বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি ছেলে, বয়স বাইশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর আগেই সে গ্রাফিক ডিজাইনে দক্ষতা অর্জন করেছে ইউটিউব টিউটোরিয়াল দেখে। ফাইভারে অ্যাকাউন্ট খুলে কাজ শুরু করেছে বিদেশি ক্লায়েন্টের সঙ্গে। মাসে উপার্জন করছে গড়পড়তা
সরকারি চাকুরের তিনগুণ। আর দেশের কোনও এক জেলার সংকীর্ণ কোনও গলির মেয়ে—বাইরে বের হওয়ার সুযোগ কম, কিন্তু ল্যাপটপে কনটেন্ট ক্রিয়েশন করে গড়ে তুলেছে নিজের পরিচয়, নিজের আয়ের পথ। এই দুটি গল্পের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আজকের বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ আজ তরুণ জনগোষ্ঠী। ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের এই দেশে অর্ধেকের বেশি নাগরিকের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে এই তরুণরাই উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। সঠিক নীতি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের জনমিতিক সুবিধা আগামী দশকের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটিরও বেশি এবং মোবাইল সংযোগ প্রায় ১৯ কোটিতে পৌঁছেছে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারী পরিবারের হারও গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মোবাইল ব্রডব্যান্ডের বিস্তার এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী ডেটা মূল্য ডিজিটাল সেবার ভৌত প্রবেশগম্যতা বাড়িয়েছে। কিন্তু প্রবেশগম্যতা বৃদ্ধিই ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির সমার্থক নয়।
প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো—নাগরিকরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছেন, কতটা নিয়মিত ডিজিটাল-সেবা গ্রহণ করছেন এবং এসব সেবা তাদের জীবনমান, আয় ও
ক্ষমতায়নে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের সাফল্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাই সংখ্যাগত অর্জনের পাশাপাশি ব্যবহারের গুণগত দিকও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে।
এই ডিজিটাল অবকাঠামোর অন্যতম দৃশ্যমান ফল হলো—বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ফ্রিল্যান্সিং অর্থনীতি। দেশের কয়েক লাখ দক্ষ তরুণ-তরুণী বর্তমানে বৈশ্বিক ডিজিটাল শ্রমবাজারে কাজ করছেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ফ্রিল্যান্সিং দেশগুলোর একটি এবং এ খাত থেকে বার্ষিক আয় ইতোমধ্যে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। সিলেট থেকে রাজশাহী, ঢাকা থেকে বরিশাল— দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণরা এখন গ্রাফিক ডিজাইন, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট রাইটিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। ঐতিহ্যগতভাবে তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয়নির্ভর অর্থনীতিতে এই ডিজিটাল কর্মসংস্থান একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে সরকারও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন স্টার্টআপ অর্থায়ন নীতিমালার আওতায় যোগ্য উদ্যোক্তারা বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড ও বিভিন্ন বেসরকারি ইনকিউবেটর-অ্যাক্সেলারেটর প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশে একটি ডিজিটাল উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেম ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে।
লিঙ্কডইনের বাংলাদেশভিত্তিক সদস্য সংখ্যা ইতোমধ্যে এক কোটিরও বেশি বলে বিভিন্ন ডেটা উৎসে দেখা যায়, যার উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণ পেশাজীবী ও উদ্যোক্তা। কিন্তু এই উজ্জ্বল ছবির পাশে কিছু গভীর প্রশ্নও আছে। প্রযুক্তির সঙ্গে তারুণ্যের সম্পর্কটা কি কেবল সম্ভাবনার? নাকি সংকটেরও? সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় ব্যয় হচ্ছে স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া ও ভিডিও কনটেন্টের পেছনে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, অনিদ্রা, মনোযোগে ঘাটতি, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা তরুণ সমাজে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সমন্বয়ে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি-প্রস্তুতিমূলক শিক্ষার্থীদের ঘুমের মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দেশে এখন সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন। প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যা তরুণদের নেতিবাচক কনটেন্টে আসক্ত করে তোলে। সামাজিক তুলনার সংস্কৃতি — অর্থাৎ অন্যের জীবনের হাইলাইটের সঙ্গে নিজেকে মেলানোর প্রবণতা—তরুণদের মধ্যে হীনম্মন্যতা ও মানসিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
লিঙ্গ বৈষম্যের বিষয়টিও অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার পুরুষদের মধ্যে ৫৬.৬ শতাংশ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা ৫০.২ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের প্রায় অর্ধেক নারী এখনো নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বা সক্ষমতার বাইরে রয়েছেন। একইসঙ্গে ফ্রিল্যান্সিং খাতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও ৩০ শতাংশের নিচে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্প-প্রতিবেদন ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী ৪৬.৬ শতাংশ মানুষ উচ্চ ব্যয়কে ইন্টারনেট ব্যবহার না করার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ডিজিটাল রূপান্তর তখনই সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হবে, যখন এই লিঙ্গ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করে প্রযুক্তির সুফল সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
শিক্ষার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির হাত ধরে তরুণরা ঘরে বসেই অনেক কিছু শিখছে— এটা সত্য। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এখনও প্রযুক্তির গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। পাঠ্যক্রম পুরোনো, শিক্ষক প্রশিক্ষণে ঘাটতি আছে, আর ডিজিটাল দক্ষতার মূল্যায়নের কোনও মানসম্মত কাঠামো নেই। তরুণরা ইউটিউব দেখে কোড শিখছেন, কিন্তু সমস্যা সমাধানের মৌলিক দক্ষতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা হচ্ছে না যথেষ্ট।
তাহলে করণীয় কী? প্রথমত, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তরুণদের শেখাতে হবে তথ্য যাচাই করার উপায়, সাইবার নিরাপত্তার মূলনীতি এবং ডিজিটাল মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব। দ্বিতীয়ত, ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপ অর্থনীতিকে টেকসই করতে দরকার স্থিতিশীল নীতি-পরিবেশ, সহজ পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো। তৃতীয়ত, নারীর ডিজিটাল অংশগ্রহণ বাড়াতে পরিবার, সমাজ ও সরকার— তিন স্তরেই উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন এক বিরল সুযোগ। জনমিতিক সুবিধার এই উইন্ডো চিরকাল খোলা থাকবে না। আগামী এক দশকের মধ্যে যদি এই তরুণ জনশক্তিকে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ, মানবিকভাবে পরিপক্ব এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলাদেশ পরিণত হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অর্থনীতিতে। আর যদি শুধু অবকাঠামো তৈরি হয়, কিন্তু মানুষ তৈরির দিকটা উপেক্ষিত থাকে, তাহলে সম্ভাবনার গল্পটা গল্পই থেকে যাবে।
তারুণ্য এবং প্রযুক্তি— এই দুইয়ের মিলনে বাংলাদেশের যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, তা কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। এটি একটি সমাজের আত্মার রূপান্তর। স্ক্রিনের আলোয় নতুন স্বপ্ন দেখছে এই প্রজন্ম — সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্নের উত্তরের ওপরেই নির্ভর করছে আগামীর বাংলাদেশ।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর