কৃচ্ছ্রতা-সাধন হোক অপচয়ে, বিনিয়োগে নয় 

ড. খালিদুর রহমান
০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:০০ আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:০০

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পের জন্য জ্বালানি কেবল উৎপাদনের উপাদান নয়, পুরো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম ভিত্তি। গ্যাসের চাপ কমে গেলে কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চিত হলে উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হয়, যন্ত্রপাতির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যায় না, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব কর্মসংস্থান, ব্যবসা, রফতানি, বিনিয়োগ, রাজস্ব ও মানুষের জীবনযাত্রায় পৌঁছে যায়। ফলে জ্বালানি সংকটকে শুধু শিল্পমালিকের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে শ্রমিক, সরবরাহকারী, পরিবহন, ব্যাংক, বাজার ও ভোক্তাদের স্বার্থও জড়িত।

সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ শতাংশে নামিয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, অনির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, ঋণের উচ্চ ব্যয় ও অন্যান্য কাঠামোগত বাধাকে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

উৎপাদন কমে গেলে অর্থনীতিতে একই সময়ে দুটি চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর হওয়ায় আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যেতে পারে। পাশাপাশি পণ্যের সরবরাহ কমলে মূল্যস্তরের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়ে। জ্বালানি সংকট তাই শুধু বিদ্যুৎ, গ্যাস কিংবা শিল্প উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক কল্যাণও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

এমন পরিস্থিতিতে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি অর্থবছরে সরকার নতুন যানবাহন, ভবন নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ ও অধিকাংশ বিদেশভ্রমণের মতো ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। পরিচালন ও উন্নয়ন উভয় ধরনের ব্যয় কমানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু কৃচ্ছ্রতাসাধনের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত। ব্যয় কমাতে গিয়ে যদি প্রয়োজনীয় উন্নয়ন বিনিয়োগও থেমে যায়, তাহলে সংকট কাটানোর পরিবর্তে ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাত্র ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে, যা অন্তত পাঁচ দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা, ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি টাকা।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও উন্নয়ন ব্যয়ের গতি উদ্বেগজনকভাবে কম। জুলাই ও আগস্টে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং অন্তত ১৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম বাস্তবায়ন হার। ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে প্রায় ১৭টি তাদের বরাদ্দের ১ শতাংশেরও কম ব্যয় করেছে, পাঁচটি কোনো ব্যয়ই করেনি।

অপরদিকে, জ্বালানি খাতেই বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পর মার্চ থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৬০ কোটি টাকা, দৈনিক লোকসান ছিল প্রায় ৮৩ কোটি টাকা। সীমিত সম্পদের ভারসাম্য রক্ষা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে অর্থের সুষম বণ্টনের প্রয়োজন বিবেচনায় সরকার জ্বালানি ভর্তুকি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

এই বাস্তবতা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয়ের ক্ষেত্রেও নতুন করে অগ্রাধিকার নির্ধারণের দাবি রাখে। সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোজ, অতিরিক্ত আপ্যায়ন, অপ্রয়োজনীয় অনুষ্ঠান কিংবা সাময়িক জনপ্রিয়তা অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কোনও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে এমন অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ঘটনা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে অবশ্যই ব্যয়ের যৌক্তিকতা, অনুমোদন ও জনস্বার্থের বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের সঙ্গে জনগণের কর, রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জড়িত। ফলে প্রশাসনিক পদে থাকা ব্যক্তির ব্যক্তিগত পছন্দ কিংবা স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের ওপরে স্থান পেতে পারে না। ভোজ, অতিরিক্ত আপ্যায়ন কিংবা বিশেষ সুবিধা সাময়িক সন্তুষ্টি দিতে পারে। একই অর্থ গবেষণা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো কিংবা জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলে তার সুফল বহু বছর ধরে পাওয়া সম্ভব।

বিশ্ববিদ্যালয় কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এর যানবাহন, ভবন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সরঞ্জাম ও আর্থিক সম্পদ প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ। এসব ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইন, বিধি, অনুমোদিত নীতিমালা ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের ঈদে বাড়ি ফেরার মতো মানবিক প্রয়োজন থাকলে নীতিসম্মত, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী পরিবহনব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের সংস্কৃতি তৈরি করা উচিত নয়।

অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানি সাশ্রয়ী অবকাঠামো, গবেষণা, শিক্ষার মান উন্নয়ন ও ডিজিটাল ব্যবস্থায় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ব্যয় কমাতে পারে। শক্তিসাশ্রয়ী আলোকব্যবস্থা, দক্ষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমিতি এবং পানি ব্যবস্থাপনার উন্নতিও পরিচালন ব্যয় কমাতে পারে।

সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগের শিক্ষাগত মূল্যও রয়েছে। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, পরিবেশ, অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনার শিক্ষার্থীরা বাস্তবভিত্তিক গবেষণার সুযোগ পেতে পারে। ফলে একই বিনিয়োগ আর্থিক সাশ্রয়, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জ্ঞানচর্চায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল দিতে পারে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের জ্বালানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের বাস্তব উদাহরণ হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

কৃচ্ছ্রতাসাধনের প্রকৃত অর্থ এখানেই। কৃচ্ছ্রতাসাধন মানে নির্বিচারে কম খরচ করা নয়; কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় কমিয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও উৎপাদনশীল খাতে সম্পদ স্থানান্তর করা। কোনও খাতে অর্থ ব্যয় করার অর্থ একই অর্থ অন্য খাতে ব্যবহারের সুযোগ হারানো। তাই অনুমোদিত হলেই কোনও ব্যয় সর্বোত্তম ব্যয় হয়ে যায় না। ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা, প্রত্যাশিত ফলাফল, সুযোগব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তবে কৃচ্ছ্রতাসাধনের নামে প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দেওয়াও সমানভাবে অনুচিত। গবেষণা বন্ধ করা, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ বিলম্বিত করা, গবেষণাগার অচল রাখা কিংবা শিক্ষার্থীদের অপরিহার্য সুবিধা কমানো আর্থিক সংযম নয়। প্রকৃত সংযমের লক্ষ্য হওয়া উচিত অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে প্রয়োজনীয় ও উৎপাদনশীল ব্যয় সুরক্ষিত রাখা।

সরকারের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, সীমিত রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের সময়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো দরকার। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস, রেল, যোগাযোগ, শিল্প অবকাঠামো, গবেষণা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নবায়নযোগ্য শক্তির মতো দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধিকারী খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা জরুরি। উন্নয়ন ব্যয়ের দুর্বল বাস্তবায়ন যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে আজকের সাশ্রয় আগামী দিনের উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতিতে পরিণত হতে পারে।

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাই একটি মৌলিক নীতি সামনে আনছে: কৃচ্ছ্রতাসাধনের সাফল্য কত টাকা কম খরচ হলো, শুধু তা দিয়ে মাপা যাবে না; বরং সেই সাশ্রয় কতটা উৎপাদনশীল ও টেকসই খাতে পুনর্নির্দেশ করা গেল, তা দিয়েও বিচার করতে হবে। রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে সাময়িক প্রদর্শনের চেয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা, গবেষণা, শিক্ষা, অবকাঠামো, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতায় বিনিয়োগের গুরুত্ব বেশি।

জনগণের অর্থ সীমিত। সেই অর্থের প্রতিটি ব্যবহারে তাই প্রশ্ন থাকা উচিত, ব্যয়টি কতটা জনমূল্য সৃষ্টি করছে। সংকটের সময়ে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় শুধু ব্যয় কমানো নয়; প্রয়োজনীয় ব্যয় রক্ষা, অপচয় বন্ধ এবং সাশ্রয়কে ভবিষ্যতের সক্ষমতায় রূপান্তর করা। আজকের সংযম যদি আগামী দিনের উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, জ্বালানি ব্যয় কমায়, গবেষণা শক্তিশালী করে এবং জনসেবার মান উন্নত করে, তবেই কৃচ্ছ্রতাসাধন অর্থবহ হবে। সংকটকালে রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রয়োজন লোকদেখানো সাশ্রয় নয়, সুপরিকল্পিত ও টেকসই বিনিয়োগ।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মাউশির জরুরি নির্দেশনা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মাউশির জরুরি নির্দেশনা
হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা তদারকিতে মাঠে নামছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ৫৪ কর্মকর্তা
হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা তদারকিতে মাঠে নামছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ৫৪ কর্মকর্তা
মেসির বিদায়ী ম্যাচ নিয়ে স্ক্যালোনি, ‘মনুমেন্টালে পাঁচটি স্টেডিয়াম থাকলে সবই পূর্ণ হয়ে যেত’
মেসির বিদায়ী ম্যাচ নিয়ে স্ক্যালোনি, ‘মনুমেন্টালে পাঁচটি স্টেডিয়াম থাকলে সবই পূর্ণ হয়ে যেত’
রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় জামিনের পর হত্যা মামলায় গ্রেফতার সাবেক সিইসি হাবিবুল
রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় জামিনের পর হত্যা মামলায় গ্রেফতার সাবেক সিইসি হাবিবুল
সর্বশেষ সর্বাধিক