পারে। ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান যে হত‍্যা মামলার আসামি, যেভাবে সেই ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, সেসময় তিনি কানাডায়। কানাডা থেকে গুলি করে তিনি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন? কয়েক দিন আগে একাত্তর টিভির সাংবাদিক শারমীন (একাত্তর টিভির বিশেষ প্রতিনিধি শাহনাজ শারমীন) তার ফেসবুক স্ট‍্যাটাসে জানিয়েছেন, তাকে যে সময়ে সংঘটিত হত‍্যার অভিযোগে মামলার আসামি করা হয়েছে, ঠিক সেই সময় তিনি সংসদ ভবন থেকে লাইভে ছিলেন। 

অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে ৩৫৪ জন সাংবাদিককে হত‍্যা, হত‍্যাচেষ্টা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক হওয়া সাংবাদিকদের মধ‍্যে মঞ্জুরুল আলম পান্না ও আনিস আলমগীর মুক্তি পেয়েছেন। কেউ কেউ একসঙ্গে দুটো মামলারও আসামি। মানে একই সময় দুটো ভিন্ন স্থানে তিনি হত‍্যার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, যা বাস্তবে অসম্ভব। বিষয়গুলো অনেকটা এমন হয়ে গেছে যে লোকজন একে অন‍্যকে ঠাট্টা করে বলছে, ‘তোমার নামে এখনও হত‍্যা মামলা হয়নি?’ কিংবা ‘হত‍্যা মামলা না হলে আর কী হলো?’ মানে হত‍্যা মামলাই এখন বাংলাদেশের জন‍্য দুধভাত। 

বহু সাংবাদিক, চিকিৎসক, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেই হত‍্যা মামলা রয়েছে এবং অনেকেই গ্রেফতারও হয়েছেন। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ-প্রমাণসহ মামলা হবে, বিচার হবে। কিন্তু হরে-দরে হত‍্যা মামলা দায়ের হওয়া বিচার ব‍্যবস্থাকেই দুর্বল জায়গায় নিয়ে গেছে।

কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে ‘ফ‍্যাসিস্ট’ ট‍্যাগ দিয়ে মব করে মববাজরা যাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করছে, তাকেও এই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। এছাড়া সব আটকই হচ্ছে  এখন অনেকটা সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। মুক্তিযুদ্ধ এবং ৭২-এর সংবিধান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা লতিফ সিদ্দিকী, শিক্ষক হাফিজুর রহমান কার্জন, সাংবাদিক মঞ্জুরল আলম পান্না, সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খানসহ অনেকে। সব মামলাই হয়েছে এই সন্ত্রাসবিরোধী আইনেই। আওয়ামী লীগকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে এই আইনে।

এসব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার ২ নম্বর মদাতী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিপ্লব সরকারের ঘটনা। তাকেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। কারণ তিনি স্থানীয় এমপিকে ৩০ পার্সেন্ট দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন (বাংলা ট্রিবিউন ১৬ মার্চ, ২০২৬)।

আওয়ামী লীগের সময় সবচেয়ে ব‍্যবহৃত ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের’ জায়গায় এখন দেদার চলছে সন্ত্রাসবিরোধী আইন। মজার এবং তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকার ২০১৮ সালে প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারার অধীন কোনও আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দেওয়া দণ্ড বা জরিমানা বাতিল করে। কিন্তু এর সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে সামনে নিয়ে আসে এবং এটিকে জামিন অযোগ‍্য হিসেবে হাজির করে। 

কয়েক দফা সংশোধিত এই আইনে বাংলাদেশ গেজেট ও লেজিসলেটিভ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই আইনে (যা ২০১২ ও ২০১৩ সালে সংশোধিত) সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটানোর দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করতে পেরেছে কিন্তু সন্ত্রাসবিরোধী আইন বা ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন শুধু জারিই রাখেনি, বরং এসব আইনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই এই আইন ‘যাচ্ছেতাইভাবেই’ ব‍্যবহৃত হয়ে আসছে। 

এই আইনের স্বেচ্ছাচারী ব‍্যবহার নিয়ে আপত্তি তুলেছিল নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থকদের গ্রেফতারে সম্প্রতি সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ব্যবহার বাড়াচ্ছে (বিবিসি নিউজ বাংলা ৯ অক্টোবর ২০২৫)। 

২০০৫ সালে বাংলাদেশে সিরিজ বোমা হামলা, একই দিনে একই সময়ে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের বিস্তার ও অর্থায়ন রোখার তাগাদায় মূলত জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে দমনের লক্ষ্যেই তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২০০৮ সালে ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ’ জারি করে এবং ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এটিকে স্থায়ী আইনে (সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ ) পরিণত করা হয়। 

আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় আসার পর সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন করে রাজনৈতিক বিরোধীদের এবং বিরোধী মতকে মোকাবিলা করেছে। কিছু দিন আগে গণমাধ‍্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সাত বছরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া ৯৩ শতাংশ মামলাই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে এবং আসামিরা মুক্তি পেয়েছেন। তার মানে এই আইনটি যে ‘কালো’ আইন সেটি প্রমাণিত। তাহলে কেন সেটিকে অন্তর্বর্তী সরকার সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ করেছে এবং এখনও এই আইনে গ্রেফতার চলছে। ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর জন‍্যও এই আইন প্রয়োগ করে গ্রেফতার করা হয়েছিল ইমিসহ আরও কয়েকজনকে। ইমি মুক্তি পেয়েছেন, কিন্তু বাকিরা এখনও কারাগারে। 

আওয়ামী লীগ আমলে এই আইনে করা ৯৩ শতাংশ মামলাই মিথ‍্যা প্রমাণিত হয়েছে। হলফ করে বলা যায় যে অন্তর্বর্তী সরকার এবং বিএনপির এই তিন মাসে এই আইনে করা বেশিরভাগ মামলাই হয়তো আরও কয়েক মাস বা বছর পরেই মিথ‍্যা প্রমাণিত হবে। 

কোনটি সন্ত্রাস আর কোনটি নয়, সেটি এখনও রাজনৈতিকভাবেই চিহ্নিত হচ্ছে। মববাজদের আগে ‘প্রেসার গ্রুপ’ কিংবা অন্য কোনও নামে মহিমান্বিত করা হয়েছে। এখন নির্বাচিত সরকারের এই সময়ে এসেও বলা হচ্ছে, এটি নাকি ‘জনগণের প্রতিক্রয়া’। যারা মব করছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে যারা শিকার হচ্ছেন, তাদেরই এই আইনে মামলা দিয়ে ‘সন্ত্রাসী’ অভিযুক্ত করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে আইন হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী আইন আরও ‘মওকা’ বুঝে ব‍্যবহার করা হচ্ছে। আওয়ামী সময়ের এই আইন খারাপ হলে, এটি এখনও কেন এতে ভালো অস্ত্র হয়ে উঠছে? কোনেও আমলেই এই আইন কিন্তু বাতিল হয়নি, হচ্ছে না। বরং আওয়ামী লীগের পথ এবং কৌশলকেই আরও শক্ত করে ধরে রেখেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। আর বিএনপি সরকারও জনগণকে ভয় দেখানোর ধারালো হাতিয়ার হিসেবেই সামনে রাখছে এই আইনকে।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়
ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com