প্রতিশ্রুতি ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক বনাম মেয়েদের বিপদ

শাহানা হুদা রঞ্জনা
০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০

নাটোরের লালপুরে সম্পর্কের প্রথম মাসেই প্রেমিকের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে এক তরুণী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ওই তরুণীর কাছে চাঁদা দাবিও করা হচ্ছে।

এ ধরনের অসংখ্য ঘটনার কথা প্রতিদিন গণমাধ্যমে আসছে। প্রেমের নামে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ বা গণধর্ষণ, সেই দৃশ্যের ছবি তোলা বা ভিডিও করা, সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে ব্ল্যাকমেইল করা, অথবা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণ করা- এই শ্রেণির অপরাধীর মূল লক্ষ্য হচ্ছে প্রেমের ফাঁদে ফেলে মেয়েদের দিয়ে ব্যবসা করা, অথবা শুধু ভোগ করে যৌন আনন্দ চরিতার্থ করা। শিশু ও কিশোরী মেয়েরা খুব সহজেই এই ফাঁদে পা দেয়।

ছোট শিশুদের জন্য এই ফাঁদ হচ্ছে মিষ্টি কথা, আদর, চকলেট-চিপস, চানাচুর বা খেলনা দেওয়ার টোপ। এই শিশুদেরও পরিবার থেকে এই বিষয়ে সাধারণত সচেতন করা হয় না।

কিশোরী-তরুণীদের জন্য এই ফাঁদ হচ্ছে প্রেম-ভালোবাসা, বিয়ে, যৌনতা, অর্থ, চটকদার উপহার, বিত্তময় জীবনের আশ্বাস, স্টার হওয়ার প্রলোভন ইত্যাদি। ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছাড়াও এই ফাঁদ পাতার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে। এই মাধ্যমে সহজেই মিথ্যা কথা বলে, মিথ্যা পরিচয় দিয়ে আকৃষ্ট করা যায়।

কেউ কেউ ‘বিয়ের প্রতিশ্রুতি’ দিয়ে দৈহিক সম্পর্ক করে। ভোগ করা হয়ে গেলে পালিয়ে যায় বা অস্বীকার করে। মেয়েটির পক্ষ থেকে এটা খুব ভুল পদক্ষেপ। কারণ বিয়ের প্রতিশ্রুতি পেলেই কেন মেয়েটিকে একটি ছেলের শয্যাসঙ্গী হতে হবে? পরে প্রেমিকের বাড়িতে গিয়ে বিয়ের বা সন্তানের পিতৃপরিচয়ের দাবি নিয়ে হন্যে হয়ে পড়ে থাকা কতটা সম্মানের হয়?

বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্কের আইনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী বল প্রয়োগ ছাড়া ১৬ বছরের বেশি বয়সী কোনও নারী বা মেয়ের সঙ্গে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অবৈধ যৌন সম্পর্ককে আগের মতো ধর্ষণের সংজ্ঞায় রাখা হয়নি। এটি আইনে আলাদা ধারায় চিহ্নিত করা হয়েছে। আর এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হবে সাত বছরের কারাদণ্ড, মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নয়।

অর্থাৎ এক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারী এই সম্পর্কে জড়ানোর দায়ভার এড়াতে পারবেন না। অনেক মেয়ে ভালোবেসে এ ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং পরে বিপদগ্রস্ত হন। কেউ কেউ সন্তানের জন্ম দিতেও বাধ্য হন।

কাজেই ভালোবাসার সম্পর্কে জড়ানোর ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে, বিশেষ করে মেয়েদের নিজেদের নিরাপত্তার দিকটি ভাবতে হবে। প্রেম মানেই চরম সমর্পণ, অন্তরঙ্গতা, একা হোটেলে বা কারও বাসায় যাওয়া, নগ্ন ছবি বিনিময় বা ওরাল সেক্সও নয়। কারণ কে যে কোথায় কীভাবে ওত পেতে আছে, এটা জানা খুব কঠিন। এরপর এমন কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়, যখন সুইসাইড করতে হয়, খুন হতে হয়, ধর্ষণের শিকার হতে হয় বা অভিশপ্ত জীবন কাটাতে হয়।

বন্ধু বা প্রেমিক নির্বাচনের সময়ও লক্ষ করতে হবে ব্যক্তিটি কেমন, তার আচার-ব্যবহার, রুচি, বন্ধু সার্কেল বিষয়ে খোঁজ রাখতে হবে। ‘সরল বিশ্বাসে’ বা শুধু ‘প্রতিশ্রুতি’তে এমন সম্পর্কে জড়ানো যাবে না, যা ভয়াবহ বিপদ, এমনকি মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে। কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে তা একেবারে গোপন না করে কী ঘটছে, তা অন্তত একজন কাছের বন্ধু বা পরিবারের কোনও সদস্যকে জানিয়ে রাখা দরকার।

ছেলেমেয়েরা যখন বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছে, তখন তারা শরীর ও মন নিয়ে বেশ মরিয়া হয়ে থাকে। তথ্য গোপন করে এমন ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে যায় বা মাদক টাইপ এমন সব জিনিসপত্র গ্রহণ করতে শুরু করে, যা তাদের জন্য ক্ষতিকর। যেহেতু আমাদের দেশে প্রজনন স্বাস্থ্য, নারীর শরীরের নিরাপত্তা বিষয়ে মেয়েদের কিশোরী বয়সে সচেতন ও সাবধান করা হয় না, তাই খুব সহজেই তাদের পা ফসকে যায়।

সেদিন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীটি কেনাকাটার কথা বলে বাইরে বেরিয়েছিল, পরে আর বাসায় ফেরেনি। প্রায় ১৫ দিন পরে হাতিরঝিল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ছোট মেয়েটিকে হাত-পা বেঁধে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এই কিশোরীটি ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্রে, প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত গ্যাং রেপের শিকার হয়ে খুন হয়।

এরকম ঘটনা একটার পর একটা ঘটেই চলেছে মূলত অসচেতনতা থেকে। এ ক্ষেত্রে মেয়েদের পরিবার থেকে সচেতন করা হয় না, দেওয়া হয় না নিজের নিরাপত্তা বিষয়ক ধারণা, প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যও। এই টিনএইজ মেয়েরা যা তথ্য পায়, সব বন্ধুবান্ধব বা অনলাইন থেকে, যার অধিকাংশই ভুল।

এই মেয়েদের অনেককে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলা হয়, এমনকি যৌন ব্যবসাতেও সম্পৃক্ত করা হয়। এক্ষেত্রে যারা এ ধরনের অপরাধে জড়িত, তারা মিথ্যা ফেসবুক আইডি খোলে এবং এর মাধ্যমেই প্রাথমিক পর্যায়ে রিকোয়েস্ট পাঠায়। এরপর মেয়েটির দুর্বলতাকে খুঁজে বের করে। এই দুর্বল পয়েন্টটাই হয়ে ওঠে ওই লোকগুলোর প্রধান হাতিয়ার।

কোনও মেয়ে যদি একা কষ্টের মধ্যে থাকে, ডিভোর্সি ও প্রেমে ব্যর্থ হয়, বিষণ্নতায় ভোগে, তাহলে তাদের পাশে বন্ধুর মতো দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। এমনকি চক্রান্তকারী ‘প্রেমিক পুরুষটি’ মেয়েটিকে বশে আনার জন্য বিভিন্ন চাহিদাও মিটাতে শুরু করে।

যখন মেয়েটি বিশ্বাস করে পুরোপুরি ফাঁদে পড়ে যায়, তখন তার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং ব্ল্যাকমেইল করা শুরু হয়। এ জন্যই সম্পর্ক তৈরির সময় অনলাইনে যেমন সচেতন থাকতে হবে, তেমনি সচেতন থাকতে হবে অফলাইনেও।

কিশোরী-তরুণীরা বিচার-বিবেচনা না করেই প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। কারও সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন বা বন্ধুত্ব করার ক্ষেত্রে অবশ্যই নিজের নিরাপত্তাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। সর্বোচ্চ সতর্কতাই পারে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করতে। তাই প্রত্যেক মেয়েকেই সচেতন হতে হবে, যেন এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জড়িয়ে না পড়েন। মেয়েরা সচেতন কম হলে, তার বিপদে পড়ার আশঙ্কা বেশি হয়।

‘সাইবার সহিংসতার শিকার নারীদের মনো-সামাজিক পরিবর্তন এবং বাংলাদেশে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মূল্যায়ন’ শিরোনামের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সাবেক প্রেমিকের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন মেয়েরা। অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়েও আইনি পদক্ষেপ নেন না ৮৮ শতাংশ ভুক্তভোগী। মানসম্মানের ভয়ে অধিকাংশ ভুক্তভোগী মামলা করতে চাননি। প্রেমের সম্পর্কে আবেগ ও বিশ্বাসের কারণে মেয়েরা সঙ্গীকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন এবং যা করতে বলে, তাই করেন। সঙ্গীকে বিশ্বাস করে মেয়েরা যখন তাদের ব্যক্তিগত জীবনের দুর্বলতা, পারিবারিক সমস্যা বা গোপন তথ্য সঙ্গীর সাথে শেয়ার করে, তখন কেউ কেউ সেগুলোকেই ব্ল্যাকমেইল করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

গত কয়েক বছরে নারীকে ফাঁদে ফেলার ‘সহজ অস্ত্র’ হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে সাইবার জগৎকে। সাইবার জগতে নারীর প্রতি সহিংসতা ঘটানোর ক্ষেত্রে পরিচিত-অপরিচিত, সাবেক স্বামী বা প্রেমিক, অনলাইন বন্ধু, সহপাঠী-বন্ধু, প্রতিবেশী সবাই তৎপর।

প্রেম বা ভালোবাসার টোপ দিয়ে এমনভাবে মেয়েদের জালে জড়িয়ে ফেলা হয়, যেখান থেকে তাদের পক্ষে বেরিয়ে আসা খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার ব্যাপক বেড়েছে, অন্যদিকে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের গড় বয়স কমছে। তাহলে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে অনলাইনটা সবচেয়ে বড় ফাঁদ শিশু-কিশোর ও কিশোরীদের জন্য। এখানে কিশোরী-তরুণীদের সঙ্গে প্রথমে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। এরপর প্রেম, ভালোবাসা, টিকটক স্টার বানানোর প্রতিশ্রুতি। দেশে ইতোমধ্যে এমনও ঘটনা ঘটছে যে গোপন ক্যামেরা দিয়ে তোলা নোংরা ভিডিওচিত্রে নিজেদের আপত্তিকর ছবি দেখে অনেক কিশোরী আত্মহননের পথও বেছে নিয়েছেন।

এসব ছবি নেটে দেয় তাদেরই বন্ধু-প্রেমিকরা। প্রেম চলাকালীন আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকাও আদায় করা হয়। টাকা দিতে না পারলে মেয়েদের ভিডিও কলে এনে তাদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে। সারা দেশে এই ধরনের ইন্টারনেটভিত্তিক গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠছে, যারা ফাঁদে ফেলে শিশু-কিশোর ও নারীদের নিয়ে ব্যবসা করছে।

প্রেমের সম্পর্কে প্রতারণা বা ফাঁদ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সবচেয়ে জরুরি। আবেগের পাশাপাশি বুদ্ধি ও বিবেক খাটিয়ে চললে যেকোনও বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব। কোনও প্রতিশ্রুতিতেই এমন কোনও গভীর সম্পর্কে জড়ানো উচিত নয়, যা বিপদ ডেকে আনতে পারে।

সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে এটা জানা যে কত ধরনের ক্রাইম হচ্ছে, মেয়েরা কীভাবে পাচার হয়ে যাচ্ছেন। সঙ্গীকে চট করে বিশ্বাস করা এবং বিশ্বাস করে এমন কোনও কাজ করা বা এমন কোনও জায়গায় যাওয়া উচিত নয়, যা নিরাপদ নয়। প্রতিটি মেয়ের উচিত ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষায় কঠোর হওয়া।

শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
হকারদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নিজেই মাঠে নেমেছেন ডিএনসিসি প্রশাসক
হকারদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নিজেই মাঠে নেমেছেন ডিএনসিসি প্রশাসক
দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে বাংলাদেশে ব্যবসা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি এলপিপির
দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে বাংলাদেশে ব্যবসা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি এলপিপির
সুড়ঙ্গ দিয়ে পালানোর পর এবার নগর ভবনে, কে এই বগা
সুড়ঙ্গ দিয়ে পালানোর পর এবার নগর ভবনে, কে এই বগা
দেশকে অস্থির করতে পতিত দোসররা অপচেষ্টা চালাচ্ছে: রিজভী
দেশকে অস্থির করতে পতিত দোসররা অপচেষ্টা চালাচ্ছে: রিজভী
সর্বশেষ সর্বাধিক