এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থামছে। একে যুদ্ধ না বলে আগ্রাসন বলাই যথোপযুক্ত।
তারপরও সবাই লিখছে যুদ্ধ বন্ধে উভয় দেশের ‘সমঝোতা চুক্তি’ প্রকাশিত হবে শিগগির। ২০২৫ সালেও ইরানে ১২ দিন বোমা ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল মিলে।
যুদ্ধ বা আগ্রাসন যাই বলি, এটা ছিল বিপুল ক্ষয়ক্ষতিময়। অল্প বিস্তর বোমা পড়েছে ১০টির বেশি দেশে। অর্থনৈতিক নাভিশ্বাস উঠেছে বিশ্বব্যাপী। সুদূর বাংলাদেশেও জ্বালানির দাম বেড়েছে একাধিক দফায়। আফ্রিকার অনেক দেশে জ্বালানি না পেয়ে সার উৎপাদন সংকটে পড়েছে।
যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার মুহূর্তে সবার মুখে প্রশ্ন ‘কে জিতেছে’ এতে। কিন্তু প্রকৃতই সেটা অস্পষ্ট। বরং কারা হেরেছে সেটা স্পষ্ট। বিশ্বে সমাজের নিচুতলার মানুষদের মূল্যস্ফীতির বিপরীতে ‘প্রকৃত মজুরি’ একদফা কমিয়েছে এই যুদ্ধ। স্বভাবত তাদের জীবনযাপনের মানও খানিকটা কমেছে ইতোমধ্যে।
প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরায়েলসহ যুদ্ধে যুক্ত সব শক্তির প্রাপ্তি কী এত গোলা-বারুদের বিনিময়ে? কার কী লাভ হলো?
খোলা চোখে যা দেখা যাচ্ছে, প্রায় ১১৫ দিনের যুদ্ধ শেষেও ইরান তার রাজনৈতিক ব্যবস্থা বহাল রাখতে পারছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লাগাতার যৌথ হামলার পরও তারা পরাস্ত হয়নি। সেখানে সরকার পরিবর্তন হয়নি। তাদের পাল্টা-হামলার সক্ষমতা সামান্যই কমেছে।
ইসরায়েলের মাটি দুর্ভেদ্য এই মিথও ইরান ভালো করেই ভেঙেছে। অনেকের বিবেচনায় ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের পর ইরানে ওয়াশিংটনের স্পষ্ট সামরিক পরাজয় ঘটলো। ইরানে হামলা ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের মতো হবে বলে যারা ভেবেছিলেন, তাদের অনুমান ভয়ানকভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এসব দেখে অনুমান ছড়িয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে হয়তো ইসরায়েলের হয়ে ইরানের সঙ্গে আর বাড়তি বিবাদে জড়াবে না। যা দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকিতে ফেললো।
যুদ্ধে ওয়াশিংটনের জন্য আরেক বড় ক্ষতি উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের বোমাবর্ষণ ঠেকাতে না পারা। পেন্টাগন এতদিন এসব দেশের নিরাপত্তা-গ্যারান্টর হয়েছিল। এসব দেশের রাজপরিবারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করে দিন কাটিয়েছে এবং আকর্ষণীয় এক ব্যবসা-মডেল গড়ে তুলছিল সেখানকার বিভিন্ন শহরে। যুক্তরাষ্ট্র ও আরব দেশগুলোর এই ‘বন্ধু’ অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে যুদ্ধে। ইরানের ভেতরকার গণতন্ত্রপন্থিদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের গায়ে পড়ে সমর্থন দেশের ভেতরে প্রথমোক্তদের নৈতিকভাবেও দুর্বল করেছে।
ইরানের কর্তৃত্ববাদী শাসকরা ন্যায্য দাবিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের অনুচর হিসেবে দেখানোর সহজ রাস্তা পেয়েছে এবং হরহামেশা সেটা ব্যবহার করছে। আরও সরাসরি বললে, ইরানের গত কয়েক বছরের রক্তাক্ত গণতন্ত্রের লড়াই ওয়াশিংটন তার ভুল নীতির মাধ্যমে ধ্বংস করেছে। বোমা মেরে মানুষ হত্যার মতোই এটাও ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শাসকদের বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার মতো।
ইরানের গণতন্ত্রপন্থিরা শাসকদের নির্মমতা সত্ত্বেও তাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান ছাড়েনি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোনও ধরনের ‘প্রকল্পে’ যুক্ত হয়নি যুদ্ধদিনগুলোতে। যা দেশটির শাসকদের পক্ষে সহায়ক হয়েছে। এই শাসকদের ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক প্রযুক্তির উন্নয়ন থেকে সরিয়ে আনতে পারছে বলেও সমঝোতা চুক্তিতে কোনও স্পষ্ট সাক্ষ্য নেই। বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশবাসীকে আত্মরক্ষার স্বার্থে পারমাণবিক বোমার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও সহজে বোঝাতে পারবে এখন শাসকগোষ্ঠীর কট্টর অংশ।
তবে যুদ্ধের আগে যেমনটি দেখা গেছে এবং যুদ্ধের মাঝে যা আরও স্পষ্ট হলো—নিজেদের রাজনৈতিক, সামরিক ও বুদ্ধিজীবীদের রক্ষা করতে পারছে না ইরান। যুদ্ধে তাদের সর্বোচ্চ নেতা তাঁর আবাসস্থলেই নিহত হয়েছেন। আরও প্রায় কয়েক ডজন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা খুন হয়েছে। ইসরায়েল চাইলে ইরানের যে কাউকে হত্যা করতে পারে—এটা এই যুদ্ধের বড় এক বার্তা ছিল।
ইরানের অবকাঠামো এবং মানবসম্পদেরও বিপুল ক্ষতি হয়েছে যুদ্ধে। তাদের প্রায় সাড়ে তিন হাজার নাগরিক মারা গেছে গত সাড়ে তিন মাসে। লেবাননে মরেছে চার হাজার মানুষ। আগে থেকে চলমান আগ্রাসনে গাজায় অবকাঠামোর ৯০ শতাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সম্ভব হওয়া আসন্ন ‘সমঝোতা’ গাজা ও লেবাননে কতটা শান্তি আনবে সেটা স্পষ্ট নয়।
ইরানের ‘প্রক্সি’ হিসেবে লেবাননের হিজবুল্লাহকে এই যুদ্ধে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। কিন্তু হামাস ও হিজবুল্লাহর কারণে গাজা ও পশ্চিম তীরে প্যালেস্টাইনিদের এবং লেবাননের সাধারণ নাগরিকদের অচিন্তনীয় ক্ষতি হলো যুদ্ধের আগে-পরে। শিগগির এই যুদ্ধ বন্ধ হলে ইরানের শাসকরা নিশ্চিতভাবে উৎসব করবে—কিন্তু তাদের সঙ্গে হামাস ও হিজবুল্লাহর বন্ধুত্বের কারণে প্যালেস্টাইনি ও লেবানিজরা যেভাবে স্বজন ও সম্পদ হারালো তার ক্ষতিপূরণ কতটা হবে? তাদের সান্ত্বনাইবা কী হবে বোঝা মুশকিল। তারা হয়তো এ দফায় স্রেফ ভূ-রাজনৈতিক পাশাখেলার বলি হলো।
গত তিন মাসের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে প্যালেস্টাইন সমস্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনা দূরবর্তী বিষয় হয়ে গেছে। এই যুদ্ধে ইরানের সঙ্গে আরব আমিরাত, কুয়েত, সৌদি আরবের যে ঐতিহাসিক বিবাদ তৈরি হলো—সেটা প্যালেস্টাইনিদের মাতৃভূমি ফিরে পাওয়ার সংগ্রামে প্রয়োজনীয় আরব সমর্থন আরও দুরূহ করবে।
কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরব, আরব আমিরাত ভবিষ্যতে গোপনে ও প্রকাশ্যে সবসময়ই মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও তার ‘প্রক্সি’গুলোর বিরুদ্ধে কাজ করবে। তারা ইরানকে মোকাবিলায় ভবিষ্যতে গোপনে ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলবে বলে অনুমান করা যায়। ফলে এবারের যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক রঙ্গমঞ্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিলেও নতুন ধারার এমন একটা সামরিক মেরুকরণের জন্ম হতে পারে, যা পুরো মুসলমান বিশ্বকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলবে। সেটা যদি সুন্নি-শিয়া সমীকরণ আকারে হাজির হয়, তা হলে মুসলমান সমাজের জন্য বাড়তি বিপদ।
যুদ্ধ আপাত সমাপ্তিতে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ইরানের শাসকগোষ্ঠী মানসিকভাবে বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ‘সমঝোতা’র অংশ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ তুলে নেয় এবং তাদের আটককৃত সম্পদের অর্ধেকও ছেড়ে দেয়—তাহলে ইরান তার বিধ্বস্ত অবকাঠামো ঠিক করার কাজে নামতে পারবে সহজেই। বাড়তি হিসেবে তারা হরমুজ প্রণালিতে ‘নৌ-কর’ আদায়ের সুযোগ করে নিচ্ছে সমঝোতায়। এটা বিশ্বের জ্বালানি ভোক্তাদের জন্য খারাপ সংবাদ হলেও ইরানের অর্থনীতির জন্য বেশ ভালো খবর।
যুদ্ধকালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইইউভুক্ত দেশগুলোর কৌশলগত দূরত্ব দেখেছে বিশ্ব। ইরানের জন্য এটা বেশ স্বস্তির ছিল। এই দৃশ্য চীনের জন্যও উৎসাহের কারণ ঘটিয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালিকে জিম্মি করায় এই যুদ্ধ বিশ্ব পুঁজিতন্ত্রের জন্য মরণঘাতী হয়ে ওঠে। কিন্তু সংকটের দায় বর্তেছিল ওয়াশিংটনের ওপর। এরকম একটা পরিস্থিতিতে বিশ্ব পুঁজিতন্ত্রের অভিভাবক হিসেবে ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক কমেছে। বেপরোয়া শুল্কযুদ্ধের মধ্য দিয়েও ট্রাম্প একই কাজ করেছিলেন।
বিপরীতে, ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধে আপাত নিরপেক্ষ থেকে চীন শান্তিবাদী বৈশ্বিক ভূমিকার যে ইমেজ তৈরি করেছে, সেটা আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনের অভিভাবক হিসেবে তার দাবির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। শুল্কযুদ্ধেও বেইজিং যতটা নতজানু হয়ে পড়বে বলে ট্রাম্প প্রশাসন আশা করেছিল সেটা ঘটেনি।
শুল্কযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির ওপরে ধীরলয়ের পরিবর্তনকে আরও অনেক স্পষ্ট করেছে এবং সেখানে ওয়াশিংটনের নৈতিক জোর অনেকখানি কমিয়ে ফেলেছে। যা খুব ক্ষীণ হলেও একটা নতুন বিশ্বের ইঙ্গিত দেয়—যেখানে ওয়াশিংটনের জন্য কোথাও আর নিশ্চিত বিজয় অপেক্ষা করছে না। যদিও ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইউনূস সরকারের বাণিজ্যচুক্তির (এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড) কারণে বৈশ্বিক এই পরিবর্তনশীল মুহূর্তটি উপভোগ করার সুযোগ নেই বাংলাদেশের।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট




