প্রকৃত অর্থে সুখী হওয়ার জন্যে ‘সময় সম্পর্কে’ নারী ও পুরুষ দুজনেরই ধারণা থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত সুখী হওয়ার জন্য কার কাছে কত অর্থ আছে, সেটা নিয়েই মানুষ ভাবেন ও সম্পদের হিসাব করেন। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ‘সম্পদ’ বলতে আসলে বোঝানো হয়েছে মানুষের হাতে থাকা সময় এবং সময়ের হিসাবের সাথে সম্পর্কিত বিষয়। একজন নারীকেও প্রকৃত সুখী হতে হলে তার হাতে থাকা সময়টাকে উপলব্ধি ও ব্যবহার করতে হবে। সেই সাথে নিজের জীবন সম্পর্কে ধারণাতেও পরিবর্তন আনতে হবে (সূত্র: মার্কিন কগনিটিভ সায়েন্টিস অধ্যাপক ল্যারি স্যান্টোস)।
পরিবারের মেয়েটি পড়াশোনা শিখে বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে, মাথা উঁচু করে চলবে, বাবা-মা ও পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে, সমাজের উপকার করবে, বই পড়বে, গান গাইবে, নাচবে, গবেষণা করবে, নিজের ইচ্ছায় চলবে, বন্ধুদের সাথে বেড়াতে যাবে, এককথায় মুক্ত আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়াবে—মেয়ের এই জীবনটার কথা বেশিরভাগ অভিভাবক যেমন ভাবতে পারেন না, মেয়েটি নিজেও সেটা ভাবে না বা তাকে ভাবতে শেখানো হয় না। মেয়ে মানে ভালো বউ বা ভালো মা হতে হবে। এর বাইরে তার কোনও স্বপ্ন থাকতে নেই, চিন্তাও করতে নেই। এ জন্য নারীর সুখ খুব সীমাবদ্ধ কিছু বিষয়কে ঘিরে আবর্তিত হয়, বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে।
নিজ নিজ কন্যাকে ভালবেসে আমরা রাজকন্যার আসনে বসাই। কিন্তু রাজ্যপাট কীভাবে চালাতে হয়, কীভাবে সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে, রাজকন্যাকে সেটা শেখাই না। আদরে, সোহাগে, ভাব-জৌলুসে রাজকন্যার জীবনটা যে সবসময় নাও কাটতে পারে, এই দিকটা নিয়ে ভাবি না। আর ভাবি না বলে ‘জীবনযুদ্ধ’ সম্পর্কে কোনও ধারণা দেই না।
অপ্রিয় হলেও আমাদের দেশে বেশিরভাগ পরিবারে, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারে মেয়েটিকে বড় করা হয়, পড়াশোনা ও কাজ করতে শেখানো হয় একটি ভালো বিয়ে দেয়ার জন্য। বড় হতে হতে মেয়েটির মাথায় ঢুকানো হয়, তুমি একজন মেয়ে, কাজেই তোমাকে নিয়ম-কানুন শিখে সংসারে মানিয়ে চলার মতো করে মনকে তৈরি করতে হবে। তারপর বিয়ে করে ভালো বউ হতে হবে এবং মা হয়ে নারী জীবন পূর্ণ করতে হবে। বিবাহিত নারীর সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, নারী যদি সন্তান জন্ম দিতে না পারেন, তবেই তার জীবন ব্যর্থ বলে মনে করা হয়। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, নারী নিজেও তাই মনে করেন।
বিয়ে মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু সেটিতে সীমাবদ্ধ নয়। একজন ছেলে যেমন নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য পড়াশোনা করে, মেয়ের ক্ষেত্রেও সেটাই প্রযোজ্য। শিক্ষা একজন মানুষকে ভালো সঙ্গী, ভালো অভিভাবক এবং সমাজের দায়িত্বশীল সদস্য হতে সাহায্য করে। সেটি ‘শুধু সংসার করা বা বিয়ের জন্য’ নয়, বরং তার পুরো জীবনের জন্য।
একটি ‘ভালো বিয়ে’ যদি মেয়ের নিজের ইচ্ছা, সম্মান, স্বাধীনতা ও সুখের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে সেটা সত্যিকারের ভালো নয়। তাই শুধু বিয়ে নয়—মেয়ের শিক্ষা, ক্যারিয়ার, মানসিক সুস্থতা ও ব্যক্তিগত পছন্দকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রাম বা শহরের, ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-নিরক্ষর, চাকরিজীবী, গৃহবধূ যাই হন না কেন, একজন নারীর জীবন সেই ভালো স্ত্রী হওয়া ও মাতৃত্বেই সীমাবদ্ধ করে দেয় সমাজ ও পরিবার। শুধু সন্তান নেই বলে তার অন্যান্য পরিচয় এবং অর্জন সবই তুচ্ছ হয়ে যায়। মা হতে না পারার জন্য কোনও কোনও ক্ষেত্রে নারীকে এমনভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয় যে শুধু সমাজ নয়, নারী নিজেও তার এই মা না হতে পারাটাকে চরম ব্যর্থতা বলে মনে করেন।
সোমা ইসলাম (ছদ্ম নাম) দীর্ঘদিন ধরে একটি চাইল্ডকেয়ার সেন্টারের দায়িত্বে আছেন। সেখানে উচ্চশিক্ষিত কর্মজীবী মায়েরা তাদের সন্তানকে রেখে যান। অথচ যখনই সেই ডে-কেয়ার সেন্টারে কোনও ঝামেলা হয় বা দায়িত্ব পালনে সামান্য কোনও ত্রুটি হয়, তখন মায়েদের অনেকেই ওই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ‘মা হতে না পারার’ বিষয়টিকে তুলে ধরে আক্রমণ করেন।
তারা নির্দ্বিধায় বলেন, ‘আপনি তো মা হতে পারেন নাই, কাজেই বাচ্চার দায়িত্ব ঠিকমতো সামলাতে পারেন না বা বুঝতে পারেন না।’ অথচ ওই কো-অর্ডিনেটর ভদ্রমহিলাটি প্রায় ১৫/১৬ বছর ধরে এই দায়িত্ব পরিচালনা করে আসছেন। কাজ করতে গেলে মানুষের ত্রুটি-বিচ্যুতি হতেই পারে, তাই বলে ওনার ‘মা না হতে পারা’র জন্য খোঁটা দেওয়াটা কোন শিক্ষার মধ্যে পড়ে? অথচ এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ওই কো-অর্ডিনেটর নারী মা হতে পেরেছেন কী পারেননি, এটা বিচার্য হতেই পারে না বা হওয়া উচিত নয়।
বিয়ে এবং মাতৃত্ব একজন নারীর জীবনে নিঃসন্দেহে খুব বড় বিষয়, কিন্তু বিয়ে বা মা হওয়াটাই শেষ কথা নয়। আর শেষ কথা নয় বলেই একজন মেয়েকে এমনভাবে তৈরি করা উচিত যেন সে নিজের জীবনকে ভালোবাসে, নিজের কাজ, দায়িত্ব, সুখ, দুঃখ, আনন্দ ও পূর্ণতাকে অনুভব করতে শেখে। অথচ বেশিরভাগ মেয়েকে ঠিক এর উল্টাটাই শেখানো হয়।
মা হতে না পারাটা যেমন নারীর একক ব্যাপার নয়, ঠিক তেমনই এই মা না হতে পারার সাথে তার কর্ম জগতের কোনও তুলনা হতে পারে না। শিক্ষিত নারীরাও যদি এটা না বুঝতে পারেন, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে আমরা কী প্রত্যাশা করতে পারি? সংসারে প্রবেশ করার পর বেশিরভাগ মেয়ের কাছে তার নিজ জীবন, নিজ ভাবনা, আনন্দ, সুখ এবং নিজস্ব সময় বলতে কিছু থাকে না।
সবই সংসার ও পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। গল্প, উপন্যাস পড়া, নাটক বা সিনেমা দেখা, বন্ধুদের সাথে সময় কাটানোর কোনও অবকাশ থাকে না। গ্রামীণ নারীর জীবন আরও কঠোর, আরও ম্লান, আরও অনেক বেশি সংকটে ভরা। ‘নিজস্ব পরিসর’ বা ‘বিনোদন’ বা ‘ইচ্ছা’ শব্দটার সাথে তাদের পরিচয় নেই বললেই চলে। অনেক মেয়ে নিজেরা যেমন জানেন না—কোনটা তাদের প্রায়োরিটি, কীসে প্রকৃত সুখ বা তাদের জীবনে প্রকৃত আনন্দ কোথায়? ঠিক তেমন অনেকে সুখকে উপভোগ করার মতো মানসিকতা নিয়ে বড় হয় না। নারীর সুখের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হচ্ছে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে না পারার কষ্ট।
কোনও মেয়ে যদি বিয়ে না করে নিজের একক জীবন কাটাতে চায়, তাকেও সেই চিন্তা থেকে সরে আসতে বাধ্য করা হয়, শুধু সমাজ কী বলবে এবং মা-বাবা না থাকলে অভিভাবক কে হবে এসব অজুহাতে। অভিভাবকরা মেয়ের ‘বিয়ে’কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন মূলত সামাজিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক কারণে গড়ে ওঠা একটি ধারণা থেকে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে দীর্ঘদিন ধরে বিয়েকে মেয়ের ভবিষ্যৎ স্থিতি ও নিরাপত্তার সঙ্গে জুড়ে দেখা হয়েছে।
বাবা-মায়েরা ভাবেন, তারা বেঁচে থাকতে থাকতে তাদের কন্যার জন্য আরেকজন অভিভাবক ঠিক করে দেওয়া উচিত। স্বামীই হবেন সেই অভিভাবক। অথচ স্বামীর কাছে কতজন মেয়ে নিরাপদে দিন কাটাচ্ছেন, স্বামীর দ্বারা প্রতারিত হয়ে কতজন নারীকে বাচ্চা নিয়ে একা জীবন কাটাতে হচ্ছে, কতজন নারী শ্বশুরবাড়িতে বিভিন্ন কারণে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, সেই তথ্য আজ আর অজানা নয়। সেজন্যই আমাদের কন্যাসন্তানকে এমনভাবে তৈরি করা উচিত যেন কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে, যেকোনও পরিস্থিতিকে সে সামলে নিতে পারে।
শুধু বিয়ের কথা বলছি কেন? কর্মজীবনে মেয়েটি কোথায় চাকরি করবেন, সেটাও নির্ধারিত হয় অভিভাবক বা স্বামীর দ্বারা। অনেক মেয়েই আছেন যারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পাস করে, সেখানে চাকরি পাওয়ার পরেও কাজে যোগ দিতে পারেন না, স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির মত নেই বলে। আমাদের বেশিরভাগ পরিবার মেয়েদের নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে নয়। সাধারণত মেয়েকে শেখানোও হয় না প্রয়োজন হলে একা বাঁচতে হবে কীভাবে?
গবেষণা বলে, কর্মজীবী নারীদের অনেকেই মনে করেন, অফিসের তুলনায় বাসায় নানা ধরনের চাপ অনেক বেশি। আরও অবাক করা বিষয় হচ্ছে, পুরুষরা বলেছেন তারা কর্মক্ষেত্রের তুলনায় ঘরেই বেশি সুখী।
এর কারণও সহজেই অনুমেয়। ঘরে ফিরে পুরুষটি রিল্যাক্স ফিল করেন। এদিকে নারীকে বাইরের কাজ করে ঘরে ফিরে পুরো সংসার সামলাতে হয় প্রায় একা হাতে। এই চিত্র বিশ্বের অনেক দেশেই দেখতে পাওয়া যায়।
নারীর মাথায় সেই ধারণাটাই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যা সমাজের জন্য সুখকর, সেটাই নারীর করণীয় হওয়া উচিত। যেমন ‘আমি নারী, আমিই সব পারি’র মতো ধারণা। তাই বেশিরভাগ নারী প্রশ্নই করতে পারেন না যে কেন নারীকেই সব সামলাতে হবে? নারী বা পুরুষ যখন একসাথে সংসার শুরু করেন, তখন তাদের দুজনেরই উচিত দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। যেসব সংসারে শুধু পুরুষ একা টাকা আয় করেন, সেসব সংসারে সাধারণত নারীই গৃহের সব দায়িত্ব পালন করেন। আর যেসব নারী ‘সব পারি’ মতবাদে বিশ্বাসী, তারা ঘর-দুয়ার, বাচ্চাকাচ্চা সব সামলে অফিসের কাজও সামলান। তবে অনেকেই পরিবারকে ভালোবেসেই সবকিছু গুছিয়ে করতে চান। একজন নারীর মূল্য বা যোগ্যতা শুধু ভালো স্ত্রী বা মা হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হতে পারে, কিন্তু একজন নারী একইসঙ্গে একজন মানুষ। তার নিজের চিন্তা, স্বপ্ন, প্রতিভা, পেশা, আগ্রহ, সৃজনশীলতা ও পরিচয় আছে।
জীবনে সুখী হতে চাইলে মনোবিজ্ঞানীরা কতগুলো পথ বাতলে দিয়েছেন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো, দিনের একটা সময় কিছুক্ষণের জন্যে নিজের জন্য রাখা, ধ্যান করা বা গান শোনা, বেড়ানো এবং ঘুমানো। বাংলাদেশে কতজন নারী সুখী হওয়ার এই পথগুলো ধরে চলতে পারছেন বা পারবেন?
মানুষের জীবন যেমন বহুমাত্রিক, তাদের জীবনদর্শনও একেক রকম। আধুনিক এই সময়ে এসে কেউ হয়তো পরিবার ও মাতৃত্বে পরিপূর্ণতা খুঁজে পান, আবার কেউ বিজ্ঞান, শিল্প, ব্যবসা, শিক্ষা, সমাজসেবা বা অন্য কোনও পথে নিজের জীবন গড়তে চান। অনেক নারী দুটোই সামলান। আবার কেউ বিয়ে বা সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। এগুলোর কোনোটাই একজন মানুষের মূল্য কমায় না।
মানুষের সুখেরও কোনও নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নাই। যে যেভাবে জীবনকে উপভোগ করেন, তার সেটাতেই সুখ। কিন্তু জীবনকে উপভোগ করার এই বিষয়টি আমাদের দেশের কতজন নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? বরাবরই তাদের ওপর ‘সুখের ধারণা’ চাপিয়ে দেয় পরিবার ও সমাজ, আর এটাই সবচেয়ে দুঃখজনক।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক