জুলাই চেতনা নিয়ে ব্যবসার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন সরকারি ও বিরোধী দলের সিনিয়র নেতারা। গত ১৯ জুলাই বিকালে রাজধানীতে গণঅধিকার পরিষদের এক আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘যারা জুলাই চেতনার ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলেছেন, তাদের প্রতি আমার নসিহত হলো—শুধু জুলাইয়ের চেতনা বিক্রি করে বেশি দিন রাজনীতি করা যাবে না।’’ তিনি বলেন, ‘‘যারা শুধু এমপি-মন্ত্রী হওয়ার জন্য, উপদেষ্টা হওয়ার জন্য জুলাইকে ব্যবহার করেছেন; যে নতুন বন্দোবস্তের, নতুন রাজনীতির, নতুন ধারা প্রণয়ন করার যে অঙ্গীকার তারা করেছেন—তারা যেন নতুন বন্দোবস্তের ধারণাটা মানুষের সামনে প্রকাশ করেন। কিন্তু পুরাতন বন্দোবস্তের আদলে নয়। তারা নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি কথা বলে পুরাতন বন্দোবস্তের মতো আওয়ামী বন্ধুদের, যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন—সেটা সঠিক নয়।’’
এদিন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আয়োজনে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘যারা জুলাই বিপ্লব নিয়ে তাচ্ছিল্য করে, তারা আসলে ছোট লোক’’। তিনি কাকে ‘ছোট লোক’ বললেন সেটা অবশ্য পরিষ্কার নয়।
একই দিন জাতীয় প্রেসক্লাবে আরেক আলোচনায় বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা বরকতউল্লাহ বুলু বলেন, ‘‘জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।’’ জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বরকতউল্লাহ বুলু বলেন, ‘‘আমাদের সবার একটি যৌথ দায়বদ্ধতা রয়েছে, যাতে আমরা কোনোভাবেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হই।’’
পরদিন সোমবার ‘জুলাইয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অবদান’ নিয়ে রাজধানীতে এক সেমিনারে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও বলেন, ‘‘জুলাইয়ের চেতনা বিক্রি করে রাজনীতি করা যাবে না। কারণ জুলাইয়ের চেতনা আওয়ামী লীগের একাত্তরের তথাকথিত চেতনার মতো নয়। আওয়ামী লীগ একাত্তরের চেতনা বিক্রি করে গুম ও খুনের মাধ্যমে দেশে আধিপত্যবাদের রাজত্ব কায়েম করেছিল।’’
তার মানে সরকারি ও বিরোধী দল উভয়ই জুলাই চেতনা নিয়ে ব্যবসার বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো, জুলাই নিয়ে ব্যবসাটা তাহলে কে বা কারা করছে? সরকারি ও বিরোধী দলের বাইরে অন্য কেউ?
প্রসঙ্গত, চেতনার ব্যবসা লাগামহীন হয়ে গিয়েছিল আওয়ামী লীগের আমলে। ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙিয়ে পাড়ায়-মহল্লায়, অলিতে-গলিতে গড়ে উঠেছিল হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান—মানুষেরা যেগুলোর নাম দিয়েছিল ‘দোকান’। অর্থাৎ এসব চেতনার দোকান তৈরিই করা হয়েছিল ব্যক্তিগত নানা স্বার্থসিদ্ধির জন্য। তখন অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙিয়ে নানারকম ব্যবসার অভিযোগ উঠেছে। যে কারণে তখন এগুলোকে বলা হতো ‘চেতনার ব্যবসা’। একইভাবে ধর্মীয় চেতনার নামেও নানারকম ফন্দিফিকির হয়েছে। এখনও এসব দোকান চালু আছে। তার সাথে চব্বিশের আগস্টের পরে যুক্ত হয়েছে জুলাই ব্যবসা তথা চেতনার নতুন দোকান।
তবে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙিয়ে ব্যবসা করা আর জুলাই চেতনার ব্যবসার মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সেটি হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে ব্যবসা হয়েছিল মূলত নানারকম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য। এখানে ব্যক্তিগত স্বার্থই ছিল প্রধান। কিন্তু জুলাই নিয়ে ব্যবসা বা জুলাই চেতনার পেছনে নানাবিধ ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বাইরেও একটি ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। সেটি হলো, চব্বিশের জুলাই আন্দোলনকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া তথা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হিসেবে খ্যাত ও স্বীকৃত বঙ্গবন্ধুর অবদানকে ম্লান করা; তাকে বিতর্কিত করা; তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি—এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করা।
এ বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম যে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যাদের অস্বস্তি আছে। একাত্তর যাদের পরাজয়ের গ্লানি স্মরণ করিয়ে দেয়—তারা শুরু থেকেই জুলাই অভ্যুত্থানকে একাত্তরের মুখোমুখি কিংবা একাত্তরের সমপর্যায়ের নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ তারা জুলাই আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ বলে মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে চব্বিশের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছে। যে কারণে তারা ‘দ্বিতীয় বাংলাদেশ’ শব্দটিও ব্যবহার করে। সচেতনভাবেই তারা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দগুলো জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গেও যুক্ত করে দেয়, যেমন গণহত্যা, শহীদ, বীরযোদ্ধা ইত্যাদি। অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদকে অনেকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে মিল রেখে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ বলেও অভিহিত করেছেন।
বস্তুত চব্বিশকে একাত্তরের সাথে তুলনা করার প্রবণতাটি শুরু হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই। ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের যেমন ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সেরকম ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের ‘জুলাইযোদ্ধা’ নামে গেজেটভুক্ত করা হয়েছে। একটি রাজনৈতিক আন্দোলন বা সরকার পতনের আন্দোলনের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের ‘যোদ্ধা’ নাম দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে গেজেটভুক্ত করে স্বীকৃতি দেয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে তাদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য রাষ্ট্র যে কিছু বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল, যেমন মাসিক ভাতা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও সরকারি চাকরিতে তাদের সন্তানদের অগ্রাধিকার—সেভাবেই জুলাইযোদ্ধাদেরও মাসিক ভাতার আওতায় আনা হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধারাও মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পান। তাদের সঙ্গে মিল রেখে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারগুলোকেও একই অঙ্কের ভাতা দেওয়া হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাইযোদ্ধাদের করমুক্ত আয়ের সীমাও অভিন্ন করা হয়েছে। অর্থাৎ নানাভাবেই জুলাইযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কাতারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানে হতাহতদের জন্য সরকার চাইলে অন্য কোনও উপায় বের করতে পারতো।
মুক্তিযুদ্ধের নামে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বানিয়েছে, তাও গণভবনের মতো একটি স্থাপনায়, যেটি একসময় প্রধানমন্ত্রীদের বাসভবন ছিল। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অন্যত্রও হতে পারতো। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের নানা উদ্যোগেই এটা মনে হয়েছে যে তারা সচেতনভাবেই চব্বিশকে একাত্তরের সমপর্যায়ে নিয়ে যেতে চেয়েছে।
এটা বলা অমূলক হবে না যে একাত্তর নিয়ে যাদের অ্যালার্জি আছে; একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যাদের অস্বস্তি আছে; মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দলের ব্যাপারে যাদের ভীতি আছে—তারাই জুলাই অভ্যুত্থানকে একাত্তরের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে এবং করছে। সেইসাথে জুলাই নিয়ে নানাবিধ ব্যবসার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে আসছে। তবে তবে আশার সংবাদ হলো, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেই জুলাই নিয়ে ব্যবসার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হচ্ছে।
মনে রাখতে হবে, ৭১, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ব্যবসা তথা চেতনার রাজনীতি করেও আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি। গণঅভ্যুত্থানে তাদের পতন হয়েছে। এই অভ্যুত্থানের পেছনে বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্র ছিল বলে যে তত্ত্বই দাঁড় করানো হোক না কেন, আওয়ামী লীগ যে শেষ বছরগুলোয় গণবিরোধী হয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং তার পতনের পেছনে এটিই যে প্রধান কারণ—সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সুতরাং, চব্বিশের ৫ আগস্টের পরে যারা জুলাই চেতনার দোকান খুলে নানারকম ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করছেন, এগুলোও ক্ষণস্থায়ী। বরং চব্বিশকে একাত্তরের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার মধ্য দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের পেছনে বিদেশি শক্তির হাত ছিল বলে যে বয়ান রয়েছে, সেটিই প্রতিষ্ঠিত হবে। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে আওয়ামী লীগ ও তথা শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটি শক্তির উত্থানের জন্যই জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছে। মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হলে তার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে জুলাই ম্লান হয়ে যাবে এবং এই অভ্যুত্থানের সাথে যুক্ত মানুষেরা বিতর্কিত হবেন।
সুতরাং, যেকোনও চেতনার নামে ব্যবসা শুরুর আগে তার পরিণতি নিয়ে ভাবা জরুরি। জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, এটি যেমন অস্বীকারের সুযোগ নেই, তেমনি কেউ যদি ইতিহাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মনে করেন যে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে; দ্বিতীয়বার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এবং তারা যদি চব্বিশের এই আন্দোলনকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বা নানারকম বয়ান দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ এবং শেখ মুজিব স্বাধীনতা চাননি—এসব উদ্ভট তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাতে আখেরে তারা নিজেরাই হাস্যরসের পাত্রে পরিণত হবেন। কারণ দেশে-বিদেশে হাজার হাজার বইপত্র ও গবেষণায় লেখা রয়েছে যে ১৯৭১ সালে এই দেশে কী হয়েছিল; কার ডাকে এই দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল; এই যুদ্ধে কার কী অবদান। সুতরাং, হঠাৎ করে নতুন কোনও বয়ান দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জনকে ম্লান করে দেওয়া তো যাবেই না, বরং জুলাই অভ্যুত্থান যে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, সেই সুযোগটিই বরং হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক