১৩ মামলা হওয়ার পরও কেন ১৪তম অপরাধের অপেক্ষা? 

শফিক আর. ভূঁইয়া
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০

জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের সড়কে গত ২৯ আগস্ট ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে স্কুলশিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের মৃত্যু আমাদের অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সম্ভবত তাঁর মৃত্যুর পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্যেই লুকিয়ে আছে।

র‌্যাব জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল সন্দেহভাজন মোশারফ হোসেন পনি ওরফে পনি গাজী ওরফে প্যারা পনি একজন পেশাদার ছিনতাইকারী। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর তেজগাঁও, শেরেবাংলা নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক বিক্রি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপরাধে তার জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মোট ১৩টি মামলা রয়েছে।

১৩টি মামলা! সংখ্যাটি একটু ভেবে দেখার মতো। কারণ আমরা এমন কোনও অপরাধীর কথা বলছি না, যার পরিচয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অজানা। সে কোনও অচেনা মুখ না, যাকে একটি অপরাধের পর হঠাৎ করে শনাক্ত করতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মাদকের মামলা আছে, চুরি ও সিঁধেল চুরির মামলা আছে, ভয়ভীতি প্রদর্শনের মামলা আছে, ডাকাতির প্রস্তুতির মামলাও আছে। অর্থাৎ অপরাধের অভিযোগে তার দীর্ঘ ইতিহাস রাষ্ট্রের নথিতে থাকার কথা।

তাহলে প্রশ্ন হলো—১৩টি মামলা থাকার পরও সে কীভাবে আবারও অপরাধ করার সুযোগ পেলো? ‘মামলা থাকা মানেই অপরাধী প্রমাণিত হওয়া নয়’, এটা ঠিক। আইনের দৃষ্টিতে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ। এই মৌলিক নীতির সঙ্গে আপসের কোনও সুযোগ নেই। কিন্তু আরেকটি বিষয়ও আছে। কারও বিরুদ্ধে যখন একের পর এক অপরাধের মামলা হয়, তখন আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তার সম্পর্কে একটি ঝুঁকি-চিত্র তৈরি হওয়ার কথা।

সে কোথায় থাকে, কোন এলাকায় সক্রিয়, কী ধরনের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে—এসব তথ্য তদন্ত ও অপরাধ প্রতিরোধের কাজে ব্যবহৃত হওয়ার কথা। অর্থাৎ আইনের চোখে সে নির্দোষ; কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধের দৃষ্টিতে তার সম্পর্কে তথ্য অজানা থাকার কথা নয়।

এখানেই রনজিনা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনাটি আমাদের আরও বড় প্রশ্ন করতে বাধ্য করে। আমরা কি অপরাধ প্রতিরোধ করি, নাকি অপরাধ ঘটার পর তার প্রতিক্রিয়া দেখাই? রনজিনা পারভীনের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে র‌্যাব সন্দেহভাজন দুই জনকে গ্রেফতার করেছে।

ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়েছে। প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে তেজগাঁওয়ের পূর্ব তেজতুরী বাজার থেকে তাঁদের আটক করা হয়েছে। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। হত্যাকাণ্ডের তদন্তে দ্রুত সাফল্য পাওয়া ভুক্তভোগীর পরিবার এবং সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই দ্রুততার মধ্যেই আরও একটি প্রশ্ন লুকিয়ে আছে।

যে প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য এবং অভিযান চালানোর সক্ষমতা দিয়ে ২৪ ঘণ্টায় একজন সন্দেহভাজনকে খুঁজে বের করা সম্ভব, সেই সক্ষমতা কি ২৪ ঘণ্টা আগে, কিংবা ২৪ দিন আগে ব্যবহার করা যেত না?

অবশ্যই প্রতিটি মামলার তদন্তের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া আছে। আগের ১৩টি মামলার কোনটিতে কী হয়েছে, সেগুলোর তদন্তের অগ্রগতি কী, চার্জশিট হয়েছে কিনা—এসব তথ্য ছাড়া কাউকে বা কোনও প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি দায়ী করা ঠিক হবে না। কিন্তু প্রশ্নটি তবু থেকে যায়।

একজন মানুষকে কতবার অপরাধের তালিকায় দেখতে পেলে তাকে আমরা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করবো? দুটি মামলা? পাঁচটি? দশটি? নাকি তেরোটিও যথেষ্ট নয়? আমাদের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হয়তো এখানেই— আমরা অপরাধীর অতীতকে ভবিষ্যৎ অপরাধের ঝুঁকি হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব দেই না। একটি মামলা যদি একটি আলাদা ঘটনা হয়ে থাকে, দ্বিতীয় মামলা আরেকটি, তৃতীয় মামলা আরেকটি। কিন্তু একজনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে মামলা হতে থাকলে—সেই ঘটনাগুলো একসঙ্গে দেখে তার অপরাধের ধরন ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেটিই আসল প্রশ্ন।

বিশ্বের অনেক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় অপরাধ প্রতিরোধের বড় অংশই হলো ঝুঁকি শনাক্ত করা। কে বারবার একই ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে, কোন এলাকায় নির্দিষ্ট ধরনের অপরাধ বাড়ছে, কোন ব্যক্তি মামলা চলাকালে আবার অপরাধে জড়ানোর ঝুঁকিতে আছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশকে আগাম ব্যবস্থা নিতে হয়। আমাদেরও সেই জায়গায় যেতে হবে।

কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ শুধু অপরাধের পর অপরাধী ধরা না। অপরাধ ঘটার আগেই যদি মানুষকে নিরাপদ রাখা যায়— সেটি হবে তাদের আরও বড় সাফল্য। একজন ছিনতাইকারী যখন একজন পথচারীর মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায়, সেটি নিছক একটি মোবাইল হারানোর ঘটনা না। সেই ব্যক্তি যদি পরদিন আরেকজনকে ছিনতাই করে, তার পরদিন কাউকে আহত করে, একদিন কারও মৃত্যু ঘটায়—তাহলে আগের ছোট ছোট অপরাধগুলো আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না। সেগুলো ভবিষ্যতের বড় বিপদের সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়।

রনজিনা পারভীনের মৃত্যু আমাদের সেই সতর্কবার্তাটিই নতুন করে দেখিয়ে দিলো। একজন স্কুলশিক্ষিকা চিকিৎসার জন্য স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন। রাজধানীতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি ছিনতাইকারীর টানে পড়ে প্রাণ হারালেন। এটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়। এটি শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থারও একটি পরীক্ষা।

আমরা প্রায়ই বলি, ‘অপরাধীকে দ্রুত গ্রেফতার করা হয়েছে।’ কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত— অপরাধীকে কি তাঁর পরবর্তী অপরাধের আগেই শনাক্ত করা হয়েছিল? কারণ একটি অপরাধের পর দ্রুত গ্রেফতার করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ভালো লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু বারবার একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এমন অবস্থায় পৌঁছাতে না দেওয়া, যেখানে সে আরও একজন নিরীহ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে— সেটিই হতে পারে আরও প্রশংসনীয়।

রনজিনা পারভীনের মৃত্যুর পর পনি গাজী গ্রেফতার হয়েছেন। এখন তদন্ত হবে, আদালতে বিচার হবে। আইন তার নিজস্ব পথে চলবে। কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য আরেকটি তদন্তও জরুরি হতে পারে— ১৩টি মামলা থাকা একজন ব্যক্তি কীভাবে ১৪তম অভিযোগের কেন্দ্রে এসে দাঁড়ালো?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু পনি গাজীর বিষয়ে নয়। এটি আমাদের পুরো অপরাধ দমন ব্যবস্থা নিয়েই। কারণ আমরা যদি অপরাধের ইতিহাস জানি, মামলা জানি, সক্রিয় এলাকা জানি—তবু পরবর্তী অপরাধের অপেক্ষায় থাকি, তাহলে সমস্যা শুধু অপরাধীর নয়। সমস্যা তখন আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থারও। আর শেষ পর্যন্ত, একটি ভালো আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সাফল্য কতজন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, শুধু তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত না। কতজন নিরীহ মানুষকে অপরাধের শিকার হওয়া থেকে বাঁচানো গেছে— সাফল্যের আসল মাপকাঠি সেটাই হওয়া উচিত।

লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
স্ত্রী চলে যাওয়ায় শ্যালককে হত্যা: এক মাস পর মিললো কঙ্কাল
স্ত্রী চলে যাওয়ায় শ্যালককে হত্যা: এক মাস পর মিললো কঙ্কাল
নেপালে ৯ দিন সুড়ঙ্গে বন্দি থাকার পর যেভাবে বাঁচলেন দুই শ্রমিক
নেপালে ৯ দিন সুড়ঙ্গে বন্দি থাকার পর যেভাবে বাঁচলেন দুই শ্রমিক
সাবিনা ইয়াসমীনকে নিয়ে যা বললেন রুনা লায়লা
সাবিনা ইয়াসমীনকে নিয়ে যা বললেন রুনা লায়লা
আর্জেন্টিনার হয়ে বিদায়ী ম্যাচ খেলবেন মেসি?
আর্জেন্টিনার হয়ে বিদায়ী ম্যাচ খেলবেন মেসি?
সর্বশেষসর্বাধিক