ডিম একটি অত্যন্ত উপকারী খাদ্য। চিকিৎসকরা বলেন, এতে প্রোটিন আছে, পুষ্টি আছে, শক্তি আছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিমের আরেকটি নতুন ব্যবহার আবিষ্কৃত হয়েছে, এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডিম থেরাপি’। এখন এটি অনেকের কাছে প্রতিবাদের অস্ত্র, রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রকাশ, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার শর্টকাট পথ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে থেরাপির উদ্দেশ্য রোগ সারানো। কেউ ফিজিওথেরাপি নেন, কেউ কেমোথেরাপি, কেউ সাইকোথেরাপি। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সম্প্রতি এক নতুন থেরাপির আবির্ভাব ঘটেছে—‘ডিম থেরাপি’। এই থেরাপির কোনও মেডিক্যাল স্বীকৃতি নেই, কোনও গবেষণাপত্র নেই, এমনকি কোনও হাসপাতালের বহির্বিভাগেও এর চর্চা হয় না। তবু এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জব্দ করতে ডিম নিক্ষেপকে অনেকেই ‘একমাত্র দাওয়াই’ হিসেবে দেখছেন। এই শ্রেণির মানুষ মনে করছেন আদালত, তদন্ত, বিচার—এসব পুরোনো পদ্ধতি। তার চেয়ে একটি বা দুটি ডিমই যথেষ্ট!
দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক নেতাদের লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। একসময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘেরাও করা হতো, কালো পতাকা দেখানো হতো, স্লোগান দেওয়া হতো। এখন সেই জায়গা দখল করছে ডিম।
বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক কিছু দেখিয়েছে। মিছিল দেখিয়েছে, অবরোধ দেখিয়েছে, মানববন্ধন দেখিয়েছে, কুশপুত্তলিকা দাহ দেখেছে। কিন্তু এখন প্রতিবাদের ভাষা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে ঘিরে ধরা, ভিডিও করা, অপদস্থ করা, ডিম ছোড়া কিংবা সামাজিক মাধ্যমে তার ‘লাইভ শাস্তি’ সম্প্রচার করা যেন নতুন এক জনবিনোদনে পরিণত হয়েছে। বিচারক, প্রসিকিউটর ও জল্লাদ—তিন ভূমিকাতেই এখন অনেক রাজনৈতিক কর্মী নিজেকে দেখাতে শুরু করেছেন।
সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। দলের নেতা আখতার হোসেন, নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী বিভিন্ন সময়ে এমন ঘটনার শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ হাসনাত আবদুল্লাহ লন্ডনে গিয়ে ডিম নিক্ষেপের শিকার হয়েছেন। এই ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কারণও থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক মতভেদ প্রকাশের ভাষা কি এখন ডিম ছোড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে? আরও বড় প্রশ্ন হলো, এতে কার লাভ হচ্ছে?
যারা ডিম ছুড়ছে, তারা হয়তো মনে করছে তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শিক্ষা দিচ্ছে। বাস্তবে তারা কাকে শিক্ষা দিচ্ছে? রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে, নাকি অসহিষ্ণুতাকে?
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকবে। মতের অমিল থাকবে। তর্ক হবে, বিতর্ক হবে, সমালোচনা হবে। কিন্তু যখন যুক্তির জায়গা দখল করে ডিম, তখন বোঝা যায় রাজনৈতিক সংস্কৃতি দুর্বল হচ্ছে। কারণ যে সমাজে যুক্তি শক্তিশালী থাকে, সেখানে মানুষ প্রশ্ন করে। আর যেখানে যুক্তি দুর্বল হয়ে যায়, সেখানে মানুষ জিনিসপত্র ছোড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ডিম নিক্ষেপের ঘটনাগুলোকে অনেকেই বিনোদন হিসেবে নিতে শুরু করেছেন। কোনও নেতার গায়ে ডিম লাগলে সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে। ফেসবুকে হাসির ইমোজি, ইউটিউবে শর্টস, টিকটকে ব্যঙ্গাত্মক মিউজিক— সব মিলিয়ে ঘটনাটি যেন রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, এক ধরনের বিনোদন প্যাকেজ। আমরা কি সত্যিই এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাই?
একবার যদি সমাজে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, অপছন্দের মানুষকে প্রকাশ্যে অপদস্থ করা গ্রহণযোগ্য, তাহলে এর সীমা কোথায়? ভাবুন তো, এসএসসি পরীক্ষায় কোনও ছাত্র কম নম্বর পেলো। সে রাগ করে শিক্ষকের ওপর ‘ডিম থেরাপি’ চালু করলো, রোগী সুস্থ হলো না বলে চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে ডিম নিয়ে অবস্থান নিলো, কোনও কর্মকর্তা কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে দেরি করলেন, সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো ‘ডিম থেরাপি’! শুনতে হাস্যকর লাগছে? কিন্তু সামাজিক আচরণের ইতিহাস বলে, কোনও খারাপ সংস্কৃতি এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি সংক্রামক রোগের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অসভ্যতা কখনও এক জায়গায় থেমে থাকে না। এটি সংক্রমণের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সংস্কৃতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। আগে মানুষ প্রতিবাদ করত প্রতিবাদের জন্য। এখন অনেকেই প্রতিবাদ করেন ভিডিওর জন্য। ডিম ছোড়ার পর আসল আনন্দ ডিমে নয়, রিলসে। কে কত ভালো অ্যাঙ্গেলে ভিডিও ধারণ করতে পারলো, কত দ্রুত আপলোড করতে পারলো, কত বেশি লাইক পেলো—এটাই যেন মূল বিষয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এখন অনেকের কাছে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, কনটেন্ট।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছি, নাকি ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছি? এখানে সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তিনি জনপ্রিয় হোন বা অজনপ্রিয়, ক্ষমতাসীন হোন বা বিরোধী দলের নেতা, আইনের চোখে সবাই সমান। যদি কোনও রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যে আক্রান্ত হন এবং রাষ্ট্র শুধু দর্শকের ভূমিকা পালন করে, তাহলে একটি বিপজ্জনক বার্তা যায়— আইন নয়, জনতার তাৎক্ষণিক রায়ই শেষ কথা। এটি কোনও সভ্য রাষ্ট্রের জন্য সুখকর বার্তা নয়।
অনেক সময় দেখা যায়, অভিযুক্ত কাউকে আদালতে নেওয়া হচ্ছে। আশপাশে উত্তেজিত জনতা জড়ো হয়েছে। কেউ ডিম হাতে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ মোবাইলের ক্যামেরা অন করেছে। অথচ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা নির্বিকার।
যেন ঘটনাটি কোনও সামাজিক উৎসবের অংশ। এখানে প্রশ্ন হলো, পুলিশ কি শুধু ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি আইনের শাসনও নিশ্চিত করবে? কারণ আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখনই, যখন অভিযুক্ত ব্যক্তি সমাজের কাছে অজনপ্রিয় হন। জনপ্রিয় মানুষের অধিকার রক্ষা করা সহজ। কিন্তু যাঁকে সবাই ঘৃণা করছে, তাঁরও আইনি অধিকার নিশ্চিত করা সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তবে দায় শুধু সরকারের নয়। রাজনৈতিক দলগুলোরও দায় কম নয়। কারণ আমাদের দেশে প্রায় সব দলই ক্ষমতায় থাকলে এক কথা বলে, বিরোধী দলে গেলে আরেক কথা বলে। নিজের নেতার ওপর ডিম পড়লে সেটিকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলা হয়, আর প্রতিপক্ষের নেতার ওপর ডিম পড়লে সেটিকে ‘জনরোষ’ বলে ব্যাখ্যা করা হয়। এই দ্বিচারিতা বন্ধ হওয়া দরকার।
আজ যারা প্রতিপক্ষকে ডিম ছুড়ে অপদস্থ করার মধ্যে আনন্দ পাচ্ছেন, তাঁদের মনে রাখা উচিত—রাজনীতির নাগরদোলা কখনও এক জায়গায় থেমে থাকে না। আজ আপনি ওপরে, কাল অন্য কেউ। আজ আপনার সমর্থকের হাতে ডিম, কাল হয়তো অন্যের হাতে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো ক্ষমতার পরিবর্তন। আর এই কারণেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান সব দলের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, জনসমর্থনও নয়। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী। সেটি নষ্ট হলে ক্ষতি সব দলের, সব নাগরিকের।
বাংলাদেশ আজ বিশ্বের সামনে নিজেকে একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে চায়। আমরা বিনিয়োগ চাই, উন্নয়ন চাই, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে চাই। কিন্তু যখন বিদেশি সংবাদমাধ্যমে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডিম ছোড়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, তখন দেশের ভাবমূর্তি কতটা উজ্জ্বল হয়?
এটাও মনে রাখা দরকার, অপকর্ম বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ থাকতেই পারে। সেই ক্ষোভ যৌক্তিকও হতে পারে। কিন্তু বিচার করার জন্য রাষ্ট্র আছে, আদালত আছে, আইন আছে। যদি প্রতিটি অভিযোগের বিচার রাস্তায় শুরু হয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রয়োজন কী?
একজন অপরাধীকে আইনের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া আর জনতার সামনে অপমান করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি ন্যায়বিচার, দ্বিতীয়টি প্রতিশোধের সংস্কৃতি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সহনশীলতা।
প্রয়োজন ভিন্নমতকে মোকাবিলা করার রাজনৈতিক সাহস। কারণ যে নেতা সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না, তিনি গণতন্ত্রের জন্য উপযোগী নন। আবার যে কর্মী বা সমর্থক যুক্তির বদলে ডিমকে অস্ত্র হিসেবে বেছে নেয়, সেও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করছে না।
ডিম মানুষের খাদ্য হোক, শিশুর পুষ্টির উৎস হোক, কৃষকের আয়ের মাধ্যম হোক। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতীক না হোক। আজ যদি আমরা ডিম নিক্ষেপকে হালকা বিনোদন বলে উড়িয়ে দিই, কাল হয়তো আরও ভয়ংকর কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তাই সময় থাকতে রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে, সরকারকে কঠোর হতে হবে এবং রাজনৈতিক কর্মীদেরও বুঝতে হবে—গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষকে হারানোর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ডিম নয়, যুক্তি।
কারণ ডিম ছুড়ে কেউ দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে না। বরং বিশ্বকে জানিয়ে দেয়, আমরা এখনও মতের লড়াইকে যুক্তির ময়দান থেকে সরিয়ে অপমানের মঞ্চে নিয়ে যেতে প্রস্তুত। আর সেটি কোনও গণতন্ত্রের জন্য গৌরবের নয়, লজ্জার।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট