বিশ্ববিদ্যালয়কে এতদিন আমরা ভুল বুঝেছি। কেউ ভাবতো এটি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, কেউ বলতো মুক্তবুদ্ধির চর্চার ক্ষেত্র, কেউ আবার বলতো এখানে মানুষ বই পড়তে আসে, বিতর্ক করতে আসে, নতুন ধারণার জন্ম দিতে আসে। কী ভয়ংকর সরলতা!
আমাদের দেশে ক্যাফেটেরিয়া মানে তো এতদিন ছিল এক আজব অনিয়মের জায়গা। ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে বসে চা খাওয়া, শিঙাড়ায় কামড় দেওয়া, অকারণে হেসে গড়িয়ে পড়া, নাচ-গান করা কিংবা প্রগতির নাম করে উচ্চবাচ্য করা, এসবের মধ্যে কোনও ‘শালীনতা’ ‘শৃঙ্খলা’ ছিল কি? একেবারেই না! যে কারণে আমাদের মহান ডাকসু নেতৃত্ব মোক্ষম কাজটি করে ফেলেছেন। ডাকসুর শুভ উদ্যোগে ক্যাফেটেরিয়ায় সগৌরবে টানিয়ে দেওয়া হয়েছে সুরম্য পর্দা! ক্যাফেটেরিয়ায় পর্দা স্থাপন করে প্রমাণ করে দেওয়া হয়েছে, প্রগতি কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী!
এমনিতে গ্রামের সাধারণ খাবারের হোটেলগুলোতে পর্দাঘেরা একটা বিশেষ জায়গা সবসময়েই চোখে পড়ে। একটা ধ্যাবড়া নীল বা সবুজ রঙের পর্দা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, যার পেছনে গিয়ে মানুষ ভাত খায়, নাকি অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালায়—তা নিয়ে গ্রামের মাতব্বরদের দীর্ঘদিনের গবেষণা রয়েছে। ডাকসু এখন সেই গ্রামীণ অসামাজিক রহস্যময় পর্দার মডেলকে সোজা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় নিয়ে এসেছে। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, সভ্যতা বিজ্ঞান, গবেষণা কিংবা আবিষ্কারে এগিয়ে যায় না। সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি ঘটে কয়েক গজ কাপড় ঝুলিয়ে, পর্দায়।
অনেকে এটাকে পশ্চাদমুখী বলছেন। কী অন্যায় কথা! এটা মোটেই পশ্চাদমুখী নয়। এটাকে বলে ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ। পৃথিবী যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ব্যস্ত, আমরা তখন কাপড়ের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছি।
যাঁরা এই উদ্যোগ নিয়েছেন, তাঁরা বুঝেছেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা সেশনজট নয়, গবেষণার অভাব নয়, আবাসন সংকট নয়, গ্রন্থাগারের বই কমে যাওয়াও নয়। আসল সমস্যা ছিল, ছেলে-মেয়েরা একই জায়গায় বসে চা খেয়ে ফেলছিল!
ভাবুন একবার, কী ভয়ংকর দৃশ্য! ছেলেমেয়েরা পাশাপাশি বসে চা খাচ্ছে, শিঙাড়া খাচ্ছে। এর চেয়ে বড় নৈতিক বিপর্যয় আর কী হতে পারে? এখন থেকে অন্তত সেই ভয় কেটে গেল। এখন মেয়েরা নিশ্চিন্তে পর্দার আড়ালে বসে খাবে। এমনভাবে খাবে যে পাশের টেবিলের মানুষ তো দূরের কথা, মাঝে মাঝে নিজেরাও বুঝতে পারবে না তাঁরা ক্যাফেটেরিয়ায় আছেন, নাকি ঘরের ভেতরে!
তবে আমি মনে করি, এখানেই থেমে গেলে চলবে না। একটি মহান বিপ্লবকে কখনও অর্ধেক পথে থামিয়ে রাখা উচিত নয়। প্রথমেই আসুক শিঙাড়া সংস্কার। পুরুষদের শিঙাড়া হবে ত্রিভুজাকার, নারীদের গোলাকার— যাতে ভুল করে কেউ অন্যের শিঙাড়ার দিকে তাকিয়ে বিভ্রান্ত না হন।
চপের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। পুরুষদের আলুর চপে মরিচ একটু বেশি থাকবে, নারীদেরটিতে কম। নৈতিকতার পাশাপাশি ঝালেরও একটা শালীনতা থাকা দরকার।
চায়ের কাপেরও সংস্কার জরুরি। কাপের গায়ে ছোট ছোট পর্দা লাগানো হোক। কারণ গরম চা থেকে যে বাষ্প ওঠে, সেটি যদি ভুল করে পর্দার ওপারে চলে যায়, তাহলে সেটি নৈতিক সীমান্ত লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো গন্ধ। পর্দা টানালেই তো হবে না। বিরিয়ানির গন্ধ যদি একপাশ থেকে অন্যপাশে চলে যায়? সেটিও তো এক ধরনের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান!
অতএব, গন্ধ নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠন করা হোক। একপাশের কাবাবের সুগন্ধ অন্যপাশে প্রবেশ করলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক ঘণ্টা বাজবে। খাওয়ার সময় শব্দ নিয়েও ভাবতে হবে। একজন যদি কচকচ করে পেঁয়াজ খায়, আর সেই শব্দ যদি পর্দার ওপারে পৌঁছে যায়, তাহলে কী হবে? শব্দও তো এক ধরনের যোগাযোগ।
অতএব, মুচমুচে খাবার নিষিদ্ধ করা হোক। শুধু নরম খিচুড়ি ও পাতলা স্যুপ পরিবেশন করা হবে। তবে স্যুপ খাওয়ার সময় অবশ্যই বাটির ওপর কাপড়ের ঢাকনা রাখতে হবে। ধোঁয়াও যেন অনুমতি ছাড়া বাইরে বেরোতে না পারে।
আরেকটি প্রস্তাব দিচ্ছি। ক্যাফেটেরিয়ায় প্রবেশের আগে প্রত্যেককে একটি করে নৈতিকতা পরিমাপক যন্ত্রের সামনে দাঁড়াতে হবে। যন্ত্রটি পরীক্ষা করে দেখবে, কারও মনে কোনও ‘দোষ’ বা অতিরিক্ত হাসি জমে আছে কিনা। বেশি কুচিন্তা বা হাসি ধরা পড়লে তাকে সরাসরি লাইব্রেরিতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সেখানে বসে তিন ঘণ্টা দর্শনের বই পড়ে মন শান্ত করতে হবে।
আর শুধু ক্যাফেটেরিয়ায় কেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেও এই মহান সংস্কার পৌঁছে দিতে হবে। মাঝখানে বিশাল পর্দা থাকবে। শিক্ষক একপাশে দাঁড়িয়ে পড়াবেন। শিক্ষার্থীরা দুই পাশে বসে শুধু কণ্ঠস্বর শুনবে। কে প্রশ্ন করল, কে উত্তর দিলো, তা জানার দরকার কী? জ্ঞান তো চোখ দিয়ে নয়, কান দিয়েই প্রবেশ করে! পরীক্ষার হলেও নতুন ব্যবস্থা হতে পারে। ছেলেদের উত্তরপত্র নীল খামে যাবে, মেয়েদেরটি গোলাপি খামে। পরীক্ষকও আলাদা থাকবেন। খাতা দেখার সময়ও নৈতিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও নতুনত্ব আনা দরকার। সনদ গ্রহণের জন্য দুটি আলাদা মঞ্চ হবে। মাঝখানে থাকবে বিশাল কাপড়ের দেয়াল। একদিকে করতালি হবে, অন্যদিকে তার প্রতিধ্বনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসও বাদ যাবে কেন?
একটি বাসে শুধু পুরুষেরা, আরেকটিতে শুধু নারীরা। যদি যাত্রী কম হয়, তবু কোনও সমস্যা নেই। প্রয়োজনে ফাঁকা বাস চলবে। কিন্তু নৈতিকতা যেন কখনও ফাঁকা না হয়। আসলে আমাদের বড় সমস্যা হলো—আমরা সব সময় বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ববিদ্যালয় ভেবেছি। এখন সময় এসেছে তাকে বিশাল এক শালীনতা প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে দেখার।
বই কম পড়লেও চলবে। গবেষণা কম হলেও চলবে। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা না হলেও চলবে। কিন্তু পর্দা ও কাপড়ের ব্যবহার যেন কমে না যায়। আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছগুলোকেও পর্দা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ একটি আমগাছের ছায়ায় যদি ছেলেমেয়ে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে ছায়াটিও নৈতিকভাবে বিভ্রান্ত হতে পারে। পাখিদেরও আলাদা উড়তে হবে। কাক-‘কাকি’ একসঙ্গে ডাকলে তা শালীনতার পরিপন্থি কিনা, তা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
সবশেষে একটি অনুরোধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারের নামফলক বদলে দেওয়া হোক। যেখানে ‘জ্ঞানই শক্তি’—এই লেখার বদলে লেখা থাকবে, ‘দূরত্বই শালীনতা, পর্দাই প্রগতি, আর ক্যাফেটেরিয়াই সভ্যতার শেষ দুর্গ।’
তখনই বুঝবো, আমরা সত্যিই উচ্চশিক্ষার নতুন যুগে প্রবেশ করেছি। এমন এক যুগে, যেখানে চিন্তার চেয়ে কাপড় বড়, বিতর্কের চেয়ে বিভাজন নিরাপদ, আর শিঙাড়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিঙাড়া খাওয়ার সময় কে কাকে দেখতে পেলো। তবে আমার বিশ্বাস, এই পর্দা বিপ্লব এখানেই থেমে থাকবে না। জাতি এখন মাত্র ট্রেলার দেখেছে, পুরো সিনেমা এখনও বাকি।
শেষে একটা ছোট্ট অনুরোধ রইলো। যেদিন ক্যাফেটেরিয়ার চা-পাতিলেও পর্দা ঝুলবে, সেদিন অন্তত জানিয়ে দেবেন। কারণ চায়ের ধোঁয়াও যদি নৈতিকতার সীমারেখা অতিক্রম করে ফেলে, তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু চা নয়, দীর্ঘশ্বাসও পর্দার আড়াল থেকেই নিতে হবে!
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট




