পরিসংখ্যান দেখে চমকে যেতে হয়। জানা যাচ্ছে যে, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এই ১২ বছর ৩ মাসে বাংলাদেশে ৭০ হাজার ৯৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ৯৭ হাজার ৪০৬ জন এবং পঙ্গু হয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৭০০ জন।
এমন পরিসংখ্যান প্রতি মাসেই প্রকাশ হয়। এগুলো যখন পড়ি, তখন মনে হয়, আমাদের এখানে সড়ক দুর্ঘটনা এমন এক মাত্রায় পৌঁছেছে যে একে দেশের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা উচিত।
সংখ্যাগুলোই আসলেই বিস্মিত করার মতো। অনেক বছর ধরে, প্রতি বছরের চিত্র একই রকম। এগুলোকে আমরা কেবলই কিছু বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা বলে মনে করবো? এগুলো প্রতি বছর একই রকমভাবে চলতে থাকা এক নির্মম ধারাবাহিকতা। অনেক গবেষক মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি, কারণ অনেক দুর্ঘটনার খবর পরিসংখ্যানে কখনোই উঠে আসে না।
গড়ে এখানে প্রতিদিন প্রায় ৬৬ জন মানুষ রাস্তায় প্রাণ হারাচ্ছেন। তার অর্থ হচ্ছে, প্রতি ঘণ্টায় প্রায় তিন জন মানুষ চলে যাচ্ছেন। জনস্বাস্থ্য নিয়ে শিরোনাম হওয়া অনেক রোগের প্রাদুর্ভাবেও একদিনে এত মানুষ মারা যায় না। সেই হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনা শুধু আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার সমস্যা নয়– আমি মনে করি এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট।
আসুন, অন্য মৃত্যুর কারণগুলোর সঙ্গে এর তুলনা করে দেখি। বাংলাদেশে এখন মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর বড় অংশই অসংক্রামক রোগ, যেমন- স্ট্রোক, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্টজনিত অসুখ, ক্যানসার এবং ডায়াবেটিস। এসব রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি, কারণ এগুলো মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে এবং দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে জড়িত। সড়ক দুর্ঘটনা এসব রোগের মতো নয়। সড়কে মৃত্যু হঠাৎ করেই হয় এবং মারা যান তরুণ ও অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় নাগরিকরা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের কিশোর ও তরুণদের মৃত্যুর প্রধান কারণই সড়ক দুর্ঘটনা। তাদের মৃত্যুর প্রায় ২০ শতাংশের জন্য দায়ী সড়ক দুর্ঘটনা।
বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন। এ নিয়েও অনেক আলোচনা-গবেষণা হয়েছে। তবে এর চেয়ে প্রতিদিন বেশি মারা যান সড়ক দুর্ঘটনায়– ৬৬ জন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনা এমন কোনও ঘটনা নয়, যা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প বা বন্যা– এসবই প্রাকৃতিক শক্তির কারণে ঘটে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় সবই প্রতিরোধ-যোগ্য। গবেষকেরা অনেকবার কিছু সাধারণ কারণের কথা উল্লেখ করেছেন—বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো এবং বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা।
আমরা যখন একটি বিপর্যয় প্রতিরোধ করতে পারি, কিন্তু প্রতি বছর চোখের সামনে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ চলে যাচ্ছে, তখন সেটি শুধু একটি দুর্ঘটনা বা ট্র্যাজেডি থাকে না, এটি হয়ে যায় নীতিনির্ধারণের এক ব্যর্থতা।
এত দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক পরিণতিও বেশ ভয়াবহ। যারা মারা যান বা আহত হন—তারা দেশের বহু পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী সদস্য। খবরের কাগজে জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনার মৃত অর্ধেকেরও বেশি মানুষ পরিবারের উপার্জনের প্রধান ভরসা। এমন মানুষ মারা গেলে সেই পরিবার হঠাৎ করেই দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যাবে তা আমরা জানি। একটি পুরো পরিবার একদিনের মধ্যে তাদের আর্থিক স্থিতি হারিয়ে ফেলে।
জাতীয় অর্থনীতিও এক বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। দুর্ঘটনায় আহত অনেক মানুষ দীর্ঘমেয়াদি প্রতিবন্ধকতায় ভোগেন, ফলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়, তাদের চিকিৎসা ব্যয় প্রয়োজন হয় এবং তারা আসলে পিছিয়ে পড়েন। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক বছরের ব্যবধানে পরিবহন দুর্ঘটনার কারণে দেশের অর্থনীতিতে ১০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে।
এত প্রভাব থাকা সত্ত্বেও সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা অন্য অনেক দুর্যোগের মতো আমাদের মনে কোনও প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। ঘূর্ণিঝড়ে শত শত মানুষ মারা গেলে সেটিকে জাতীয় ট্র্যাজেডি ঘোষণা করতে আমরা দেখেছি। কিন্তু প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ মারা গেলে সেই মৃত্যুগুলো যেন নিত্যদিনের ঘটনা বলেই আমাদের কাছে মনে হয়।
সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা বলি। চলতি বছরের মার্চ মাসে, একটি যাত্রীবাহী বাস ফেরিতে ওঠার সময় পদ্মা নদীতে পড়ে যায় এবং অনেক মানুষ মারা যান। ঘটনাটি কিছু সময়ের জন্য শিরোনামে স্থান করে নেয়, তারপর কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেই, আমরা আবার অন্য কোনও খবরের দিকে মনোযোগ দেই। কিন্তু এই মৃত্যুগুলোর পেছনের কারণগুলো, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা এবং দুর্বল নিরাপত্তা তদারকি, সবই অপরিবর্তিতই থেকে যায়। যেন এই মৃত্যুগুলো কোনও ব্যাপার ছিল না।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়াই সম্ভবত এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক। সমাজ হিসেবে আমরা যেন এগুলোকে অবশ্যম্ভাবী বলে ধরে নিয়েছি, মেনে নিয়েছি। আমার কাছে মনে হয় মেনে নেওয়া আসলে আমাদের বুদ্ধির এক অসক্ষমতা এবং নির্বিকার জাতি হয়ে ওঠার প্রমাণ। আমরা এক ধরনের মানসিক নাম্বনেসে ভুগছি। বিশ্বের অনেক দেশ অনেক আগেই কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ, নিরাপদ সড়কের নকশা, উন্নত চালক প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে এনেছে। আমরা পারিনি এবং মনে হচ্ছে আমরা পারবো না।
আমাদের যে মানসিকতার পরিবর্তন তা অনেকবার আমরা ভেবেছি, কিন্তু সেই পরিবর্তন আসছে না, আসবে না।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে দেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা শুধু প্রতীকী কোনও পদক্ষেপ নয়; এটি করলে নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টিকে এখন যেভাবে দেখেন, সেটি হয়তো বদলাতে পারে। দুর্যোগের মর্যাদা দেওয়া হলে সমন্বিত জাতীয় কৌশল, জরুরি অর্থায়ন এবং মৃত্যুহার কমানোর জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক হয়ে উঠতে পারে।
মৃত্যু যদি দুর্যোগের স্বীকৃতি পায়, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যেতে পারে। আমরা যখন বুঝবো যে সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যদিনের কোনও ঘটনা নয়, বরং একটি জাতীয় বিপর্যয়, তখন আমরা জবাবদিহি দাবি করবো বেপরোয়া চালক, পরিবহন মালিক এবং আইন প্রয়োগে ব্যর্থ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। এখন তো কোনও দাবিই করি না।
আমরা চাইলে অনেক বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নিতে পারি। সেগুলো কী, তা আমরা জানি। কিন্তু আমরা ব্যবস্থা নেই না। এখানেই আমাদের নৈতিকতারও প্রশ্ন। প্রতিরোধযোগ্য ঘটনায় হাজার হাজার নাগরিক মারা গেলেও, তা প্রতিরোধ করার জ্ঞান থাকলেও সেটিকে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার তাগিদ বোধ করি না। তাহলে এমন সমাজ কেমন সমাজ?
ইকরাম কবীর: কথাসাহিত্যিক