বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নেতৃত্ব: যোগ্যতা, সামঞ্জস্য ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন 

ড. খালিদুর রহমান
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শীর্ষ প্রশাসনিক পদে ২০২৬ সালে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েক দফায় উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অন্তত ৩০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগের তথ্য প্রকাশিত হয়। পরে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে ৬ জন উপাচার্য, ১১ জন উপ-উপাচার্য এবং ৮ জন কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। ফলে কয়েক মাসের ব্যবধানে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রশাসনের নেতৃত্ব কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

এই নিয়োগপর্বের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনও একক অনুষদের সর্বত্র একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। তবে ব্যবসায় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের উপস্থিতি বিশেষভাবে দৃশ্যমান, বিশেষ করে কোষাধ্যক্ষ এবং কয়েকটি উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য পদে। পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রকৌশল, কৃষি, সামাজিক বিজ্ঞান, মানবিক ও ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষকরাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে নিয়োগের মূল্যায়ন শুধু কোন অনুষদ থেকে কতজন এসেছেন, সেই সংখ্যাগত হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।

প্রার্থীর অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাও একইসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

২৭ জুলাই প্রকাশিত নিয়োগের তালিকা এই বৈচিত্র্যকে স্পষ্ট করে। নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক। হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক। কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পেয়েছেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক। সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পেয়েছেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক। ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি বাংলাদেশে উপাচার্য হয়েছেন মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক।

এই নিয়োগগুলোর বিষয়গত পটভূমি তুলনা করলে দেখা যায়— কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে খাদ্য প্রকৌশল, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল এবং কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যার শিক্ষকের নিয়োগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক প্রকৃতির সঙ্গে যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিপরীতে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ এবং ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি বাংলাদেশে মার্কেটিংয়ের শিক্ষককে নেতৃত্বে আনার সিদ্ধান্ত ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন সামনে আনে। ফলে একই ধরনের পদে নিয়োগ হলেও প্রার্থীর বিষয়গত পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশনের মধ্যে সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে সমান নয়।

উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদেও বিষয়ভিত্তিক বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য হয়েছেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক এবং কোষাধ্যক্ষ হয়েছেন দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক। রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য হয়েছেন চিত্রকলা বিভাগের অধ্যাপক এবং কোষাধ্যক্ষ হয়েছেন লোকসংস্কৃতি ও সমাজ উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য হয়েছেন মৃত্তিকা বিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং কোষাধ্যক্ষ হয়েছেন কীটতত্ত্বের অধ্যাপক। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য হয়েছেন মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক এবং কোষাধ্যক্ষ হয়েছেন অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক।

একই ধারায় রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরকৌশল, মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দু, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এন্টোমোলজি, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রবিজ্ঞান এবং ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক উপ-উপাচার্যের দায়িত্ব পেয়েছেন। কোষাধ্যক্ষ পদে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিং এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন।

এই তালিকা থেকে ব্যবসায় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের শক্তিশালী উপস্থিতি স্পষ্ট হয়। যখন একই নিয়োগ পর্বে কোনও নির্দিষ্ট অনুষদের শিক্ষক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে ধারাবাহিকভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন এবং সেই প্রবণতার পেছনে প্রার্থী বাছাইয়ের কোনও কাঠামোগত প্রভাব ছিল কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।

এই জায়গাতেই সার্চ কমিটির ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে পুনর্গঠিত ছয় সদস্যের ভিসি সার্চ কমিটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ইউজিসির একজন সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে কোনও নির্দিষ্ট সদস্য একাধিক নিয়োগে কতটা প্রভাব রেখেছেন, বিশেষ করে তার নিজস্ব অ্যাকাডেমিক পরিমণ্ডলের শিক্ষকেরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেয়েছেন কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তর অনুমানের ভিত্তিতে দেওয়া উচিত নয়। কমিটির কার্যবিবরণী, প্রার্থী তালিকা, মূল্যায়নপত্র, সুপারিশের ক্রম এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নথি পর্যালোচনা করেই বিষয়টি যাচাই করা সম্ভব।

কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই। তবে একই ব্যক্তি যদি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের সুপারিশ প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালী অবস্থানে থাকেন এবং পরবর্তীকালে সংশ্লিষ্ট সদস্যের নিজ বিভাগ, অনুষদ, প্রতিষ্ঠান বা ঘনিষ্ঠ পেশাগত পরিমণ্ডলের ব্যক্তিরা ধারাবাহিকভাবে নিয়োগ পান—তাহলে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, প্রভাব বিস্তারের সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরপেক্ষতা নিয়ে তদন্তের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই তদন্ত কোনও ব্যক্তিকে আগেভাগে অভিযুক্ত করার জন্য নয়, বরং নিয়োগ প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ ছিল কিনা, তা প্রমাণের জন্য। সার্চ কমিটির দায়িত্ব কেবল নাম সুপারিশ করা নয়—প্রার্থীর গবেষণা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা, নৈতিকতার রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতির সঙ্গে তার যোগ্যতার সামঞ্জস্য বিবেচনা করাও সেই দায়িত্বের অংশ।

তবে নতুন নিয়োগের গুণগত মান বিচার করতে হলে অনুষদভিত্তিক উপস্থিতির পাশাপাশি পূর্বসূরিদের সঙ্গে তুলনাও জরুরি। গবেষণা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, একাডেমিক নেতৃত্ব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যের ক্ষেত্রে নতুনরা কোথায় দাঁড়াচ্ছেন, সেই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সামগ্রিক মান সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন উপাচার্য পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক। তার পিএইচডি জাপানের তোয়ামা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে পোস্টডক্টরাল গবেষণার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। তার ৪০টির বেশি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ এবং প্রায় এক হাজার সাইটেশন রয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে তিনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে গবেষণা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার দিক থেকে তার প্রোফাইল যথেষ্ট শক্তিশালী।

তবে তার পূর্বসূরির অ্যাকাডেমিক প্রোফাইল ছিল আরও বিস্তৃত। লোকপ্রশাসন ও উন্নয়ন অধ্যয়নভিত্তিক এই শিক্ষাবিদের দুই শতাধিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও বই প্রকাশিত হয়েছে, ৫০টির বেশি গবেষণা স্কোপাস সূচিভুক্ত জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং গুগল স্কলারে তার সাইটেশন ৪,৭৭১-এর বেশি ছিল বলে প্রকাশিত বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। অক্সফোর্ড, সোয়ানসি ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে পোস্টডক্টরাল গবেষণার পাশাপাশি তিনি আইইউবিতে প্রো-ভিসি ও ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের দায়িত্বও পালন করেছেন। ফলে নতুন উপাচার্যকে অযোগ্য বলা যায় না, কিন্তু গবেষণার ব্যাপ্তি, প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক প্রভাবের বিচারে তার পূর্বসূরির তুলনায় পার্থক্য স্পষ্ট।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে তুলনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন উপাচার্য মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষক। সুইডেনের গুটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স এবং অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জনের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার কার্টিন ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তিনি বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের ডিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তার অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক যোগ্যতা উল্লেখযোগ্য।

কিন্তু তার পূর্বসূরি ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি, দুই শতাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র এবং প্রায় ৬,৭০০ সাইটেশন তার আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রভাবের শক্তিশালী সূচক। ফলে গবেষণা উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক গবেষণা-প্রভাবের সূচকে দুই প্রোফাইলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। এই তুলনা নতুন উপাচার্যের প্রশাসনিক সক্ষমতা সম্পর্কে সরাসরি নেতিবাচক সিদ্ধান্ত দেয় না—বরং দেখায় যে, গবেষণাগত উৎকর্ষের নিরিখে পূর্বসূরির অবস্থান ছিল ব্যতিক্রমীভাবে শক্তিশালী।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। নতুন উপাচার্য উদ্ভিদবিদ্যার শিক্ষক। নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি, কানাডায় পোস্টডক্টরাল গবেষণা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ডেভিসে ভিজিটিং প্রফেসর ও গবেষক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ৫১টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রের পাশাপাশি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং হল প্রভোস্ট হিসেবেও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে গবেষণা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং বিষয়গত সামঞ্জস্যের দিক থেকে তার নিয়োগকে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র স্পষ্ট। নতুন উপাচার্য ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষক। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার ১৮টি গবেষণাপত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র একটি স্কোপাসে সূচিভুক্ত। এছাড়া, প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, Turnitin পরীক্ষায় তার পিএইচডি থিসিসে ৫৪ শতাংশ প্লেজারিজম বা অ্যাকাডেমিক চৌর্যবৃত্তির উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বিপরীতে সদ্যবিদায়ী উপাচার্যের গবেষণাপত্র ছিল ২১৯টির বেশি। তিনি হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন, জার্মানির গটিংটেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা অধ্যাপক এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করেছেন। ফলে গবেষণা ও আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক অভিজ্ঞতার তুলনায় ব্যবধানটি এখানে বেশ বড়।

তবে উপাচার্যের যোগ্যতা কেবল প্রকাশনার সংখ্যা, সাইটেশন কিংবা বিদেশি ডিগ্রির মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় না। উপাচার্যকে বাজেট পরিচালনা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক নিয়োগ, অ্যাকাডেমিক পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারের সঙ্গে সমন্বয়সহ বহুমাত্রিক প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে একজন অত্যন্ত শক্তিশালী গবেষক প্রশাসক হিসেবেও সফল হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে প্রশাসনিক দক্ষতা থাকলেই অ্যাকাডেমিক নেতৃত্বের সব প্রয়োজন পূরণ হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়নের জন্য গবেষণার পরিবেশ, আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক প্রবণতা এবং উচ্চশিক্ষা নীতি সম্পর্কে গভীর ধারণাও প্রয়োজন।

এই ভারসাম্যের প্রশ্নটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য বিজ্ঞান, প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট আন্তবিষয়ক গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়া। ফলে শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনের সময় প্রার্থীর প্রশাসনিক সক্ষমতার পাশাপাশি তার অ্যাকাডেমিক পটভূমি, গবেষণার ক্ষেত্র এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশনের সঙ্গে বিষয়গত সামঞ্জস্যও বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি নিয়োগ এই জায়গাতেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক, গাজীপুরের ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি বাংলাদেশে মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপক এবং পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি বিভাগের শিক্ষককে শীর্ষ নেতৃত্বে আনার সিদ্ধান্ত তাই নিছক ব্যক্তিগত যোগ্যতার প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না—বরং এসব নিয়োগ সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক চরিত্র, গবেষণার অগ্রাধিকার এবং ঘোষিত বিধান ও মিশনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেই বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে।

এখানে জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রশ্নটিও সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠদান ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান নয়—বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি জাতীয় চেতনা, ইতিহাসবোধ, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বিএনপি সরকার নিজেকে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার সরকার হিসেবে উপস্থাপন করায় জাতীয়তাবাদী মূল্যবোধে বিশ্বাসী শিক্ষকেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে আসবেন, এমন রাজনৈতিক প্রত্যাশা অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই প্রত্যাশাকে কখনোই মেধাভিত্তিক নিয়োগের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। একজন শিক্ষক রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হলেই তিনি অযোগ্য হয়ে যান না— একইভাবে রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ্য প্রমাণিত হন না।

ফলে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, কোনও প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়োগের সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত সুবিধা তৈরি করেছে কিনা এবং তার অ্যাকাডেমিক, গবেষণাগত ও প্রশাসনিক যোগ্যতার তুলনামূলক মূল্যায়ন যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কিনা।

সামগ্রিকভাবে ২০২৬ সালের নিয়োগের গুণগত মানকে এককথায় উন্নত কিংবা অবনত বলা যায় না। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি কৃষি ও প্রকৌশলভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক প্রোফাইল যথেষ্ট শক্তিশালী। তবে ঢাকা, রাজশাহী ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে পূর্বসূরিদের গবেষণা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও অ্যাকাডেমিক প্রভাবের তুলনায় নতুনদের অবস্থান কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল। ফলে এসব নিয়োগকে সার্বিক মানোন্নয়ন কিংবা সর্বাত্মক অবনতি, কোনোভাবেই বলা যায় না।

তবে ব্যবসায় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পুনরাবৃত্ত উপস্থিতি, কয়েকটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়গত অসামঞ্জস্য এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের সম্ভাব্য প্রভাব একত্রে বিবেচনা করলে স্বাধীন ও নথিভিত্তিক তদন্তের প্রয়োজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোন প্রার্থী কীভাবে বাছাই হয়েছেন, সার্চ কমিটি কীভাবে তাদের মূল্যায়ন করেছে, সুপারিশের ভিত্তি কী ছিল এবং কোনও প্রভাব বা স্বার্থের সংঘাত কাজ করেছে কিনা, এসব তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। কারণ প্রকাশিত সংবাদ

প্রতিবেদনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগসহ নিয়োগ বাতিল ও দায়িত্ব গ্রহণের পর পদচ্যুতির ঘটনাও এসেছে। অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই নির্ধারিত হওয়া উচিত—তবে এসব প্রশ্ন উপেক্ষা না করে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রক্রিয়াগত যথার্থতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
শিক্ষার্থী ধর্ষণ: মামলার এক সপ্তাহ পর মাদ্রাসায় অভিযান, গ্রেফতার নেই
শিক্ষার্থী ধর্ষণ: মামলার এক সপ্তাহ পর মাদ্রাসায় অভিযান, গ্রেফতার নেই
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ
কোক স্টুডিও ভারত নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য আতিফ আসলামের
কোক স্টুডিও ভারত নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য আতিফ আসলামের
জনবল নেবে যমুনা ব্যাংক, ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন
জনবল নেবে যমুনা ব্যাংক, ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন
সর্বশেষসর্বাধিক