কল্পনা করুন এমন এক মায়ের কথা, যাকে প্রতিদিন কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে মাইলের পর মাইল হেঁটে লবণাক্ত কাদা জল ভেঙে মাত্র এক কলস মিষ্টি পানি সংগ্রহ করতে হয়। কিংবা সেই কিশোরী মেয়েটির কথা ভাবুন—যার স্কুলজীবন থমকে গেছে স্রেফ মাসিকের দিনগুলোতে একটি নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাবে।
যখন আমরা বড় বড় আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে গ্রিনহাউস গ্যাস, কার্বন মার্কেট কিংবা কোটি কোটি ডলারের বৈশ্বিক তহবিল নিয়ে কাগুজে ম্যাপ আঁকি—তখন প্রত্যন্ত চরের বা উপকূলের এই নারীদের চোখের জল আর প্রতিদিনের চরম মানবিক অবমাননা আমাদের নীতিনির্ধারকদের অলক্ষ্যেই থেকে যায়।
আমাদের জলবায়ু যুদ্ধের আসল ফ্রন্টলাইন কোনও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গোলটেবিল বৈঠক নয়, আমাদের আসল যুদ্ধটি হলো—এক ফোঁটা নিরাপদ সুপেয় পানি এবং ন্যূনতম শারীরিক মর্যাদা নিশ্চিত করার যুদ্ধ।
এতদিন ধরে আমাদের পরিকল্পনাগুলোতে পানি, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ)-কে দেখা হতো স্রেফ প্রকৌশলীদের পাইপলাইন বসানো বা টিউবওয়েল পোঁতার কারিগরি কাজ হিসেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই মানসিকতায় একটি বড় ও ইতিবাচক ধাক্কা লেগেছে। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ও আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশের ‘জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা’ (এনএপি) এবং ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশনস’ (এনডিসি ৩.০)-এর মধ্যে এক যুগান্তকারী সংযোগ তৈরি হয়েছে।
ন্যাপ-এর ৩ নম্বর লক্ষ্য স্পষ্ট করে বলছে যে ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু-স্মার্ট শহর গড়তে হলে কেবল ড্রেনেজ বানালে হবে না, মানুষের স্বাস্থ্য ও ওয়াশ ব্যবস্থার আমূল রূপান্তর ঘটাতে হবে। ন্যাপ-এর খাতভিত্তিক নীতিমালায় এখন জলবায়ু-সহনশীল ওয়াশ প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সরকারি নথিতেই স্বীকার করা হয়েছে যে জলবায়ু অর্থায়নে ওয়াশ খাতটি দীর্ঘদিন ধরে ‘লাল চিহ্নিত’ বা প্রায় অচল অবস্থায় ছিল। ন্যাপ ও এনডিসি ৩.০-এর এই নতুন বোঝাপড়া সেই অচলাবস্থাকে ভেঙে ফেলার এক মোক্ষম সুযোগ এনে দিয়েছে।
শুনতে অবাক লাগলেও স্যানিটেশন বা আমাদের ঘরের ল্যাট্রিন শুধু জনস্বাস্থ্যের বিষয় নয়, এটি বিশ্ব উষ্ণায়ন কমানোর বা জলবায়ু প্রশমনের (মিটিগেশন) এক অসামান্য হাতিয়ার।
১. সাধারণ খোলা ল্যাট্রিন বা ড্রেনে যখন বর্জ্য অক্সিজেন ছাড়া পচে, তখন তা থেকে বিপুল পরিমাণ ‘মিথেন’ গ্যাস নির্গত হয়, যা পরিবেশের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। ২. এর সমাধান হিসেবে আমাদের সামনে বড় উদাহরণ নীলফামারীর সৈয়দপুর ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এফএসটিপি)। সেখানে বৈজ্ঞানিক অ্যারোবিক (অক্সিজেনযুক্ত) উপায়ে বর্জ্য ও ময়লা আবর্জনা থেকে কো-কম্পোস্টিং বা উন্নত জৈব সার তৈরি করা হচ্ছে।
এই একটি মাঝারি প্ল্যান্ট বছরে প্রায় ৮৪.৪০ টন ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস বাতাসে ওড়া বন্ধ করছে। এর কারণ, সেখানে একই সাথে সৌরশক্তি ব্যবহার করা হয় এবং বৃষ্টির পানি ধরে রেখে মাটির নিচের পানির ওপর চাপ কমানো হচ্ছে।
যদি এই আধুনিক, জলবায়ু-স্মার্ট স্যানিটেশন মডেলটি বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য দেশব্যাপী বাস্তবায়ন করা যায়, তবে কেবল স্যানিটেশন খাত থেকেই প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টন কার্বন সমতুল্য গ্যাস নিঃসরণ কমানো সম্ভব!
স্যানিটেশনের এই বর্জ্য থেকে যে জৈব সার তৈরি হয়, তা মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং বাতাসের কার্বনকে মাটিতে আটকে রাখতে সাহায্য করে। ফলে রাসায়নিক সারের ব্যবহারও কমে যায়।
কাগজে-কলমে সুন্দর নীতি থাকলেই মানুষের তৃষ্ণা মেটে না। জলবায়ুর বরাদ্দ করা অর্থ যেন সরাসরি মানুষের কল্যাণে লাগে, সেজন্য আমাদের পরিকল্পনা কাঠামোয় কিছু জরুরি সংস্কার দরকার—পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের মধ্যকার প্রশাসনিক দূরত্ব দূর করতে হবে। এনএপি ও এনডিপি ৩.০ থেকে পাওয়া তহবিল সরাসরি মাঠপর্যায়ের জলবায়ু-সহনশীল পানি অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
পুরোনো ও অকেজো পদ্ধতির পেছনে টাকা নষ্ট না করে সৌরচালিত পানি শোধন প্ল্যান্ট এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের আধুনিক নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। এতে বেসরকারি খাতকেও অংশীদার করতে হবে।
ন্যাপ-এর গাইডলাইন অনুযায়ী প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য আলাদা, জলবায়ু- সহনশীল এবং নিরাপদ ওয়াশ ও পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনতে হবে।
জলবায়ু ও বন্যার চরম দুর্যোগেও যারা আমাদের শহরের ড্রেন ও স্যানিটেশন সচল রাখেন, সেই পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অবহেলা করা চলবে না। তাদের জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিমার আওতায় এনে জলবায়ুযোদ্ধা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
আমরা এখন এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। একটি মানবিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের সফলতা কেবল দেশের জিডিপি বৃদ্ধি কিংবা অর্থনৈতিক বড় বড় পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। রাষ্ট্রের আসল বিবেক ও সাম্য তখনই প্রমাণিত হয়, যখন দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক ও দারিদ্র্যে বসবাসকারী নাগরিকটি ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা পায়।
জলবায়ু সহনশীলতা বা রেজিলিয়েন্স কোনও আন্তর্জাতিক সেমিনারের গালভরা শব্দ নয়, এটি সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার—যার শুরু হয় মাত্র এক ফোঁটা নিরাপদ পানি থেকে। প্রকৃতির রুদ্ররূপের সাথে লড়াই করে কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়, বাঙালি তা বহুবার দেখিয়েছে। এবার আমাদের দেখানোর পালা—কীভাবে সেই টিকে থাকার লড়াইকে সমতা ও মানুষের মর্যাদা দিয়ে জয় করা যায়।
খণ্ডিত নীতি আর জোড়াতালির সমাধানের দিন এবার শেষ হোক। আসুন, ন্যাপ ও এনডিসি ৩.০-এর বিজ্ঞানভিত্তিক রূপরেখাকে সঙ্গী করে আমরা এমন এক অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত পরিকল্পনা সাজাই, যেখানে পানি ও মানুষের মর্যাদাকে অলঙ্ঘনীয় অধিকার হিসেবে দেখা হবে। আমাদের দেশের মানুষ অনেক কষ্ট সয়েছে, অনেক অপেক্ষা করেছে; এবার না হয় তাদের নিত্যদিনের লড়াই ফুরাক, তাদের আশা পূরণ হোক।
লেখক: আইন গবেষক এবং উন্নয়নকর্মী