গাজীপুরে প্রতিদিন গড়ে দেড় জনের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় করছেন। পুলিশের হিসাবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট, এই ২০ মাসে জেলায় ঘটেছে ৯৫১টি আত্মহত্যা। মাসে প্রায় ৪৮টি। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে ঘটনা বেশি। সংবাদ-এর প্রতিবেদন এ তথ্য সামনে এনেছে।
সংখ্যাটি ভয়াবহ। তার চেয়েও ভয়াবহ একটি শূন্যতা। এই ৯৫১ জনের কতজন কী পেশায় যুক্ত ছিলেন, কতজন কর্মহীন, কতজন বকেয়া মজুরির অপেক্ষায়, তা কেউ জানে না। থানার নথিতে পেশা, কর্মস্থল বা মৃত্যুর আগের আর্থিক সংকট নিয়মিত লেখা হয় না। যা মাপা হয় না, তা ঠেকানোও যায় না।
আত্মহত্যার কোনও একক কারণ নেই। পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য সংঘাত, দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা, অসুস্থতা, সহিংসতা, একাকিত্ব, আর্থিক সংকট সবই ভূমিকা রাখে। তবু ঝুঁকির উপাদান কোথায় জমছে, সে প্রশ্ন তোলা যায়। গাজীপুরে জমেছে এক জায়গায়। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা তরুণ-তরুণী থাকেন পরিবার থেকে দূরে, ভাড়া ঘরে, অনিশ্চিত কাজে, বাড়তি ব্যয়ের চাপে। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, সামাজিক সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্নতা সংকট গভীর করে।
জাতীয় চিত্রও উদ্বেগজনক। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে আত্মহত্যা ১৩ হাজার ৪৯১, দিনে গড়ে ৪১। আঁচল ফাউন্ডেশনের হিসাবে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রতি লাখে আত্মহত্যার হার ২০২৪ সালের প্রায় ১৮ থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ১৯-এ উঠেছে। দেশজুড়ে ঊর্ধ্বমুখী এই প্রবণতার মধ্যেই গাজীপুরের সংখ্যাটি পড়ে।
কাজ আছে, নিশ্চয়তা নেই
গত কয়েক মাসে গাজীপুরের কারখানাপাড়ার ছবি অনিশ্চয়তার। ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কোনাবাড়ীতে কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানের ফটকে ছাঁটাইয়ের তালিকা টানানো হলো। শ্রম আইনের ২০ ধারার উল্লেখ করে এক নোটিশে ৬১৩ জনের চাকরি গেলো। বছরের শুরুতে আরেক কারখানায় মাসে তিন-চার জন করে ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে অসন্তোষ দেখা দিলে কর্তৃপক্ষ কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। মে মাসে ভোগড়ার এক কারখানায় অন্তত ২০ শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যান। চিকিৎসকেরা একে ‘ম্যাস সাইকোজেনিক ডিজিজ’ বলেছেন। এ ধরনের ঘটনায় কর্মক্ষেত্রের চাপ প্রায়ই জড়িয়ে থাকে।
জাতীয় ছবিও একই দিকে। বিজিএমইএ’র তথ্যে ৮০টি সদস্য কারখানায় ১৯ হাজার ১৮৮ জন ছাঁটাই হয়েছেন, বন্ধ হয়েছে ২৭টি কারখানা। আরেক বিশ্লেষণে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে চারশ’র বেশি কারখানার স্থায়ী বন্ধের কথা এসেছে। উৎপাদন কমলে ওভারটাইম কমে। ছাঁটাই না হলেও আয় কমে।
ঝুঁকি সবার জন্য সমান নয়। পোশাক খাতের শ্রমিকদের বড় অংশ নারী। ভাড়া ঘরে একা বা সন্তানসহ থাকা, ঘরে ও কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা, পরিবারের একমাত্র আয়ের ভরসা হওয়ার চাপ, সব মিলিয়ে নারী শ্রমিকের মানসিক চাপ আলাদা মনোযোগ দাবি করে। নারী শ্রমিকদের নিয়ে আলাদা তথ্য কি আছে?
মজুরি: সেই কবে ঠিক হয়েছিল
২০১৮ সালে ন্যূনতম মজুরি ছিল ৮ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তা ১২ হাজার ৫০০ টাকা ঘোষণা হয়, কার্যকর হয় ডিসেম্বরে, সঙ্গে বছরে ৫ শতাংশ বৃদ্ধির শর্ত। এই অঙ্কের মূল মজুরি মাত্র ৬ হাজার ৭০০ টাকা। বাকিটা ভাতা। তিন বছর পূর্ণ হতে চলেছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো জানিয়েছে, সংশোধিত শ্রম আইন ২০২৬ ন্যূনতম মজুরি পুনর্মূল্যায়নের মেয়াদ পাঁচ থেকে তিন বছরে নামিয়েছে। অথচ ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মজুরি বোর্ড পুনর্গঠনের দৃশ্যমান উদ্যোগ ছিল না। ওই দিন শ্রমিক নেতারা ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বোর্ড গঠন এবং ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকরের দাবি করেছেন। সম্প্রতি এক সমাবেশে উঠেছে ৩০ হাজার টাকার দাবি। দাবিটি কতটা বাস্তবসম্মত, তা দরকষাকষির বিষয়। কিন্তু দাবির এই উল্লম্ফন আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যবধানের মাপ।
এর মধ্যে ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। এক সপ্তাহে আটা, ডিম, দুধ, ডাল ও সবজির দাম বেড়েছে। ডিমের ডজন এখন ১৬০ টাকা। ঘরভাড়া, খাবার, যাতায়াত আর গ্রামে পাঠানো টাকার হিসাব মেলানো আগের চেয়ে কঠিন। ঋণ জমার ঝুঁকিও বাড়ে।
রাষ্ট্রের ব্যর্থতা কোথায়
প্রথম ব্যর্থতা তথ্যে। পুলিশের হিসাবে ২০২৪ সালে দেশে আত্মহত্যা ১৩ হাজার ৯২০। অথচ জাতীয় জরিপভিত্তিক হিসাবে ২০২৩ সালেই ২০ হাজার ৫০৫। দুই হিসাবের এ ফারাক বলে দেয়, নজরদারি দুর্বল ও খণ্ডিত।
দ্বিতীয় ব্যর্থতা আইনে। আত্মহত্যার চেষ্টা আজও অপরাধ। সেপ্টেম্বরে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এটি অপরাধ নয়, বর্তমান আইন সমস্যা বাড়াচ্ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক বলেছেন, ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে অপরাধী ভাবা যাবে না। যে আইন সাহায্য চাওয়া মানুষকে অপরাধী করে, সে আইন তাকে চুপ করিয়ে দেয়। মন্তব্য যথেষ্ট নয়। চাই সংশোধনের সময়সূচি।
তৃতীয় ব্যর্থতা সেবায়। সরকার উপজেলা থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত সমন্বিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনার কথা বলছে। কিন্তু পরিকল্পনা আর কারখানাপাড়ায় একজন প্রশিক্ষিত মানুষের উপস্থিতি এক নয়। গাজীপুরে শিল্প পুলিশ আছে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য। শ্রমিকের মানসিক নিরাপত্তার জন্য কোনও প্রতিষ্ঠান আছে?
চতুর্থ ব্যর্থতা শ্রম প্রশাসনে। ছাঁটাইয়ে আগাম নোটিশ, বকেয়া পরিশোধ ও ক্ষতিপূরণের বিধান আইনেই আছে। প্রতি পূর্ণ বছরের জন্য ৩০ দিনের মজুরি বা গ্র্যাচুইটি, যেটি বেশি। প্রশ্ন প্রয়োগের। শ্রম আইন ২০২৬ এপ্রিলে প্রণীত হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো এর পূর্ণ বাস্তবায়ন ও বিধি প্রণয়নের দাবি তুলেছে। সংকটে ঋণ আর প্রণোদনার আলোচনা হয় মালিকের জন্য। শ্রমিকের আয়-নিরাপত্তার আলোচনা সেখানে ক্ষীণ।
করণীয়
প্রথমত, আত্মহত্যার প্রতিটি ঘটনায় বয়স, লিঙ্গ, পেশা, কর্মস্থল ও পূর্ববর্তী সংকটের তথ্য নথিভুক্ত করতে হবে। পুলিশ, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও শ্রম অধিদফতরের যৌথ জেলাভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার চাই। ব্যক্তির পরিচয় গোপন রেখে প্রতি তিন মাসে তা প্রকাশ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, কারখানায় মানসিক সহায়তা বাধ্যতামূলক হোক। বড় কারখানায় প্রশিক্ষিত কল্যাণ কর্মকর্তা ও গোপন পরামর্শের ব্যবস্থা থাকবে। সুপারভাইজারদের সংবেদনশীলতা-প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কলকারখানা পরিদর্শনের তালিকায় কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ যুক্ত হবে। ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, বাড়িওয়ালা, ওষুধের দোকানদার, শিক্ষক ও ইমামকে ‘প্রথম সাড়াদাতা’ হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, কারণ সংকটাপন্ন মানুষ প্রথমে এদের চোখেই পড়েন।
চতুর্থত, আয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অবিলম্বে মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাবে নতুন মজুরি ঠিক করতে হবে। ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধে বকেয়া পরিশোধ নিশ্চিত করতে মালিক, ক্রেতা ও সরকারের অংশগ্রহণে তহবিল গড়তে হবে। বেকার-সহায়তা ও রেশনের মতো সুরক্ষা যুক্ত হবে।
পঞ্চমত, সেবা শ্রমিকের নাগালে আনতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রশিক্ষিত জনবলসহ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করতে হবে। শিল্পাঞ্চলে সন্ধ্যা ও ছুটির দিনে ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক এবং জেলার প্রধান হাসপাতালে নিয়মিত মনোরোগ সেবা দরকার।
ষষ্ঠত, গণমাধ্যম ও সমাজের দায় আছে। আত্মহত্যার খবর পদ্ধতির বিবরণ বা নাটকীয়তা ছাড়া, সহায়তার পথনির্দেশসহ প্রকাশ করতে হবে। পরিবারকে চিনতে শেখাতে হবে লক্ষণ। নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, হতাশার কথা বলা, ঘুম বা আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন। আর শেখাতে হবে একটি সহজ কাজ— পাশে বসে কথা বলা। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়।
ঝুলে থাকা প্রশ্ন
৯৫১ জনের কতজন শ্রমিক? ৬১৩ জনের কতজন বকেয়া ও ক্ষতিপূরণ বুঝে পেয়েছেন, কতজন নতুন কাজ পেয়েছেন? ডিসেম্বরে তিন বছর পূর্ণ হলে মজুরি বোর্ড কি প্রস্তুত থাকবে, নাকি সময়সীমা নিঃশব্দে পেরিয়ে যাবে? ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর ছাঁটাই কি বাড়বে? শীতে ভাড়া, ধারদেনা আর গ্রামের পরিবারের প্রত্যাশা একসঙ্গে চাপ দিলে একা থাকা তরুণ শ্রমিকের পাশে কে দাঁড়াবে? ৪ অক্টোবর থেকে ঘোষিত শ্রমিক কর্মসূচিতে তাঁদের কথা কি শোনা হবে, নাকি কথা বলার জায়গাই সংকুচিত হবে? আর যারা সাহায্য চাইতে ভয় পান, কারণ চেষ্টাটাই অপরাধ, তাঁদের কী হবে?
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল দেশের অর্থনীতি সচল রাখে। সেই সচলতার ভেতরে যারা ক্লান্ত, ঋণগ্রস্ত বা নিঃসঙ্গ, তাঁদের কণ্ঠ থানার নথিতেও ওঠে না। ৯৫১ একটি সংখ্যা নয়, ৯৫১টি পরিবার। রাষ্ট্র যতদিন এ মৃত্যুগুলো গুনতে, বুঝতে ও ঠেকাতে শিখবে না, ততদিন রফতানি-প্রবৃদ্ধির প্রতিটি খবরের নিচে এই নীরবতা জমতে থাকবে।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক