স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বংশীয় পদবি মীর। তার দুই ছেলের নাম সীমান্ত ও দিগন্ত। তার এক প্রবাসী ভাতিজির নাম স্বর্ণ। সম্প্রতি বগুড়ার মোকামতলা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে বিতর্ক ওঠে। এগুলো হচ্ছে মীরগ্রাম, দিগন্ত, সীমান্ত ও স্বর্ণগ্রাম।
বলা হচ্ছে, মীরগ্রাম ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে প্রতিমন্ত্রীর বংশের নামে। দিগন্ত ও সীমান্ত ইউনিয়ন তার দুই ছেলের নামে। আর স্বর্ণগ্রাম নামকরণ করা হয়েছে তার ভাতিজির নামে। গত ১৫ জুন রাতে জাতীয় সংসদে জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। স্মরণ করিয়ে দেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও শেখ পরিবারের নামে এরকম বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রবণতা দেখা যেত। যদিও এর জবাবে মীর শাহে আলম দাবি করেন, সীমান্ত ইউনিয়ন সীমান্তবর্তী এবং দিগন্ত ইউনিয়ন দূরবর্তী হওয়ায় এমন নামকরণ। তার সন্তানদের নামের সঙ্গে মিল থাকলেও তিনি পারিবারিক প্রভাব অস্বীকার করেন। বলেন, দুটি ইউনিয়নের নাম তার দুই ছেলের নামে হওয়াটা ‘মিরাকল’ (অলৌকিক)।
কিন্তু এটা যে মিরাকল বা কাকতালীয় নয়, বরং প্রতিমন্ত্রী নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করে নিজের বংশ, দুই ছেলে ও ভাতিজির নামে ইউনিয়ন চারটির নামকরণ করেছেন, সেটি বোঝার মতো কাণ্ডজ্ঞান দেশবাসীর আছে। যে কারণে বিষয়টি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়। প্রতিমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা ওঠে খোদ বিএনপির তরফেই। শুধু এই দুটি ইউনিয়ন নয়, বরং আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম মীর শাহে আলম এবং তার পরিবারের লোকদের নামে হওয়ার ঘটনা নিয়ে বিএনপির মধ্যেই অস্বস্তি রয়েছে—এমন সংবাদও প্রকাশিত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মীরগ্রাম, দিগন্ত ও সীমান্ত ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ কথা প্রচলিত যে, মীর শাহে আলম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ এবং বগুড়ায় বাড়ি বলে যেকোনও মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর চেয়ে তিনি বেশি প্রভাবশালী। তা সত্ত্বেও বিতর্ক এড়াতে প্রধানমন্ত্রীর এমন পদক্ষেপ প্রশংসনীয়।
প্রশ্ন হলো, একজন প্রতিমন্ত্রী কেন নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে স্থান, স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করলেন বা করতে চাইলেন? এখানে মোটা দাগে কারণ দুটি। ১. নিজের ক্ষমতার প্রদর্শন এবং ২. মৃত্যুর পরেও জীবিত থাকা। অর্থাৎ একসময় তিনি মারা যাবেন, কিন্তু বিভিন্ন স্থাপনায় তার ও তার সন্তানদের বা পরিবারের অন্য সদস্যদের নাম থাকবে। ওই সদস্যরাও একসময় মারা যাবেন। কিন্তু মানুষ তাদের নাম উচ্চারণ করবে। তাদের নাম সাইনবোর্ডে থাকবে। প্রতিষ্ঠানের নামফলকে থাকবে। এটি মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকার একটি কৌশল।
যদিও মৃত্যুর পরে বেঁচে থাকার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে জনকল্যাণ। দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করলে, মানুষের পাশে দাঁড়ালে, ভালো কাজ করলেই বরং মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকা যায়। মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। আরেকটি উপায়ে বেঁচে থাকা যায়। সেটি হচ্ছে লেখালেখি। জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ লেখক হতে পারলে মৃত্যুর একশো বছর বা তারও বেশি সময় পরেও মানুষ তাকে স্মরণ করে। তার লেখা পড়ে। আবার চরম খারাপ কাজ করলেও মানুষ মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে। যদিও সেই বেঁচে থাকাটা অসম্মানের। মানুষ তখন তাকে স্মরণ করে মূলত তার সমালোচনার জন্য। সুতরাং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে স্থান, স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে দেওয়া বা নামকরণের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার যে আকুতি, সেটি দিন শেষে মানুষ পছন্দ করে না। মানুষ এভাবে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে মনে রাখে না। বরং এই ধরনের নামকরণের চেষ্টা শুধু একজন প্রতিমন্ত্রী বা এমপির জন্যই নয়, বরং পুরো দলের জন্যই বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী যদি ইউনিয়ন চারটির নাম নিরপেক্ষ বা পক্ষপাতমুক্ত এবং সুন্দরভাবে নামকরণের নির্দেশ দিতেন; যদি মোকামতলা উপজেলার দলনিরপেক্ষ এবং সর্বজনগ্রাহ্য কোনও মানুষের নামে করতেন; কিংবা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কোনও নদীর নামে, অথবা ওই ইউনিয়নের কোনও বিখ্যাত খাবারের নামে—তাহলেও এ নিয়ে বিতর্ক উঠত না। মীরগ্রাম, দিগন্ত, সীমান্ত ও স্বর্ণগ্রাম নিশ্চয়ই শ্রুতিমধুর। কিন্তু এই নামকরণের পেছনে রাজনীতি আছে। ব্যক্তিস্বার্থ আছে। যেটি মানুষ বোঝে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থান, স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যে কতভাবে অসম্মানিত করা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। একসময় যে মানুষটির প্রতিশব্দ ছিল বাংলাদেশ; যার ডাকে সাড়ে সাত কোটি মানুষ মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল; যার নামেই মূলত ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে—সেই মানুষটির নামে এমন সব অতি সাধারণ স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছিল, যা তার মতো একজন মহান নেতার মর্যাদার হানি ঘটিয়েছে। আবার মওলানা ভাসানির মতো নেতার নাম মুছে সেই স্থাপনার নামও (ভাসানী নভোথিয়েটার) বঙ্গবন্ধুর নামে করা হয়েছিল—যার কোনও প্রয়োজন ছিল না। এর বাইরে শেখ পরিবারের লোকজনের নামে দেশে যে কত শত প্রতিষ্ঠান ছিল, তার হিসাব নেই। এর পেছনেও ছিল আওয়ামী লীগ সরকার তথা শেখ হাসিনার ক্ষমতা প্রদর্শন এবং মৃত্যুর পরেও তার ও তার পরিবারের লোকদের নাম যাতে মানুষ উচ্চারণ করে—তার প্রয়াস। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে বঙ্গবন্ধু এবং শেখ পরিবারের নামাঙ্কিত সব প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে দেওয়া হয়েছে। তার মানে যে উদ্দেশ্যে নামকরণ করা হয়েছিল, তা সফল হয়নি। বরং অপ্রয়োজনীয়ভাবে বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে প্রথমত আওয়ামী লীগ তার অসম্মান করেছে, এরপর ওই নামগুলো মুছে দিয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার দ্বিতীয় দফায় তাকে অসম্মানিত করেছে। নামকরণ ও নাম বদলের এই রাজনীতির শিকার হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতির এমন অসম্মান নিশ্চয়ই প্রাপ্য ছিল না।
অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে শুধু বঙ্গবন্ধু বা শেখ পরিবারের নামই বাদ দেওয়া হয়েছে, তা নয়। বরং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে জীববিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, প্রখ্যাত রসায়নবিদ ও শিক্ষক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, পদার্থবিজ্ঞানী ও শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বসু, রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের নামও বাদ দেওয়া হয়েছে। বোঝাই যায়, এসব নাম বাদ দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র ওই ব্যক্তিদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই।
ওই সময়ে বদলে দেওয়া হয় কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের নামাঙ্কিত পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের সুচিত্রা সেন ছাত্রীনিবাসের নাম। সেটির নামকরণ করা হয় ‘জুলাই ৩৬ ছাত্রীনিবাস’। সেই সঙ্গে কলেজের শেখ রাসেল ছাত্রাবাসের পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বিজয় ২৪ ছাত্রাবাস’ এবং বেগম ফজিলাতুন্নেছা ছাত্রীনিবাসের পরিবর্তিত নাম ‘আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) ছাত্রীনিবাস’। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছার নামের স্থলে মহানবীর (স.) স্ত্রী হজরত আয়েশা (রা.)-এর নাম প্রতিস্থাপনও একটি রাজনীতির অংশ—সেটি না বোঝার কোনও কারণ নেই। কিন্তু সুচিত্রা সেনের নাম পরিবর্তন করে সেই হলের নাম ‘জুলাই ৩৬ ছাত্রীনিবাস’ করা নিশ্চয়ই জরুরি ছিল না। যেমন জরুরি ছিল না মোকামতলা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের নাম স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বংশ ও সন্তানদের নামে নামকরণ। জরুরি যে ছিল না, সেটা প্রমাণ হয়ে গেল নামগুলো পরিবর্তনের বিষয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার মধ্য দিয়ে।
পরিশেষে, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বাহাত্তর বছর। বড় অসুখ-বিসুখ না থাকলে এবং প্রাচুর্যের মধ্যে থাকলে হয়তো ৯০ বছর পর্যন্তও অনেকে বেঁচে থাকেন। কিন্তু তাকে মরতেই হবে। সুতরাং মৃত্যুর পরেও যদি বেঁচে থাকার ইচ্ছা থাকে, তাহলে স্থান, স্থাপনা বা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ কোনও উত্তম তরিকা নয়। মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকার উত্তম তরিকা হলো জনকল্যাণ। দেশের জন্য কাজ করা। ভালো কাজ করা। ভালো কাজের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। এমন কাজ করে যাওয়া, যার সুফল মানুষ যুগের পর যুগ ভোগ করতে পারে। আর এসবের বাইরে গিয়ে জনপ্রিয় লেখক হতে পারলেও মৃত্যুর পরে বেঁচে থাকা যায়। যেমন এখনও বেঁচে আছেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ। বেঁচে আছেন কিটস, মার্কেজ, শেলি।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক



