শিক্ষামন্ত্রীর একটি ‘বক্তব্য’ নিয়ে তুলকালাম শুরু হয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, ‘এরা তো ফার্মের মুরগি, একটু ভিজলেই জ্বর চলে আসবে’। শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যকে ধরে তার পদত্যাগ চেয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে। পরে শিক্ষামন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষাটি পুনরায় নেওয়ার ঘোষণা দেন। টানা বর্ষণ, বন্যা ও জলাবদ্ধতায় দেশের অনেক এলাকায় পরীক্ষায় অংশ নিতে দুর্ভোগ হয়। যদিও দেশের পাহাড়, চর, হাওর, বিল অঞ্চলে শিক্ষার্থীর প্রশ্নহীন দুর্ভোগ নিয়ে কখনোই আলাপ ওঠে না। যাহোক শিক্ষার্থীরা তাদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলাতে ক্ষেপেছেন আর মন্ত্রী এর জন্য দুঃখও প্রকাশ করেছেন। এই ঘটনা নানা বার্তা দিলেও ‘ফার্মের মুরগি’ বিষয়ে একটা বার্তা জনপরিসরে প্রবলভাবে স্পষ্ট হয়েছে।
‘ফার্মের মুরগি’ দুর্বল। এই প্রজন্ম নিজেরা ‘ফার্মের মুরগি’ হতে চায় না। মন্ত্রীও চান না কেউ ‘ফার্মের মুরগি’ হোক। জনগণ এবং জনপ্রতিনিধি কেউই যদি ‘ফার্মের মুরগি’ না চাই, তাহলে প্রশ্ন আসে এই ‘ফার্মের মুরগি’ থাকার দরকার কী?
আমাদের ভোকাবুলারিতে শব্দচয়ন, বিশেষণ, রূপক, ম্যাটাফোর বা ব্যঞ্জনাগুলো আমাদের চারপাশ থেকেই আসে। পাখি, মাছ, গাছ, নদী, মাটির সাথে আমরা মানুষের তুলনা দেই। কোনও অভিজ্ঞ নির্ভরতার মানুষকে আমরা বলি ‘তিনি আমাদের বটবৃক্ষ’। কাউকে বলি ‘মাটির মতো সর্বংসহা’। ‘পাখির মতো তারা কিচিরমিচির করে’ কিংবা কোনও ঘটনায় বলি ‘মাছের মায়ের পুত্রশোক’। শিশুদের নিয়ে ‘ফুলের মতো পবিত্র’ কিংবা ‘নদীর মতো বহমান’ এসব বহুল ব্যবহৃত ম্যাটাফোর। প্রাণিজগতের কারোর সাথে তুলনা করে বিশেষণ বা ম্যাটাফোর ব্যবহারে সকলক্ষেত্রে আমাদের প্রতিক্রিয়া একইরকম নয়। এটি বাইনারি এবং কলোনিয়াল। স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক হেজিমনি তাড়িত। কখনও আমরা কোনও বিশেষণ সগর্বে উদযাপন করি, আবার কখনও ক্ষুব্ধ হই।
‘গর্দভ’, ‘কুকুর’, ‘বিলাই’, ‘কুনোব্যাঙ’, ‘উটপাখির মতো মাথা লুকানো’, ‘গন্ডারের চামড়া’, ‘হাতির মতো’, ‘শিয়ালের মতো চতুর’, ‘দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষা’ কিংবা ‘গরুর মতো খায়’ এসব বললে আমরা সচরাচর ক্ষেপে যাই। কোনও প্রাণী বা উদ্ভিদকে মানুষের জন্য ইতিবাচক বা নেতিবাচক বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করা কিন্তু প্রতিবেশবাদী চিন্তা নয়। এর ভেতর দিয়ে কোনও প্রাণসত্তাকে প্রবলভাবে মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে স্টেরিওটাইপ করে ফেলা হয়। একইসাথে সেই প্রাণপ্রজাতির জন্য ঝুঁকি ও তার প্রতি মানুষের সমাজের এক বিরূপ বৈরী অভ্যাস তৈরি হতে থাকে। যেকোনও প্রাণীকে নিয়ে এমন আচরণ অন্যায়। মানুষের এই তীব্র ‘অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে বৈষম্যের গণিতকে প্রতিষ্ঠা করে।
‘ফার্মের মুরগির’ নিজেরও ব্যক্তিসত্তা আছে। ‘একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর আসা প্রজন্মকে’ বোঝানোর জন্য ‘ফার্মের মুরগির’ বিশেষণ টানার দরকার নাই। এর আগে পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই প্রজন্মকে ‘ফার্মের মুরগি’ বলেছিলেন। বলেছিলেন, ঢাকা শহরে এরা বিল্ডিংয়ের ভেতর ‘ফার্মের মুরগির’ মতো বড় হচ্ছে। বিগত প্রধানমন্ত্রী বা বর্তমানের শিক্ষামন্ত্রী সকলেই নতুন প্রজন্মকে ‘ফার্মের মুরগি’ হিসেবে চিহ্নিত করলেও কেউ এই মুরগি-ব্যবস্থার দায় নিতে চাননি। ফার্মের-মুরগি ব্যবস্থা আসমান থেকে ঝরে পড়েনি বা পাতাল ফুঁড়েও বেরুয়নি। রাষ্ট্র ফার্মের-মুরগি ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা ও জায়েজ করেছে।
বিল্ডিংয়ের ভেতর বড় হওয়া প্রজন্ম ‘ফার্মের মুরগি’ হয়ে যাচ্ছে বোঝার পরেও রাষ্ট্র কোনও দায়িত্ব পালন করেনি। প্রজন্মের কাছ থেকে সব খেলার মাঠ, উদ্যান, পার্ক লুটে নিয়েছে। অল্প বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর আসে এটি জানার পরেও রাষ্ট্র প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তৎপর হয়নি। বিষাক্ত বাতাস, দূষিত পানি এমনকি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে প্রতারণা করে চলেছে। বরং এই ‘ফার্মের মুরগি’ প্রজন্মই রাষ্ট্রের অনাচারকে জানবাজি রেখে প্রশ্ন করেছে নিজেদের ভাষা ও ভঙ্গিতে। নতুন প্রজন্ম, নীতিনির্ধারক এবং জনগণ সকলেই ‘ফার্মের মুরগির’ ম্যাটাফোরকে একইভাবে পাঠ করছে। ‘ফার্মের মুরগির’ ম্যাটাফোর আমাদের সামনে বৈষম্যমূলক খাদ্য, উৎপাদন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশগত সংকটকে হাজির করে। ‘ফার্মের মুরগি’ বললে এক ‘দুর্বল’, ‘অনিরাপদ’, ‘বন্দি’, ‘বিস্বাদ’ ও ‘রুগ্ন’ চেহারা ভেসে ওঠে। আমাদের আকাঙ্ক্ষা ও আর্জিতে দেশি ও বুনো মুরগির মুক্ত লড়াকু ইমেজ প্রতিষ্ঠিত আছে। আমরা ‘ফার্মের মুরগির’ মতো খাঁচাবন্দি দুর্বল হতে চাই না। তাহলে মুরগিকে খাঁচাবন্দি করে দুর্বল ও অনাকাঙ্ক্ষিত করে রাখছে যে নিওলিবারেল ব্যবস্থা, তার বিরুদ্ধে আলাপ নাই কেন?
যে প্রজন্ম ‘ফার্মের মুরগি’ ম্যাটাফোর বিরোধিতা করে দাঁড়ালেন তাদের ধন্যবাদ। যে শিক্ষামন্ত্রী তার ভুল বুঝতে পারলেন তাকেও ধন্যবাদ। কিন্তু এর মাধ্যমে কি ‘ফার্মের মুরগি ব্যবস্থা’ বাতিল হয়ে গেল? যদি মন্ত্রী পদত্যাগও করতেন কিংবা সাবেক সরকার প্রধানতো পতিতও হয়েছিলেন কিন্তু তাতে কি ‘ফার্মের মুরগি ব্যবস্থার’ কোনও পরিবর্তন ঘটেছে? বরং ‘ফার্মের মুরগি ব্যবস্থা’ প্রতিনিয়ত সকল রেজিমে রাষ্ট্রীয় মদতে দশাসই এবং বৈধ হয়ে টিকে থাকছে। এমনকি যে প্রজন্ম ‘ফার্মের মুরগি’ মানতে পারছেন না, তারা কি এই ব্যবস্থার বদল চান? বরং এই প্রজন্ম ‘ফার্মের মুরগির’ অন্যতম প্রধান ভোক্তা, কারণ নিওলিবারেল ব্যবস্থা এটি তাদের ওপরে চাপিয়ে দিয়েছে। চলতি আলাপে আমরা ‘ফার্মের মুরগি ব্যবস্থাকে’ খতিয়ে দেখার চেষ্টা করবো। কারণ ম্যাটাফোর কী বিশেষণের বিরোধিতার ভেতর দিয়ে হলেও এই ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করেছে নতুন প্রজন্ম।
‘ফার্মের মুরগি’ বলে মুরগির কোনও আলাদা প্রজাতি নাই। এরা দুর্বিনীত লাল বনমোরগেরই বংশধর। প্রায় ছয় হাজার বছর আগে বুনো এই জাতকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে গৃহপালিত করা হয়েছে। দুনিয়ায় মুরগির আরও কিছু প্রজাতি থাকলেও গৃহপালিত লাল বনমোরগ নিয়েই ১৯২০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিক খামার গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে বহু হাইব্রিড তৈরি হয়। গড়ে ওঠে খামারবন্দি মুরগির এক বিশাল বাণিজ্য। মুরগির খাদ্য, ওষুধ, খামারের উপকরণ ঘিরে তৈরি হয় নতুন নতুন কোম্পানি। তৈরি হয় কেএফসি, পিৎজাহাট, জলিবি, নান্দোস কিংবা পপেইসের মতো ফুডচেইন। দেশি মুরগিকে ফার্মবন্দি করে গড়ে ওঠা এই বহুজাতিক বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে ক্রেতা-ভোক্তার রুচি ও সামাজিক স্ট্যাটাস। এই বাজারের অন্যতম ভোক্তা হয়েও আজ নতুন প্রজন্ম এই নিওলিবারেল মুরগি ব্যবস্থার প্রতি তাদের ক্ষোভ জানিয়েছে।
ফার্মের মুরগি ব্যবস্থা মূলত সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের একটি বৈশ্বিক প্রকল্প। ষাটের দশকে ফসলভিত্তিক কৃষি উৎপাদন বন্দি হয় ‘সবুজ বিপ্লব প্রকল্পের’ মাধ্যমে। হাজার হাজার দেশীয় শস্য ফসলের জাতকে খুন করে চাপিয়ে দেওয়া হয় সিনথেটিক সার, বিল, কৃত্রিম সেচ আর হাইব্রিড বীজের বাণিজ্য। আজ ধান, গম, ভুট্টার মতো কিছু শস্যের উৎপাদন বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু ভেঙে পড়েছে জনস্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্র। কঠিন দুরোরোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
ঠিক একইভাবে মাংস ও ডিমের উৎপাদনের ছুতায় গড়ে তোলা হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ ফার্মের মুরগি ব্যবস্থা। বহু গবেষণায় ফার্মের মুরগিতে সিসা, ক্যাডমিয়ামের মতো ক্যানসার সৃষ্টিকারী ভারী ধাতু মিলেছে। একইসাথে এই খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা জলবায়ু দূষণের জন্যও দায়ী।
ফার্মের মুরগি বিরোধিতাকারী নতুন প্রজন্মের খাদ্যব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের এই ইতিহাস জানা জরুরি। কারণ এই ব্যবস্থাই গচি, টেপী, রাধুনীপাগল, লক্ষ্মীদীঘা, বোয়ালের দাঁত, খবরক, গ্যাল্লং, তিলবাজাল, পংখীরাজ কিংবা পোড়াবিনি ধানদের লুট করে চাপিয়ে দিয়েছে নাম্বারঅলা ও হাইব্রিড ধানের বাজার। এই ব্যবস্থা একইভাবে গলাছিলা, রাতা, আসিল, কোঁকড়া দেশি মুরগির জাতকে হটিয়ে হাজির করেছে ফার্মের মুরগির দোকান। ফার্মের মুরগি বিরোধিতাকারী নতুন প্রজন্মের কাছে দেশের ধান কিংবা মুরগির বৈচিত্র্য এক অজানা অধ্যায়।
সকল দাগ, ক্ষত, অন্যায় আর বাহাদুরি গোপন করেই বৈধতা পেয়েছে ‘ফার্মের মুরগি ব্যবস্থা’।
মুরগি বা শিক্ষার্থীদের কী দোষ? মুরগি বা শিক্ষার্থীদের চারধারে জারি থাকা বন্দিবলয়গুলোকে দৃশ্যমান করা দরকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান প্রায় ১৬ শতাংশ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (২০২৪) হিসাবে দেশে পোল্ট্রি মুরগির মাংস উৎপাদন হয় প্রায় ২.৯৯ লাখ টন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা (২০০৩) থেকে জানা যায়, দেশের মাংস উৎপাদনের প্রায় ৫১ ভাগ আসে ফার্মের মুরগি থেকে। ফার্মের মুরগি বিরোধিতাকারী প্রজন্মের এক বিশাল অংশের কর্মসংস্থান হয় মুরগির ফার্মে। আমরা যদি ফার্মের মুরগি না চাই, ফার্মের মুরগি হতে না চাই, কেউ এমন অন্যায় ম্যাটাফোর ব্যবহার করবে তা না চাই
তাহলে চলমান ফার্মের মুরগি ব্যবস্থার আমূল রূপান্তর দরকার। ফার্মের মুরগি বিরোধিতাকারী নতুন প্রজন্ম, মন্ত্রী, জনগণ ও রাষ্ট্র কী এই দায়িত্ব নেবে? একটা চিকেন-ফ্রাই, মোরগ পোলাও বা চিকেন সসেজে কামড় দেওয়ার আগে আমরা কি ভাববো এটাই ‘ফার্মের মুরগি’।
রাতা নামের এক গভীর পানির ধান ছিল হাওরে। রাতা মুরগির লালঝুঁটির মতো বুকপানিতে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি ছিল তার। আর আজ পাহাড়ি ঢলে একের পর এক তলিয়ে যাচ্ছে হাইব্রিড ধানের জমিন। শিয়াল বা বাজপাখি থেকে তীক্ষ্ম নখর দিয়ে এক গাদা বাচ্চাকে রক্ষা করতে জানে গলাছিলা মুরগি। জমিন থেকে জলা পুরো গ্রাম মুখস্থ থাকে দেশি মুরগির।
নিজেরাই খুঁটে খায়, খরা কী বর্ষায়, দুর্যোগ কী মহামারিতে গা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়ায়। আর কয়েক হাত খাঁচার ভেতর গাদাগাদি করে বড় হওয়া ফার্মের মুরগি অল্প চাপেই নেতিয়ে যায়।
নির্দয় খামারিরা এসব মুরগির ঠোঁট কেটে দেয়। নিষ্ঠুরভাবে মুরগির গতরে মাংস বাড়ায়। প্রাণিকল্যাণ আইন থাকার পরেও প্রতিদিন আমাদের সামনে গাদাগাদি করা মুরগির খাঁচার গাড়ি প্রশ্নহীনভাবে আসা-যাওয়া করে। নতুন প্রজন্ম বুঝতে পেরেছে এই ‘ফার্মের মুরগি’ এক বন্দি ও স্থবির ব্যবস্থার প্রতীক। এই বন্দিদশা থেকে মুরগি ও প্রজন্মের মুক্তি জরুরি।
সরকার পতন বা মন্ত্রীর পদত্যাগ এই বন্দিদশা চুরমার করতে পারে না। রাতা মোরগের মতো প্রান্তর কাঁপিয়ে নিজের ভাষায় ডাক দেওয়ার প্রস্তুতিতেই আছে মুক্তির বার্তা। বিশ্বাস রাখি নতুন প্রজন্ম এই ডাক বহন করে চলেছে।
পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক
ই-মেইল: [email protected]



