‘এমপি ও রাজনীতিকরা’ ভালো হবেন কবে? 

বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে কী চায়? খুব বেশি কিছু নয়। তারা চায়, তাদের প্রতিনিধি সৎ হোক, শালীন হোক, আইন মেনে চলুক এবং অন্তত সেই মানুষটির চরিত্র নিয়ে যেন প্রতিদিন নতুন কোনও বিব্রতকর সংবাদ শিরোনাম তৈরি না হয়। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই? 

প্রায় প্রতিটি দশকেই আমরা দেখেছি— কোনও এমপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, কোনও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ, কোনও নেতার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি, কারও বিরুদ্ধে দখলবাজি, কারও বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ। দল পাল্টেছে, পতাকা পাল্টেছে, স্লোগান পাল্টেছে— কিন্তু অভিযোগের ধরন খুব একটা পাল্টায়নি।

সর্বশেষ সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেটিও জাতিকে আবারও সেই পুরোনো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়া, পাল্টা ব্যাখ্যা, মামলা, তদন্ত এবং শেষ পর্যন্ত দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট অভিযোগের সত্যতা ও আইনি দিক আদালত এবং তদন্ত সংস্থাই নির্ধারণ করবে। কিন্তু ঘটনাটি আমাদের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন তুলে ধরেছে—কেন বারবার জনপ্রতিনিধিদের নাম এমন বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে?

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই সংকট কোনও একক দলের নয়। যে দল নিজেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ধারক বলে, তাদের মধ্যেও বিতর্কিত ঘটনা দেখা যায়। যে দল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে, তাদের মধ্যেও দেখা যায়। যে দল জাতীয়তাবাদের কথা বলে, তাদের মধ্যেও দেখা যায়। অর্থাৎ সমস্যাটি ব্যক্তি বা দলের নয়, সমস্যাটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির।

আমরা এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাস করছি, যেখানে অনেক সময় একজন প্রার্থীর সততা, নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্বের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার জনপ্রিয়তা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, গোষ্ঠীগত প্রভাব কিংবা নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা।

সংসদে এমন মানুষ প্রবেশ করেন, যাদের কেউ কেউ হয়তো নির্বাচনে জিততে পারেন, কিন্তু জাতির সামনে আদর্শ হিসেবে দাঁড়ানোর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

একবার ভেবে দেখুন। একজন স্কুলশিক্ষকের বিরুদ্ধে অনৈতিক আচরণের অভিযোগ উঠলে আমরা উদ্বিগ্ন হই। একজন বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আমরা ক্ষুব্ধ হই। একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আমরা জবাবদিহি দাবি করি। তাহলে একজন আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আমরা কেন দলীয় চশমা পরে ফেলি?

যিনি আইন তৈরি করেন, তার নৈতিক মানদণ্ড কি সাধারণ নাগরিকের চেয়ে উঁচু হওয়ার কথা নয়? আমাদের রাজনীতিতে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠলেই সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে শুরু হয় অন্ধ সমর্থন অথবা অন্ধ বিদ্বেষ। একদল বলে, ‘সব মিথ্যা’, আরেকদল বলে, ‘সব সত্য’।

কিন্তু গণতন্ত্রের ভাষা তো এটি নয়।

গণতন্ত্রের ভাষা হলো—তদন্ত হোক, সত্য বেরিয়ে আসুক, অপরাধী হলে শাস্তি হোক, নির্দোষ হলে সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া হোক। দুঃখজনকভাবে আমরা ব্যক্তিপূজাকে প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় করে ফেলেছি।

রাজনীতিতে নৈতিকতার সংকট নতুন নয়। কিন্তু আজকের যুগে একটি অতিরিক্ত সমস্যা যুক্ত হয়েছে—ডিজিটাল যুগ। এখন একটি ভিডিও, একটি অডিও, একটি স্ক্রিনশট কিংবা একটি অভিযোগ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে একজন জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত আচরণও আর পুরোপুরি ব্যক্তিগত থাকে না। কারণ তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি।

সংসদ সদস্যদের শপথের ভাষায় জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা আছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি সেই দায়বদ্ধতার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি?

প্রশ্নটি শুধু গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি শুধু জামায়াতকে নিয়েও নয়। প্রশ্নটি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, ইসলামি দল কিংবা নতুন রাজনৈতিক শক্তি— সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

রাজনীতিতে প্রবেশের আগে কি চরিত্র যাচাই হয়? দলগুলো কি প্রার্থীর নৈতিক যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেয়? জনগণ কি ভোট দেওয়ার সময় সততার বিষয়টি বিবেচনা করে? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও আমরা একই ধরনের সংবাদ পড়বো, একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করবো এবং একই প্রশ্ন বারবার করবো। বাংলাদেশের সমস্যা ভালো আইন নয়, সমস্যার বড় অংশ ভালো আইনপ্রণেতার অভাব।

আমাদের দরকার এমন সংসদ সদস্য, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে মানুষ বিস্মিত হবে; এমন নয় যে মানুষ বলবে—‘আরেকজন’!

যেদিন রাজনৈতিক দলগুলো জয়ী প্রার্থীর চেয়ে সৎ প্রার্থী খুঁজবে, যেদিন ভোটাররা দলীয় পরিচয়ের চেয়ে চরিত্রকে গুরুত্ব দেবে, যেদিন ক্ষমতা নয় সেবাকে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখা হবে—সেদিন হয়তো এই প্রশ্নটির উত্তর পাওয়া যাবে। তার আগে পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যাবে— এমপি ও রাজনীতিকরা ভালো হবেন কবে?

লেখক:  সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, আজীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি