হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিছক একটি স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় নয়—এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। যখন প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে একের পর এক শিশু আক্রান্ত হয়, শত শত শিশু জীবন হারায়, আবার হাজার হাজার শিশু ঝুঁকির মধ্যে পড়ে—তখন এটিকে কেবল একটি দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। বিশেষত যখন প্রশ্ন ওঠে, দীর্ঘ সময় ধরে টিকার সরবরাহে ঘাটতি ছিল এবং বহু শিশু প্রয়োজনীয় সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তখন বিষয়টি প্রশাসনিক ব্যর্থতার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার আলোচনায় প্রবেশ করে।
হাম এমন একটি সংক্রামক রোগ, যা আধুনিক চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার যুগে কার্যকর টিকাদানের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগগুলোর একটি, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। তবে একইসঙ্গে এটি একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগও বটে। নিয়মিত, সুষম ও বিস্তৃত টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে হামজনিত মৃত্যু প্রায় সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। বহু দেশ ইতোমধ্যে এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে এনে জনস্বাস্থ্য সাফল্যের উদাহরণ স্থাপন করেছে। বাংলাদেশও দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে শিশু মৃত্যুহার কমাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
এখানে মৌলিক প্রশ্নটি হলো—যদি হাম প্রতিরোধযোগ্য হয়, তবে কেন এখনও শিশুরা মারা যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক দক্ষতা, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যখন কোনও দেশে প্রতিরোধযোগ্য রোগে মৃত্যুর হার বাড়তে শুরু করে, তখন সাধারণত তিনটি সংকটের ইঙ্গিত পাওয়া যায়—টিকা সরবরাহে ঘাটতি, টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সরকারি নজরদারির ব্যর্থতা। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এই তিনটি প্রশ্নকেই সামনে এনেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো টিকা সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বা ঘাটতির অভিযোগ। একটি রাষ্ট্র যদি শিশুদের জীবনরক্ষাকারী টিকার ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেটি কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়—এটি নীতিগত ব্যর্থতারও ইঙ্গিত দেয়। কারণ টিকা কোনও বিলাসপণ্য নয়, এটি জীবনরক্ষাকারী মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা। সরবরাহ ব্যবস্থার সামান্য ব্যাঘাতও জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রকে জনগণের স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতেও স্বাস্থ্য অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর সর্বোচ্চ মানের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশ এই সনদের স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। ফলে শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করা কেবল নীতিগত দায়িত্ব নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতাও।
এই বাস্তবতায় টিকার ঘাটতি বা বিতরণ ব্যর্থতার ফলে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটলে সেটি শুধু জনস্বাস্থ্য সংকট থাকে না, বরং তা মানবাধিকারের প্রশ্নে রূপ নেয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো জীবন রক্ষা করা—বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—টিকার সরবরাহ নিশ্চিত হলো না কেন? কোথায় ব্যর্থতা ছিল? এটি কি পরিকল্পনাগত দুর্বলতা, ক্রয় ব্যবস্থাপনার জটিলতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা, নাকি সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি? এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল অনুমাননির্ভর হলে চলবে না, বরং তা হতে হবে তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে।
এ কারণেই একটি স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ তদন্ত এখন অপরিহার্য। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, মহামারি গবেষক, প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। এই কমিটির দায়িত্ব হবে টিকা সরবরাহ ব্যর্থতার প্রকৃত কারণ উদঘাটন, দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়ানোর জন্য কার্যকর নীতিগত সুপারিশ প্রদান।
তবে এই সংকটে সরকারের কেবল প্রশাসনিক ব্যাখ্যা বা সহানুভূতিমূলক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। যদি তদন্তে প্রমাণিত হয়— অবহেলা, দায়িত্বহীনতা, প্রশাসনিক গাফিলতি বা নীতিগত ব্যর্থতার কারণে টিকা সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং তার ফলেই শিশুর মৃত্যু ঘটেছে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব। কেননা, জবাবদিহি ছাড়া কোনও ব্যবস্থা টেকসই হতে পারে না।
আমরা এমন একটি রাষ্ট্র প্রত্যাশা করি, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা অধিকার হিসেবে নিশ্চিত হবে, অনুগ্রহ হিসেবে নয়। যেখানে টিকার অভাবে কোনও শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়বে না এবং যেখানে প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য ঘটনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র স্বচ্ছভাবে দায় স্বীকার করবে, তদন্ত করবে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী