নির্যাতিত হওয়ার কথা স্বীকার করতে পৌরুষে বাধে কেন?

শাহানা হুদা রঞ্জনা
২৫ জুলাই ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ১৪:০০

প্রায় বায়ান্ন বছর আগে, শৈশবে একটি ঘটনা দেখে আমার ধারণা হয়েছিল—ছেলেরা বোধহয় দুর্বল এবং সংসারে মার খায়। আর নারীরা সবল, যারা মার দেয়। পাশের বাসায় রাতের বেলা হৈ-হুলস্থূল শুনে আব্বা-আম্মার সাথে দৌড়ে গেলাম। গিয়ে দেখলাম—ওই বাসার ভদ্রলোক খাটের ওপরে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন, আর ওনার স্ত্রী মাটিতে দাঁড়িয়ে হাতে ঝাড়ু নিয়ে ওনাকে শাসাচ্ছেন আর গালাগালি করছেন।

অবশ্য পরবর্তীকালে বুঝেছি, আমার ধারণা ভুল। পুরুষ স্ত্রীর হাতে মার খাচ্ছেন বা নির্যাতিত হচ্ছেন, এই ঘটনা বিশ্বজুড়েই খুব স্বাভাবিক নয়। স্বাভাবিক হচ্ছে পুরুষের দ্বারা নারী নির্যাতনের ঘটনা। নারীর হাতে কোনও পুরুষ লাঞ্ছিত হলে সমাজের মানুষ অবাক হয়ে যায়। অথচ পুরুষ নারীকে নিপীড়ন করলে সেটা খুব স্বাভাবিক বলে মনে হয়। নারীর হাতে নিগৃহীত হওয়াটা পুরুষের জন্য লজ্জার, কিন্তু নারীকে নিগ্রহ করাটা লজ্জার নয়।

পুরুষ যতই ‘বেডাগিরি’ দেখাক না কেন, সত্যিই কি পুরুষ সংসার জীবনে একেবারে নির্যাতিত হন না? এ বিষয়ে সামাজিক ও আইনি সচেতনতা এবং তথ্য-উপাত্ত তুলনামূলক কম হলেও বলা যায়, বাংলাদেশে পুরুষরাও তাদের স্ত্রী বা সঙ্গীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন। পুরুষ নির্যাতনের ঘটনাগুলো নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোর চেয়ে সংখ্যায় ও বর্বরতার দিক দিয়ে অনেক কম বলে প্রায়শই আলোচনায় উঠে আসে না। বাংলাদেশে পুরুষদের একটা অংশ শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক, যৌন ও সামাজিকভাবে নির্যাতিত হন।

অনেক পুরুষ নির্যাতনের শিকার হলেও তা প্রকাশ করেন না বা অভিযোগ দায়ের করেন না। প্রশ্নটা হচ্ছে কেন প্রকাশ করেন না?

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় যে ‘পুরুষ কাঁদে না’, ‘পুরুষ দুর্বল হয় না’। ফলে নির্যাতনের কথা বললে অনেকেই মনে করেন তাদের ‘পুরুষত্ব’ প্রশ্নবিদ্ধ হবে। নির্যাতিত হওয়া পুরুষের পক্ষে ‘শোভা পায় না’, বরং নির্যাতন করাটাই অধিক গর্বের। এটাই পুরুষত্বের সামাজিক ধারণা।

অনেক পুরুষই আশঙ্কা করেন, স্ত্রীর হাতে মার খাওয়ার কথা শুনে মানুষ হাসাহাসি করবে; স্ত্রীর কাছে মার খায় বলে অপমান করবে, যা খুব লজ্জার ও সামাজিক কলঙ্কের বিষয়। সন্তানের ভবিষ্যৎ, পারিবারিক সম্মান বা সামাজিক সম্পর্কের কথা ভেবে অনেকেই নীরব থাকেন। এমনকি পুরুষরা কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ নিতেও দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন।

কিন্তু সম্প্রতি ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ এবং এর অধীন যৌতুক আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে অযথা হয়রানি থেকে পুরুষদের সুরক্ষায় ‘পুরুষ নির্যাতন দমন ও প্রতিরোধ আইন’ নামে একটি নতুন আইন প্রণয়নের জন্য রিট করা হয়েছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় নির্যাতিত পুরুষেরা বিচার ও প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, নিউজ লিংকের নিচে অনেক ভুক্তভোগী পুরুষের মন্তব্য রয়েছে। যারা বলতে চেয়েছেন, এরকম একটা আইন দরকার। আইনজীবীদের পক্ষ থেকেও মাঝেমাঝে বলা হচ্ছে—পুরুষ ভুক্তভোগীদের ক্রমবর্ধমান কেস মোকাবিলায় ‘জেন্ডার নিরপেক্ষ আইন’ দরকার।

কিছু পুরুষ অভিযোগ করেছেন যে যৌতুক বা নারী নির্যাতনের মিথ্যা মামলা দায়ের করে তাদের ও তাদের পরিবারকে হয়রানি করা হয়। দুজন ছেলেকে দেখেছি যৌতুকের মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যেতে। মূলত ছেলে দুজনসহ তাদের পরিবারকে শাস্তি দেওয়ার জন্য মেয়ের বাড়ির লোকেরা এই অভিযোগ করেছিল।

বাংলাদেশ মেন’স রাইটস ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠন পুরুষ নির্যাতন দমন আইনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিল। সংগঠনটি জানিয়েছে তারা পুরুষদের কাছ থেকে নির্যাতনের অভিযোগ পাচ্ছেন। তবে আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে পারে না।

দেশে নারী নির্যাতনের হার, বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার হার এত বেশি যে পুরুষ কতটা ও কীভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন, তা আলোচনায় আসে না। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ মেন’স রাইটস ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন দাবি করেছিল যে বাংলাদেশে পুরুষরা মানসিক ও কখনও কখনও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তারা উল্লেখ করেছে যে স্ত্রীর দ্বারা অপমান, অসম্মান, চাপ সৃষ্টি বা সামাজিক হুমকির কারণে পুরুষরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন। তবে এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা বা নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের অভাব রয়েছে।

বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, পুরুষরা শারীরিক নিপীড়নের চাইতে মানসিক নিপীড়নের শিকার বেশি হন। প্রথম ধাক্কাটা আসে স্ত্রী ও নিজের পরিবার, বিশেষ করে মায়ের মধ্যে অ্যাডজাস্ট করা নিয়ে। এই চাপ মারাত্মক। অনেকেই দুইপক্ষের এই মতবিরোধের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ পারিবারিক কলহে জড়িয়ে পড়েন।

এরপর আছে স্বামীকে সবসময় সন্দেহের চোখে দেখার ব্যাপারটা। ঘরের সঙ্গী যদি সন্দেহ করেন, আয় কম বলে খোঁটা দেন, মুখরা হন, অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, সংসারের দায়িত্ব পালন না করেন, স্বামীর মা-বাবা ও পরিবারের দেখাশোনা করতে না চান, তখন একজন নারীর মতো পুরুষটিও বিপর্যস্ত হন। এসব অশান্তির কথা অনেকে বাইরে প্রকাশ করেন না, কারও কাছে সহযোগিতা চান না, কিন্তু মানসিক চাপ বহন করতে থাকেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে স্ত্রী রাগারাগি করার সময় চিৎকার-চেঁচামেচি করেন, চড়-থাপ্পড়, খামচিও দিয়ে থাকেন। এগুলো সবই নির্যাতন। এসব নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে, অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে না পেরে, কেউ কেউ সুইসাইডও করেন।

২০১৮ সালে ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে বিশ্বব্যাপী প্রতি ছয় জন পুরুষের মধ্যে একজন গার্হস্থ্য নির্যাতনের শিকার হন, কিন্তু ২০ জনের মধ্যে মাত্র একজন এটি রিপোর্ট করেন। বাংলাদেশে ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো পুরুষকে ‘নির্যাতনকারী’ হিসেবে দেখার ধারণাকে শক্তিশালী করে, ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে নয়। পুরুষ নিজেও তাই মনে করে। আর তাই অনেকে চরম মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও আইনের সাহায্য নিতে চান না, কারও কাছে কিছু খুলে বলেন না। এমনকি বিচ্ছেদও ঘটাতে পারেন না।

এ দেশের পুরুষদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে— তারা সবসময়ই নিজেদের শক্তিশালী হিসেবে মনে করে এসেছেন। ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, স্ত্রীকে বা নারীকে জুলুম করার সময় পুরুষের মধ্যে কোনও সম্ভ্রম কাজ করে না। কিন্তু পুরুষ নিজে নির্যাতিত হলে তার সম্ভ্রমহানি ঘটে। কোনও পুরুষ, কখনোই স্বীকার করেন না যে তিনি স্ত্রীর হাতে মার খাচ্ছেন বা খেয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখেছি, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের উপকমিশনার জানিয়েছেন, শুধু নারীই নন, পুরুষও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেক পুরুষ মেয়েদের ট্র্যাপে পড়ে যাচ্ছেন। শুধু নারীই নন, পুরুষও নারীর দ্বারা ভিকটিমাইজড হচ্ছেন। এক্ষেত্রে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার তাদের পেশাগত দায়িত্বের বাইরে অনেক কিছু গোপন রেখে কাউন্সেলিং ও আইনি পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তিনি আরও বলেছেন, পারিবারিক মামলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনের সঙ্গে যৌতুকের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু দাম্পত্য কলহ হলেই যৌতুকের মামলা দেওয়া হয়।

পুরুষ তার স্ত্রী বা প্রেমিকার হাতে খুন হচ্ছেন, প্রেমিকের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে স্বামীকে খুনের ঘটনা ঘটছে। অনেক অভিবাসী শ্রমিক স্ত্রীর দ্বারা প্রতারিত হচ্ছেন। জেন্ডারভিত্তিক অপরাধের যে তথ্য রাখা হয়, সেখানে নারীদের ওপরে কী কী অপরাধ সংঘটিত হয়, তার সংখ্যা আছে। কিন্তু পুরুষ যখন কোনও অপরাধের শিকার হন, সেটার জেন্ডার-ভিত্তিক পরিসংখ্যানে আলাদাভাবে রাখা হয় না।

দীর্ঘদিনের নির্যাতন থেকে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মসম্মানবোধ কমে যাওয়া বা ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ভুক্তভোগী যেই হোন না কেন, নিরাপত্তা ও সহায়তা চাওয়া এবং প্রয়োজনে আইনি ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া তার অধিকার।

নির্যাতিত হলে নারী, পুরুষ, শিশু বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সবারই বিচার ও পরামর্শ পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু পুরুষদের মনে রাখা দরকার—নির্যাতনের শিকার হওয়াটা দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং কাউকে নির্যাতন করাটাই দুর্বলতা ও লজ্জাজনক।

বিশ্বের অনেক দেশেই জেন্ডার-নিরপেক্ষ আইন আছে এবং সেই দেশগুলো পুরুষ ভুক্তভোগীদের স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে। নারী-পুরুষের সম্পর্কটা দ্বান্দ্বিক বা সাংঘর্ষিক নয়। দুপক্ষের দ্বন্দ্ব হলে নানা ধরনের বিপত্তি ঘটে পরিবারে ও সমাজে। এর নেতিবাচক প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সন্তান।

শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
লাল জুতার গল্প: এক জোড়া জুতা, হাজার মানুষের অদৃশ্য কষ্টের কথা
লাল জুতার গল্প: এক জোড়া জুতা, হাজার মানুষের অদৃশ্য কষ্টের কথা
সমালোচকদের নেইমার বললেন, ‘নিজের কাজ করুন’
সমালোচকদের নেইমার বললেন, ‘নিজের কাজ করুন’
কেন ছাত্র ইউনিয়ন থেকে পদত্যাগ করলেন মেঘমল্লার বসু
কেন ছাত্র ইউনিয়ন থেকে পদত্যাগ করলেন মেঘমল্লার বসু
শুধু গবেষণা নয়, ক্যান্সার চিকিৎসাতেও বদল আনতে পারে চীনের নতুন প্রযুক্তি
শুধু গবেষণা নয়, ক্যান্সার চিকিৎসাতেও বদল আনতে পারে চীনের নতুন প্রযুক্তি
সর্বশেষসর্বাধিক