অদ্ভুত এক সমাজে বসবাস আমাদের। কোনও কারণ ছাড়াই বা যেকোনও ইস্যুতে নারীর গায়ে হাত তোলা যেন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরের বউকে তো মারেই, এখন অন্য নারীর গায়ে প্রকাশ্যে হাত দিতেও একবার ভাবছে না দুর্বৃত্তরা। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় নারীকে প্রকাশ্যে মারধর ও নির্যাতনের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।
এই ঘটনাগুলো শোনার পর থেকে মনে হচ্ছে—সমাজে নারীর অবস্থান এতটাই অধস্তন যে, ঘরে-বাইরে নারীকে পেটানো আরও বেশি জায়েজ হয়ে যাচ্ছে! নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় এক নারীকে প্রকাশ্যে পিটিয়েছে যুবদলের স্থানীয় একজন নেতা। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
একজন নারীকে প্লাস্টিকের পাইপের ভেতর লোহার রড ঢুকিয়ে প্রকাশ্যে বেধড়ক মারধর করা হয়েছে। ভুক্তভোগী নারীর স্বামীর বকেয়া বেতন চাওয়া এবং মাছ ধরার জাল নিয়ে বিরোধের জেরে এই হামলা চালানো হয়। মারধরের ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর অভিযুক্ত সফিককে দল থেকে বহিষ্কার করেছে উপজেলা যুবদল।
পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় বউকে বাসায় মেরে অচেতন করে টমটমে তুলে বাপের বাড়ি পাঠানোর সময় বউয়ের জ্ঞান ফিরে আসে। এরপর টমটমে আবার মেরে রশি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয় জনতা এই অবস্থা দেখে টমটম থামায়। এতে স্থানীয় মানুষের ওপর চড়াও হয়েছিল স্বামী ও শ্বশুর। এলাকাবাসী স্বামী ও শ্বশুরকে পুলিশে দিয়ে ওই নারীকে রক্ষা করেন। অভিযোগ, ওই নারীর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার পর তাকে প্রতিদিন মারতো, যেন তিনি স্থায়ীভাবে বাবার কাছে চলে যান। এই ঘটনা শুনে মনে হলো—‘দ্য স্টোনিং অব সুরাইয়া এম’ নামে ২০০৮ সালের একটি সিনেমার কথা। এবড়ো-থেবড়ো একটি জায়গায় গর্ত খুঁড়ে, হাত পা বেঁধে একটি মেয়েকে সেখানে নামানো হলো, পরনে তার সাদা কাপড়।
গর্তে মেয়েটিকে কোমর পর্যন্ত পুঁতে চারপাশ মাটি দিয়ে ভরাট করা হলো। এরপর শুরু হলো দূর থেকে পাথর ছোড়া। প্রথম পাথরটি ছোড়ে মেয়েটির বাবা। তারপর এক এক করে সবাই। এমনকি সুরাইয়ার দুই নাবালক ছেলেকেও পাথর ছুড়তে বাধ্য করা হলো মায়ের দিকে। ক্রমশ সুরাইয়ার দেহ লুটিয়ে পড়ে, চারদিক ছিটকে পড়লো রক্ত। শেষ শ্বাস ফেলা পর্যন্ত সবাই অপেক্ষা করলো এবং ইট মারতেই থাকলো।
ইরানের একটি ছোট গ্রামের গৃহবধূ সুরাইয়াকে ‘ব্যভিচারের’ দায়ে এভাবেই হত্যা করা হয়েছিল। তার স্বামী ১৪ বছরের একটি শিশুকে দ্বিতীয় বিয়ে করবে বলে সুরাইয়ার বিরুদ্ধে ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ এনেছিল। দেশের নিয়ম অনুযায়ী সুরাইয়াকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
একসময়ে ইরানে পরিবার ও সমাজ নারীকে অন্তরীণ করে রাখতো। চলমান নিয়মের বিন্দুমাত্র বরখেলাপ হলে শাস্তি দিতো, যেমনটা দিয়েছিল মাশা আমিনকে। মাশা যদি মারা না যেতেন, তাহলে হয়তো এভাবেই চলতো সব কিছু।
সেখানে নারী নিপীড়নের সঙ্গে রাষ্ট্রের আইন জড়িত। আমাদের সমাজেও দিনে দিনে প্রকট হচ্ছে নারীবিদ্বেষী মনোভাব। দেশের নানা ধরনের বড় সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে একটি গোষ্ঠী শুধু নারীর পোশাক ও স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে আস্ফালন করেই যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নারীকে দমন করতে পারলেই যেন সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
একশ্রেণির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা তাদের বক্তব্যে নারীবিদ্বেষী, নারীর প্রতি অবমাননাকর ও অর্থহীন কথা বলেন এবং দেশের বহু মানুষ নারীদের বিরুদ্ধে এসব অসম্মানজনক কথা শুনেন এবং সেভাবেই আচরণ করেন।
কয়েক দিনের মধ্যে শরীয়তপুরে একজন নারীকে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হয়েছে। তার চুল কেটে দেওয়া এবং মুখে কালি মাখিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে। নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার হাতুড় ইউনিয়নে এক নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগী নারীর অপরাধ, তিনি স্থানীয় মানববন্ধনে বক্তব্য দিয়েছিলেন, যার জের ধরে প্রতিপক্ষরা তার ওপর এই হামলা চালিয়েছে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক সাঁওতাল নারীকে মারধর এবং তাঁর বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
পরপর ঘটে যাওয়া এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, এগুলো নারীকে শায়েস্তা বা হেয় করারই অংশ। আমাদের সমাজের শিক্ষিত, অশিক্ষিত ও নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ মনে করেন—সারা শরীর আবৃত না করে এবং স্বাধীনভাবে যে নারী চলাফেরা করেন, তারা ‘ভালো মেয়ে’ নন। এই কথা মনে করেন এক গবেষণায় অংশ নেওয়া শতকরা ৬৪ জন মানুষ। নারীর এই ‘মন্দ মেয়ে’র মতো আচরণ সমাজে অনাকাঙ্ক্ষিত, কারণ সেটা অন্য ছেলে-মেয়েদের নষ্ট করে ফেলবে।
তাই ‘মন্দ মেয়ে’র মতো আচরণ যারা করেন, তাদের সেটা থেকে বিরত রাখার জন্য, সেসব মেয়েদের হেয় করা, মারধর করা, মন্দ বলা ও তাদের প্রতি অপমানজনক আচরণ করা সমাজের জন্য উপকারী। এসব ভ্রান্ত ধারণা থেকেই অসংখ্য নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। (সূত্র: ‘‘বাংলাদেশে ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সহজ বিস্তার এবং নারীর প্রতি সহিংসতা” শীর্ষক গবেষণা)।
শুধু নারীর প্রতি পুরুষের নয়, অন্য নারীরও ভয়াবহ ক্ষোভ আছে। এর সাথে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে হীনতা, নিচতা, পরাধীন জীবন, বন্দিত্ব, যৌন ঈর্ষা ও নিজের স্বামী বা ছেলেকে নিয়ে অনিরাপত্তা বোধ। নারী যে কারণে অন্য নারীকে পোশাকের জন্য বা অন্য কারণে হেয় করেন, সেটা প্রধানত হলো—নিজের ভেতরে থাকা নারীবিদ্বেষ (ইন্টার্নালাইজড মিসজিনি)। প্রায় চার বছর আগে করা গবেষণাটি বলছে, আমাদের দেশে ইন্টার্নালাইজড মিসজিনি বাড়ছে। এই বিদ্বেষ থেকেই ব্যাপক সংখ্যক নারীও পুরুষের পাশাপাশি নারীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন।
নারীর প্রতি নানা ধরনের যুক্তিহীন ও অবমাননাকর ধারণা পোষণ করেন শতকরা ৭৯ জন উত্তরদাতা।
এছাড়া প্রচুর সংখ্যক কিশোর, যুবক ও পরিণত পুরুষ নারীর প্রতি অবমাননাকর কনটেন্ট নিয়মিত দেখেন বলে গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৮১ ভাগ উত্তরদাতা মনে করেন। এর মধ্যে আছে দেশীয় কনটেন্টে তৈরি পর্নোগ্রাফি ফেসবুক লাইভ, টিকটক, লাইকি, ইমো লাইভ, গেইম, বাংলা নিম্নমানের সিনেমা এবং ওয়েবসিরিজ। তারা মনে করেন, মন্দ মেয়েরা, মন্দ ছেলেদের চাইতেও বেশি বিপজ্জনক। এখানে নারীকে হেয় করতে গিয়ে পুরুষের আগ্রাসী আচরণকেও সমর্থন দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে একটা বড় অংশ পুরুষ দেশীয় পর্নোগ্রাফি দেখেন শুধু অশ্লীলতা আস্বাদনের জন্য নয়। এর চাইতেও বেশি দেখেন নারীকে নির্যাতন ও অপমান করার ও নারীকে নিপীড়নের উপায় খুঁজে বের করার জন্য। এমনকি মেয়েরা যে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হন, এ জন্যও মেয়েরাই দায়ী—এই কথাও বিশ্বাস করেন শতকরা ৫৩ শতাংশ উত্তরদাতা। সমাজের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও পুরুষ যখন এ ধরনের অযৌক্তিক চিন্তা করেন, তখন সেই সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা দূর হবে কেমন করে?
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৩৭৬ জন শিশু-কিশোরী এবং ৫৩২ জন নারী অর্থাৎ মোট ৯৩৬ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন কারণে মোট ২২০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে ৮১ জনের।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানিয়েছে, ২০২৬-এর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১৮৩ জন নারী। এর মধ্যে স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ৭৪ জন, আর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ৪৯ জন।
বাংলাদেশে নারীদের বিরুদ্ধে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতা (ইনটিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স-আইপিভি) এখনও ব্যাপকভাবে চলছে।
দেশের ৭০ শতাংশ নারী তাদের জীবদ্দশায় এ ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতা, পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ। (জরিপ ২০২৪, প্রকাশিত ২০২৫: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল) সমাজে প্রচলিত অসংখ্য ভ্রান্তধারণা থেকেই ঘরে-বাইরে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। এখানে সেক্সসিজম হচ্ছে নারীকে শায়েস্তা করার একটা হাতিয়ার। সেজন্যই সমাজে নারীর প্রতি ঘৃণা বাড়ছে, বাড়ছে মরাল পুলিসিং ও নিপীড়ন। ফেসবুকে চালু হয়েছে অত্যন্ত অশ্লীল ও নারীকে নির্যাতন করার ভিডিও গেম। প্রতিদিন এগুলোর ভিউ বাড়ছে। এটা খেলা নয়, আদতে মরাল পুলিশিং এবং নারীকে কীভাবে শায়েস্তা করা যায় এর উপায় বলে দেওয়া। মূলত মানুষের মনোজগৎকে নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক করে তোলার জন্যই এগুলো তৈরি করা হচ্ছে।
দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। আইন আছে, আইনের মতো কিন্তু মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে কি? যখন কোনও ঘটনা ঘটে, তখন সেটা নিয়ে হইচই হয়। কিন্তু তারপর সব চুপচাপ, আবার নতুন কোন নিপীড়নমূলক ঘটনা ঘটে। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো কোনও সরকারই এগুলো থামানোর চেষ্টা করে না। নারী বিদ্বেষ যে ভয়াবহ একটি অপরাধ, সেটাও ধর্তব্যের মধ্যে নেওয়া হচ্ছে না। ফলে সমাজে নারী বিদ্বেষ চলমান আছে এবং হয়তো থেকেই যাবে।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক



