ভারতের ‘ককরোচ প্রজন্ম’ মোদিকে কতটা চাপে ফেলতে পারবে?

ভারতের প্রধান বিচারপতি সুরিয়া কান্ত হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে, তাঁর আদালতে দায়ের করা এক রিট পিটিশন নিয়ে আইনজীবীদের বকাবকি করার সময় তাঁর ব্যবহার করা একটি শব্দ দেশের তরুণদের এত ক্ষিপ্ত করে তুলবে।

মে মাসের ১৫ তারিখে বিচারপতি কান্ত এক শ্রেণির তরুণদের ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেন।

‘এখানে তেলাপোকার মতো কিছু তরুণ আছে। তারা কোনো চাকরি পায় না, এবং তাদের কোনো পেশা নেই। তাদের কেউ মিডিয়ায় ঢুকে, কেউ যায় সামাজিকমাধ্যমে, কেউ বিভিন্ন বিষয়ে অ্যাকটিভিস্ট হয়ে যায় এবং তারা সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে,’ প্রধান বিচারপতি বলেন।

পরের দিন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ দীপকে প্রধান বিচারপতির অসম্মানজনক শব্দকে ব্যবহার করে দিল্লিতে ক্ষমতাসীন বিজেপির নাম ব্যঙ্গ করে সামাজিকমাধ্যমে একটি গ্রুপ তৈরি করেন—ককরোচ জনতা পার্টি, বা সিজেপি।

সিজেপির যাত্রা একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে শুরু হলেও, তাদের কথা ভারতের কোটি কোটি তরুণ-তরুণীর হতাশা, বেদনা ও ক্ষোভ প্রকাশের একটি রাস্তা সৃষ্টি করে দেয়, প্রতিবাদের পথ দেখিয়ে দেয়। ইনস্টাগ্রামে সিজেপির উপস্থিতি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। দুই মাসের মধ্যে তাদের ফলোয়ারের সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে যায়।

ভারতের তরুণদের মনে কতটুকু ক্ষোভ পুঞ্জিভূত ছিল, তা বোঝা গেল যখন সিজেপি সামাজিকমাধ্যমের কৃত্রিম জগত থেকে বের হয়ে রাজপথে নেমে এলো। দীপকের ডাকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী দিল্লিতে সংসদ ভবন অভিমুখে বিক্ষোভে যোগ দেয়, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

বিচারপতির ‘তেলাপোকা’ মুহূর্ত

বিক্ষোভকারীদের তাৎক্ষণিক দাবি ছিল, জাতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। কিন্তু তেলাপোকার লোগো নিয়ে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী দিল্লির রাজপথে নেমে শুধু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করছে না, তারা ভারতের ঘুণে ধরা, দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থার দিকেও আঙুল তুলছে।

প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের কারণে সিজেপি তৈরি হলেও, তরুণদের ক্ষোভের আগুন সৃষ্টি হয়েছে অন্য এক স্ফুলিঙ্গ থেকে।

মে মাসের ৩ তারিখে ভারতজুড়ে নীট নামে পরিচিত (ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে তা নেওয়া হয়। তরুণদের অভিযোগ, জাতীয়ভিত্তিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে।

ক্ষোভের মাত্রা এবং তার মধ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্য রাজনৈতিক যে ঝুঁকি অন্তর্নিহিত আছে, তা আঁচ করতে পেরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মে মাসের প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য দায়ীদের বিচারের লক্ষ্যে দ্রুত বিচার আদালত গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু শুধু এই পদক্ষেপে ক্ষোভের আগুন নিভবে বলে মনে হচ্ছে না।

এই তরুণদের চিন্তা-ভাবনা এখন পরিষ্কার। তারা মনে করেন না যে, সমস্যা শুধু মে মাসের নীট পরীক্ষা নিয়ে। তারা বলছে, গত ১০ বছরে, অর্থাৎ মোদীর শাসনামলে, ১৫২ বার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে, যা তার আগের ১০ বছরের দ্বিগুণ। সমস্যাটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। সমস্যাটা শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে কারণে দুর্নীতির জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না, কাউকে পরিণাম ভোগ করতে হয় না। ককরোচ প্রজন্ম এই পুরো ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার ডাক দিচ্ছে।

ইনস্টাগ্রাম থেকে রাজপথে

তরুণদের এই ক্ষোভ দেখে কারও বুঝতে বাকি নেই যে, ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার কথা ছিল, তা অনেক ক্ষেত্রে অর্জিত হয়নি। বিশেষ করে বিগত ১২ বছরে একটি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, ভারত ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী এক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। সমাজে যেমন জাতিভিত্তিক ও ধর্মভিত্তিক বিভাজন বাড়ছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আরও বিভেদ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তেমনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে আসছে, ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ছে এবং তরুণ সমাজের অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর হওয়ার পথ সরু হয়ে আসছে।

ককরোচ পার্টি হতাশ ও ক্ষিপ্ত এই প্রজন্মকে তাদের হারানো কণ্ঠ ফিরিয়ে দিয়েছে। দিল্লির রাজপথে যে তরুণদের স্লোগান শোনা যাচ্ছে, তারা এতদিন প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে থাকায় কণ্ঠহীন ছিল।

তরুণদের এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি দেখাতে এগিয়ে এসেছেন বিরোধীদল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী, বিভিন্ন বামপন্থি সংগঠন এবং দলিতদের ‘ভীম আর্মি’। লাদাখের পরিচিত অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক ২৬ দিন অনশন ধর্মঘটের পর বৃহস্পতিবার রাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর উপস্থিতিতে হাসপাতালে অনশন ভঙ্গ করেন।

ককরোচ পার্টির যাত্রার শুরুতে প্রশ্ন ছিল, তারা ইনস্টাগ্রামে বিখ্যাত হলেও, বাস্তব জগতে তরুণরা তাদের ডাকে সাড়া দেবে কি না। সেই প্রশ্নের উত্তর ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে, যদিও যেসব তরুণ-তরুণী রাজপথে নেমেছে, তারা যে সবাই সিজেপির নেতৃত্বে এসেছে, তা নয়। তবে সিজেপি একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যেখানে বিভিন্ন মতের মানুষ ঘুণে ধরা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের অভিন্ন ক্ষোভ প্রকাশের জন্য মিলিত হতে পারে।

কতদূর যাবে ককরোচ প্রজন্ম

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ‘তেলাপোকা আন্দোলন’ কতদূর যেতে পারবে? তারা কি মোদীর মসনদ নড়বড়ে করে দিতে পারবে? শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের যে কথা তারা বলছে, সেটা কি তারা আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জন করতে পারবে? নাকি সিজেপির আন্দোলন যতদূর যাওয়া সম্ভব, ততদূর ইতোমধ্যেই গেছে?

আন্দোলন আর তীব্র হবে কি না, তা নির্ভর করবে মোদী সরকার তাদের কঠোরভাবে দমন করার উদ্যোগ নেবে কি না, তার ওপর। মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ করলে এই বিক্ষোভ দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু সরকার নমনীয় হলে আন্দোলন ভিন্ন পথে যেতে পারে। সোনম ওয়াংচুক ‘সহিংসতার’ আশঙ্কা প্রকাশ করে তাঁর অনশন ভেঙেছেন। সিজেপির নেতৃবৃন্দের ওপর চাপ আসবে আন্দোলন সীমিত করতে, যাতে কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠী এই সুযোগে নাশকতামূলক কাজ শুরু না করে।

আন্দোলন করে কতটুকু অর্জন করা সম্ভব, সেই প্রশ্নও সিজেপির সামনে আসবে।

ভারতের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত নয়। পুলিশের নিয়ন্ত্রণসহ অনেক প্রশাসনিক ক্ষমতা রাজ্যগুলোর হাতে দেওয়া আছে। আন্দোলন করে হয়তো কেন্দ্রীয় সরকারকে আগাম নির্বাচন ডাকতে বাধ্য করা যেতে পারে, কিন্তু ‘ক্ষমতা দখল’ বলতে যা বোঝায়, তা নির্বাচন ছাড়া সম্ভব নয়।

ভারতে গণআন্দোলন নতুন কিছু নয়। স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছিল উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। দেশের স্বাধীনতার প্রায় আট দশকে বিভিন্ন সময়ে নানা বিষয়ে আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু কোনো আন্দোলনই সরকার উৎখাতের আন্দোলনে রূপ নেয়নি। এর কারণ কারও অজানা নয়।

দিল্লিতে তরুণদের ডাক

ভারতের গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতিতে মানুষের আস্থা অটুট থাকার কারণে, এবং সামরিক বাহিনী যেহেতু দেশের রাজনীতিতে নাক না গলিয়ে তাদের পেশাদারি দায়িত্ব পালনে মনোযোগ দেয়, তাই বিষয়ভিত্তিক আন্দোলন ওই বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সরকার পরিবর্তন হয় নির্বাচনের মাধ্যমে।

সাম্প্রতিক অতীতের কিছু বড় আন্দোলন, যেমন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে কৃষকদের আন্দোলন, জাতীয়তা আইন নিয়ে দিল্লিতে অবস্থান ধর্মঘট ইত্যাদি ছিল নির্দিষ্ট বিষয়ে, যেগুলো সমাজের নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করেছিল। ককরোচ আন্দোলন সেগুলো থেকে ভিন্ন।

তরুণদের বর্তমান আন্দোলন কোনো ধর্ম, পেশা বা জাতিভিত্তিক নয়। এই আন্দোলন একটি গোটা প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। শুধু তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, নাগরিক হিসেবে তাদের আত্মমর্যাদার প্রশ্নও এই আন্দোলনের ব্যাপকতার জন্য কাজ করেছে। বিক্ষোভ বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়লেও, প্রধান বিক্ষোভ দিল্লিতে হচ্ছে, কারণ তাদের মূল লক্ষ্য কেন্দ্রীয় সরকার।

এই আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতের তরুণ সমাজ যে বার্তা দিয়েছে, শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তনের যে দাবি তারা দিল্লির রাজপথে নিয়ে এসেছে, সেই বার্তা ও দাবি দেশের রাজনৈতিক দলগুলো, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যম যদি আমলে নেয়, তাহলেই এই ‘ককরোচ প্রজন্ম’ ভারতের রাজনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারবে।

লেখক: সাংবাদিক ও পডকাস্টার।