রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসার ধর্ষণের রায় গত ৭ জুন ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা সবাই জানি যে, রামিসাকে ধর্ষণের পর অত্যন্ত নির্মমভাবে গলা কেটে ও খণ্ড-বিখণ্ড করে। এই ঐতিহাসিক রায়ে আসামি সোহেল রানা এবং স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। রামিসার পাশাপাশি আরও অনেক শিশুই ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন এবং আগেও হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। চলতি মাসে ২০ দিনে (১ থেকে ২০ মে পর্যন্ত) ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৪ শিশু। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ১২ জন এবং ধর্ষণের ঘটনায় পাঁচজনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ১১৫ শিশু খুন হয়েছে ( দৈনিক সমকাল ২২ মে ২০২৬)
২০২২ আমি এবং সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম হোসেনের যৌথভাবে করা একটি গবেষণায় আমরা দেখতে পেয়েছি যে, শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার বেশিরভাগ ঘটনায়ই পরিবারের সদস্য, আত্মীয় বা পরিচিত মানুষ জড়িত থাকে; অপরিচিতরা না। আমরা গবেষণায় এই তথ্য পেয়েছি যে, যে যৌন সহিংসতার ঘটনার মাত্র ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যত্তি। ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ছিল শিশুর রক্ত সসম্পর্কীয় আত্মীয় (মামা, চাচা, কাজিন) আর ৪২ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ছিল পরিচিতজন, যেমন- প্রতিবেশী, শিক্ষক, মৌলভী এবং পরিচিত ব্যক্তি বা নিয়মিত বাড়িতে যাতায়াত করা মানুষ।
আমাদের গবেষণাটির মূল ঝোঁক ছিল কেন কন্যা শিশুকে টার্গেট করা হয়? বা ধর্ষক কেন বাচ্চা মেয়েকে টার্গেট করে? আমরা দেখতে পেয়েছি যে, বাচ্চাদের প্রকাশগুলোকে প্রায়শই অবিশ্বাস করা হয় বা ছোট করা হয়, বিশেষ করে যখন অভিযুক্ত একজন বিশ্বস্ত আত্মীয় হয়। পরিবারে প্রাপ্তবয়স্কদের কর্তৃত্ব এবং আত্মীয়তার ধরন এবং ঘনিষ্ঠতা শিশুর যৌন নিপীড়ন এবং ধর্ষনের অভিজ্ঞতাকে অগ্রাহ্য করে। পরিবারে এই কাঠামোগত শিশুর বয়ানকে অবিশ্বাস এই বিষয়ে পদক্ষেপকে দীর্ঘায়িত করে এবং অনেক সময়ই এটির প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয় না। এক্ষেত্রে তিনটি বিষয় ঘটে। শিশুরা প্রায়শই যা ঘটেছে তা পুরোপুরিভাবে প্রকাশ করার করতে পারে না, তারা প্রায়শই ভয় পায় এবং ঘটনাটি সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারে না, তাতে প্রকাশের সম্ভাবনা কমে যায়। দ্বিতীয়ত, আত্মীয়রা প্রায়ই এই ধরনের অভিযোগ বিশ্বাস করতে অনিচ্ছুক এবং তাদের শিশুরা এটিকে বিশ্বাস করাতে পারে না। এবং সবশেষে, অনেক ক্ষেত্রে, ‘পারিবারিক সম্মান’ নিয়ে উদ্বেগের কারণে পরিবার নিজেরাই অনানুষ্ঠানিকভাবে এই ধরনের ঘটনাগুলি সমাধান কিংবা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। ধর্ষক এটি জানে এবং এই পারিবারিক মনষত্বের সুযোগ তারা নেয়। এখানে আরেকটি বিষয় ঘটে সেটি হলো— এই ধরনের শিশুরা বারবার রিট্রমাটাইজেশনের শিকার হয়। কারণ ধর্ষক কিংবা নিপীড়ক আত্মীয় হওয়ার কারণে বার বার তার সাথে দেখা হয়।
দেখা গিয়েছে, পারিবারিক নানা অনুষ্ঠান (বিয়ে, জন্মদিন) যেখানে বাসার অন্যরা ব্যস্ত থাকেন এবং বাচ্চারা বিভিন্ন জনের সঙ্গে ঘুমায় এবং সময় কাটায় তখনই সবেচেয়ে বেশি এই ধরনের ঘটনা ঘটে। আবার একটি বড় অংশ ৩৮ শতাংশ নারী কোনও না কোনোভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হন, সমাজে প্রচলিত ঠাট্টা-মশকরার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। যেমন- আমরা গত বছরের আছিয়ার ঘটনা জানি। সেই ছোট্ট মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছিল— তার বোনের শ্বশুর দ্বারা এবং সেখানে সহায়তা করেছে তার বোনের স্বামী। গবেষণাতেও পেয়েছি যে, অনেক নারী শিশুই যৌন নিপীড়নের শিকার হন বোনের স্বামী, দেবর দ্বারা। এবং এগুলোকে উড়িয়ে দেওয়া হয় ‘ঠাট্টা’র আবরণে। এগুলোকে আমলে নেওয়া হয় না বরং এর বিপরীতে এগুলো ‘ঠাট্টা’র আড়ালে সামাজিক স্বীকৃতি পায়।
এর পাশাপাশি আরেকটি প্রবণতাও দেখা যায়— সেটি হলো, ধর্ষকের নিজের যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশে অনেক পুরুষই শৈশব-কৈশোরে অন্য পুরুষ কর্তৃক যৌন নিপীড়নের শিকার হন। কিন্তু জারি থাকা পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শের কারণে তারা এটি প্রকাশ করতে পারে না এবং কোনও ধরনের প্রতিকার পায় না। তাদের সেই ট্রমা পরবর্তীকালে প্রতিশোধের দিকে নিয়ে যায় এবং তখন অনেক সময় নিপীড়নের সময়কার তাদের বয়সী কন্যা শিশুদের নিপীড়নের দিকে ঝোঁক তৈরি হয়।
আরেকটি বিষয়ওতো আলোকপাত করা দরকার, সেটি হলো ধর্ষণের রাজনৈতিক-অথর্নীতি। এক্ষেত্রেও কন্যা শিশুদের বেছে নেওয়া হয়। বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং আদিবাসী মেয়ে শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে এ মনস্তত্ত্ব কাজ করে। সেক্ষেত্রে দেখা যায় যে, ধর্ষণের পর সে এলাকায় আর ধর্ষণের শিকার কন্যা শিশুর পরিবার থাকতে পারে না। সামাজিক হেনস্থার পাশাপাশি জিইয়ে রাখা অনিরাপত্তাবোধ তাদেরকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করে, তখন তাদের ফেলে যাওয়া জমি দখল অনেকটাই সহজ হয়ে পড়ে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এই লেখার প্রথম অংশে শিশু ধর্ষণের যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, এগুলো শুধুমাত্র পুলিশের কাছে অভিযোগের সংখ্যা। কিন্তু বাস্তবে ধর্ষণের ঘটনা এর চেয়ে অনেক বেশি। কেন এই ধর্ষণকে এখন পর্যন্ত অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। এর কারণ এখনও পর্যন্ত এটির সামাজিক অনুবাদ সমাজে অনেক বেশি দাপটশালী। এমনকি গণমাধ্যমগুলোও অনেক সময়ই ধর্ষণের পরিবর্তে, ‘ইজ্জত’, সন্মানহানী, শ্লীলতাহানী— এসব শব্দ ব্যবহার করে। অনেকেই এখনও যুক্তি দেখান যে, ধর্ষণ শব্দটি বলতে এবং লিখতে ‘লজ্জা’ লাগে। কিন্তু ধর্ষণ একটি ভয়াবহ অপরাধ। এটির কোনও প্রতিশব্দ ব্যবহার সমর্থনযোগ্য নয়।
অনেকেই এর থেকে প্রতিকার পেতে শিশুদের ‘খারাপ স্পর্শ, ভালো স্পর্শ সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি কংফু-কারাত এবং লাঠি খেলা শেখাচ্ছেন। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে চলতে থাকা প্রকল্পগুলো চলছে সেই ‘নারী’কেই টার্গেট করে। কিন্তু কোনও প্রকল্প আজ পর্যন্ত পুরুষকে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং নারীর প্রতি কাঙ্ক্ষিত আচরণ নিয়ে হয়নি। যার কারণে পুরো প্যাকেজেই হচ্ছে নারীকেই ঘিরে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করি যে, পুরুষকেই রুখে দাঁড়াতে হবে এই ধর্ষণ এবং যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে।
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com