বাংলাদেশের সংসদ ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান কী বার্তা দিলো

রাজধানীর গুলশান এলাকায় এখন অনেক রিকশা চোখে পড়ে, যেগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা আঁকা। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন লাল, সাদা ও নীল রঙের ৫০টি বিশেষ রিকশা উদ্বোধন করেছেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা উদযাপনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অংশীদারির প্রতিফলন তুলে ধরা হয়েছে।

সেই ধারাবাকিতায় এবার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেও মার্কিন পতাকা উড়লো। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জাতীয় সংসদ ভবনে আরেকটি দেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে সেই দেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে কবে কোথায় ঘটেছে, সেটি অনুসন্ধানের বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশে হয়েছে।

শনিবার বিকালে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস দিবসটি ঘিরে অনুষ্ঠান আয়োজন করে। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মিউজিক্যাল পারফরম্যান্সের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করা হয়। এই অনুষ্ঠানের যেসব ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, অনুষ্ঠানস্থলে আমেরিকার জাতীয় পতাকা উড়ছে।  

অনুষ্ঠানে সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘আমাদের সংসদ ভবনের নকশা করেছেন বিখ্যাত মার্কিন স্থপতি লুই কান। ঠিক তেমনি আমেরিকার স্থাপত্য নির্মাণে অনন্য অবদান রেখেছেন বিশিষ্ট বাংলাদেশি-আমেরিকান স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ফজলুর রহমান খান। এই পারস্পরিক অবদান প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ ও আমেরিকা আক্ষরিক অর্থেই একে অপরের ইতিহাস বিনির্মাণে সহায়তা করেছে।’

অনুষ্ঠানে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানও বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, পারস্পরিক স্বার্থ এবং অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আগামীতে আরও সুদৃঢ় হবে, যেখানে দুই দেশের টেকসই উন্নয়ন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরবচ্ছিন্ন অবদান ও যৌথ অঙ্গীকার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।’

প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের ভূমিকা স্পষ্টতই ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। যদিও জর্জ হ্যারিসনের মতো খ্যাতিমান শিল্পী বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কনসার্ট ফর বাংলাদেশের আয়োজন করেছেন। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তথা পাকিস্তানের পক্ষে। সুতরাং সেই দেশের স্বাধীনতা দিবসে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন চত্বরে তাদের পতাকা উড়বে- এটি কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। উপরন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে যে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে, বিশেষ করে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের হস্তক্ষেপের যেসব গুঞ্জন রয়েছে, সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সংসদ ভবন চত্বরে আমেরিকার জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনাকে নিছক একটি আনুষ্ঠানিকতা বা শুধুই দুই দেশের সম্পর্কের বিষয় বলে ভাবার সুযোগ নেই। বরং এর পেছনে কোনো দূরভিসন্ধি কিংবা দূরবর্তী কোনো পরিকল্পনা আছে কি না- সেই সন্দেহ পোষণের যথেষ্ট কারণ আছে।

ভাবুন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। ভারতের স্বাধীনতা দিবসে (১৫ আগস্ট) বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ এলাকায় ভারতের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে সেই দেশের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান হলো। এর প্রতিক্রিয়া কী হতো? অথবা ১৯৭১ সালে যে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে (১৪ আগস্ট) যদি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ এলাকায় পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে সেই দেশের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান হতো, তার প্রতিক্রিয়াই বা কী হতো? দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ কি এর প্রতিবাদ করতো না? যদি পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে সেই দেশের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান হলে তার সমালোচনা হতো, তাহলে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সহযোগী আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসে তাদের পতাকা কেন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে উড়বে?

বাংলাদেশে আমেরিকা বা বন্ধুপ্রতীম অন্য যেকোনো দেশের স্বাধীনতা দিবসের আয়োজন হতেই পারে। কিন্তু সেটি সংসদ ভবনের মতো জায়গায় সেই দেশের পতাকা উড়িয়ে কেন? কেন এই অনুষ্ঠানটি সংসদ ভবন চত্বরেই হতে হবে এবং সেখানে ডেপুটি স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতাকে বক্তব্য দিতে হবে? এর ব্যাখ্যা কী? এই অনুষ্ঠানটিই আমেরিকার দূতাবাসে কিংবা রাজধানী ঢাকার কোনো মিলনায়তনে এমনকি শিল্পকলা একাডেমি চত্বরেও হতে পারতো। এই অনুষ্ঠানটি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজাতেই হতে হলো কেন? সংসদের অভিভাবক হচ্ছেন স্পিকার। তিনি যখন ইরানের প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্যে অংশ নিতে ইরানে অবস্থান করছেন, সেই মুহূর্তে সংসদ ভবন চত্বরে অনুষ্ঠানটি হলো। প্রশ্ন হলো, আমেরিকান দূতাবাসের এই অনুষ্ঠানের অনুমোদন কি স্পিকার দিয়ে গেছেন নাকি এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত?

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর এই অঞ্চলের ‍দুই পরাশক্তি ভারত ও চীনের কাছে কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এর তীরবর্তী বাংলাদেশ এবং এই দেশের ২০ কোটি মানুষকেও ওই দেশ দুটির পররাষ্ট্র ও সামরিক পরিকল্পনায় বিবেচনায় রাখতে হয়। তাছাড়া এই অঞ্চলে যেহেতু আমেরিকারও বড় স্বার্থ আছে, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে নিয়ন্ত্রণ তথা মিয়ানমারে নজরদারিসহ আরও নানা কারণেই বাংলাদেশ এবং এর আশেপাশের অঞ্চল মার্কিন প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, ফলে এখানে এইসব দেশের যেকোনো তৎপরতাকেই সন্দেহের চোখে দেখা দরকার।

অতএব বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় ভারত, পাকিস্তান, চীন, আমেরিকা ও রাশিয়ার মতো দেশের জাতীয় পতাকা উড়লে তার যে প্রতিক্রিয়া হবে, নেপাল-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের পতাকা উড়লে সেই প্রতিক্রিয়া হবে না। কিন্তু তারপরও জাতীয় সংসদ ভবনে অন্য কোনো দেশের পতাকাই ওড়ানো শোভন ও যৌক্তিক নয়।

বন্ধুত্বের পরিচয় নানাভাবেই দেয়া যায়। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব দেখাতে গিয়ে অতি উৎসাহী কিছু করা কিংবা এমন কিছু করা যার মধ্য দিয়ে নিজের দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে—সেটি কাম্য নয়। সর্বোপরি, জাতীয় সংসদ ভবনে অ্যামরিকার স্বাধীনতা দিবস আয়োজনের নামে সেই দেশের জাতীয় পতাকা ওড়ানো কোনো যুক্তিতেই সমর্থনযোগ্য নয়, বরং দেশটির আমেরিকা হওয়ায় সন্দেহটা আরও বেশি।

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক