আমরা গাছ লাগাতে খুব ভালোবাসি। কিন্তু গাছ বাঁচাতে? ততটা নয়। প্রতি বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবস এলেই হাজার হাজার চারা রোপণের খবর আসে। সংবাদ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় বৃক্ষরোপণের ছবিতে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে লাখ লাখ গাছ লাগানোর ঘোষণা আসে। সরকারের পক্ষ থেকেও আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
এসব উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু কয়েক বছর পর সেই চারাগুলোর কতগুলো বেঁচে আছে—সেই খবর আর খুব একটা পাওয়া যায় না। তাই আমার মনে হয়, আমরা হয়তো ভুল প্রশ্ন করছি। এ বছর কতগুলো গাছ লাগানো হলো—প্রশ্নটা এমন না হয়ে হওয়া উচিত, গত ১০ বছরে কতগুলো গাছ আমরা বাঁচাতে পেরেছি। এই উপলব্ধিটা আরও গভীরভাবে এসেছে সম্প্রতি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার পিটাছড়া ফরেস্টে গিয়ে।
মাহফুজ আহমেদ রাসেল ভাই আমার মতে একজন উন্মাদ। যুক্তরাজ্যে উচ্চ বেতনের করপোরেট জীবন আর নিশ্চিত ক্যারিয়ার ফেলে এক দশক আগে খাগড়াছড়ির পাহাড়ে স্থায়ী হন। গড়ে তুলেন পিটাছড়া ফরেস্ট। বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে মন দেন। প্রকৃতি সংরক্ষণে এই এক দশকের অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন সম্প্রতি। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার ২০২৫’-এ বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন শাখায় (শ্রেণি-ছ) প্রথম স্থান অর্জন করেছেন তিনি।
সেদিন হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ রাসেল ভাই বললেন, ‘‘গাছ লাগানোর চেয়ে গাছ বাঁচানো বেশি জরুরি।’’
প্রথমে কথাটা আমাকে অবাক করেছিল। কারণ আমরা তো এতদিন ঠিক উল্টো কথাই শুনে এসেছি। পরে তাঁর ব্যাখ্যা শুনে বুঝলাম, প্রকৃতি আসলে মানুষের চেয়ে অনেক ভালো বন তৈরি করতে জানে। তাঁর পিটাছড়া বনেও এমনটাই ঘটেছে।
হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই গড়ে উঠেছে বন। পাখি ফল খেয়ে দূরে দূরে বীজ ছড়িয়ে দেয়। বাতাস বীজ বহন করে। প্রাণীরা নতুন এলাকায় বীজ পৌঁছে দেয়। মাটিতে পড়ে থাকা বীজ থেকে জন্ম নেয় নতুন চারা। অর্থাৎ প্রকৃতির নিজস্ব পুনর্জন্মের একটি অসাধারণ সক্ষমতা রয়েছে।
আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ তাই সবসময় নতুন গাছ লাগানো নয়, বরং প্রকৃতিকে সেই সুযোগ করে দেওয়া। কথাটা শুনতে যতটা সহজ, এর মধ্যে ততটাই গভীর পরিবেশগত সত্য লুকিয়ে আছে।
আমরা অনেক সময় বৃক্ষরোপণকে সংখ্যার খেলায় পরিণত করি। কোথাও ১০ হাজার, কোথাও ৫০ হাজার, কোথাও লাখো গাছ লাগানোর ঘোষণা আসে। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই আমরা জানতে চাই, পাঁচ বছর পরে এর কতগুলো গাছ আদতে বেঁচে আছে। এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল। আমরা কার্যক্রমের সংখ্যা গুনি, ফলাফলের নয়।
অনেক ক্ষেত্রে গাছ লাগানো হয়, কিন্তু পরিচর্যা হয় না। কোথাও আবার স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কিছু বিদেশি প্রজাতির গাছ লাগানো হয়। সব বিদেশি গাছ যে ক্ষতিকর, তা নয়—তবে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রজাতি ব্যাপকভাবে রোপণ করলে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য।
বাংলাদেশে একসময় দ্রুত সবুজায়নের নামে আকাশমণি, ইউক্যালিপটাসসহ কয়েকটি দ্রুতবর্ধনশীল প্রজাতি, তেমন গবেষণা না করেই, ব্যাপকভাবে রোপণ করা হয়েছিল। এগুলো দ্রুত বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু স্থানীয় পাখি, কীটপতঙ্গ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য দেশীয় গাছের মতো কার্যকর আবাসস্থল বা খাদ্যের উৎস হয়ে উঠতে পারেনি।
কারণ একটি বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়। এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। সেখানে গাছ, লতা, ঝোপ, পাখি, প্রাণী, কীটপতঙ্গ, ছত্রাক এবং অণুজীব—সবাই একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই শুধু গাছের সংখ্যা বাড়ানো মানেই পরিবেশ রক্ষা নয়।
একটি শতবর্ষী দেশীয় গাছের পরিবেশগত মূল্য অনেক সময় শত শত নতুন চারার চেয়েও বেশি। একটি পুরোনো বট, অশ্বত্থ, কড়ই কিংবা গর্জন গাছ শুধু ছায়া দেয় না—এটি কার্বন শোষণ করে, মাটি ধরে রাখে, অসংখ্য পাখি ও প্রাণীর আশ্রয়স্থল হয় এবং একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে।
এমন একটি গাছ কেটে ফেলতে কয়েক ঘণ্টা লাগে। কিন্তু সেই গাছের সমপর্যায়ের একটি বাস্তুতন্ত্র তৈরি হতে কয়েক দশক, কখনও এক শতাব্দীও লেগে যেতে পারে। অথচ উন্নয়ন প্রকল্প, রাস্তা সম্প্রসারণ, আবাসন নির্মাণ কিংবা অবহেলার কারণে এমন অসংখ্য পুরোনো গাছ প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের পরিবেশ আন্দোলনের বড় দুর্বলতা এখানেই।
আমরা নতুন গাছ লাগানোর ছবি তুলতে ভালোবাসি—কিন্তু শতবর্ষী একটি গাছ কাটা ঠেকানোর জন্য একই রকম সামাজিক চাপ তৈরি করতে পারি না।
কোভিডের সময় প্রকৃতি আমাদের এসব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছিল। মানুষের হস্তক্ষেপ কমে গেলে নদী, বাতাস এবং বন্যপ্রাণীর ওপর তার ইতিবাচক প্রভাব খুব দ্রুত দৃশ্যমান হতে পারে। প্রকৃতি সুযোগ পেলে নিজেকে পুনরুদ্ধার করার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে।
খাগড়াছড়ি, বান্দরবান কিংবা সিলেটের অনেক এলাকায় এখনও দেখা যায়, যেখানে মানুষের হস্তক্ষেপ তুলনামূলক কম, সেখানে বন নিজে নিজেই ঘন হয়ে ওঠে। পাখি ও প্রাণীরা বীজ ছড়ায়, নতুন চারা জন্মায়, বন ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। প্রকৃতি তার কাজটি করতে জানে। আমাদের দায়িত্ব তাই এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করা।
এর অর্থ এই নয় যে বৃক্ষরোপণ অপ্রয়োজনীয় কাজ। গাছ অবশ্যই লাগাতে হবে—বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, নদীর তীরে, ক্ষয়প্রাপ্ত এলাকায় এবং যেখানে বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে বা হয়ে যাচ্ছে। তবে কয়েকটি বিষয় আমাদের মাথায় রাখা প্রয়োজন।
প্রথমত, দেশীয় প্রজাতির গাছকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বনজ, ফলদ, ঔষধি, অর্কিড, বাঁশজাতীয়, অর্থকরী এবং বিপন্ন প্রজাতির গাছ লাগানোর মাধ্যমে আমরা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারি।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পরিবেশ ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গাছের প্রজাতি নির্বাচন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবেশবিদ, বনবিদ, কৃষিবিদ এবং স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, গাছ লাগানোর চেয়ে গাছ বাঁচিয়ে রাখার পরিকল্পনা আরও শক্তিশালী হতে হবে। সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশীদারিত্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
চতুর্থত, শুধু কতগুলো চারা রোপণ করা হলো, তার হিসাব নয়; বরং গাছ লাগানোর পাঁচ বা দশ বছর পরে কতগুলো জীবিত আছে, সেই হিসাবও জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। আমার বিশ্বাস, আমাদের তরুণরা চাইলে এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে পারবেন, যার মাধ্যমে গাছের বেঁচে থাকার হারও সহজেই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। এই বাস্তবতায় বন ও গাছপালা আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তারা কার্বন শোষণ করে, মাটি রক্ষা করে, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে, বৃষ্টির পানি ধরে রাখে এবং স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাই হয়তো এখন সময় এসেছে আমাদের স্লোগানটিও একটু বদলানোর।
‘গাছ লাগান’ নয়, ‘গাছ বাঁচান—পরিবেশ বাঁচান।’
কারণ প্রকৃতি নিজের মতো করে বন তৈরি করতে জানে। আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নতুন বন তৈরি করা নয়, বরং যে বন এখনও বেঁচে আছে, যে পুরোনো গাছগুলো এখনও দাঁড়িয়ে আছে, আর যে জীববৈচিত্র্য এখনও টিকে আছে—সেগুলোকে রক্ষা করা।
হয়তো পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আর এটি নয় যে এ বছর আমরা কতগুলো গাছ লাগালাম। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত আমরা কতগুলো গাছ বাঁচাতে পারলাম? যেদিন এই প্রশ্নটি আমাদের নীতিনির্ধারক, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সেদিনই পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন সত্যিকার অর্থে নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছোবে।
লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত




