বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যম এবং বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত মিডিয়ায় হঠাৎ করে একটি নাম দেখা যাচ্ছে, যে নাম পর্যবেক্ষক মহলে সুপরিচিত হলেও অনেক দিন সেটা কোথাও উচ্চারিত হতে দেখা যায়নি। শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাম নতুন করে শুধু আলোচনাতেই আসেনি, তাঁকে ঘিরে তাঁর দলের ভেতরে এবং বাইরে রীতিমতো বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে।
এই বিতর্কের অবতারণা করেন স্বয়ং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য ওয়াল-এ দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তাঁর অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিম দলের দায়িত্ব নিতে পারেন বলে হাসিনা মন্তব্য করেন। হাসিনা যদিও এটাকে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী একটি সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, অনেকেই ধরে নিলেন যে তিনি তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে শেখ সেলিমকে বেছে নিয়েছেন।
এই “ধরে নেওয়া” থেকে আরও অনেক চিন্তাভাবনা ডানা-পালা মেলা শুরু করে। যেমন, শেখ হাসিনা রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন বা অবসর নিচ্ছেন; অথবা তিনি বুঝে গেছেন ঢাকায় ফেরা আর সম্ভব না, সে জন্য শেখ সেলিমকে দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছেন ইত্যাদি।
আসল ঘটনা অবশ্য অন্য জায়গায়। সাক্ষাৎকারে এই প্রসঙ্গের অবতারণা করেছিলেন দ্য ওয়াল-এর এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকার। তিনি জানতে চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা ঢাকায় গেলে যদি তাঁকে কারাগারে নেওয়া হয় বা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোনও এজেন্সির হেফাজতে নেওয়া হয়, তাহলে সেই পরিস্থিতিতে দল পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে।
শেখ হাসিনা তখন আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র ব্যাখ্যা করে বলেন, সেই পরিস্থিতিতে প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে সিনিয়র, তিনি দায়িত্ব পালন করবেন। বর্তমানে প্রেসিডিয়ামের ১৬ জন সদস্যের মধ্যে তিন জন প্রয়াত, ছয় জন কারাগারে, একজনের কোনও খবর নাই, আর ছয় জন বাইরে। যারা বাইরে, তাদের মধ্যে শেখ সেলিম সবচেয়ে সিনিয়র।
শেখ সেলিমকে নিয়ে সন্দেহ
ব্যাখ্যাটা পরিষ্কার। এর আগেও, যেমন ২০০৭-০৮ সালে ১/১১ সরকারের সময় যখন শেখ হাসিনা বন্দি ছিলেন, তখন প্রেসিডিয়ামের সিনিয়র সদস্য জিল্লুর রহমান দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মানে এই ছিল না যে তাঁকে দলের সভাপতি হিসেবে হাসিনার উত্তরসূরি মনোনীত করা হয়েছিল। বিষয়টি বেশ সাদামাটা মনে হলেও শেখ সেলিমের নামই যে গুজব এবং জল্পনা-কল্পনার ডানা-পালা মেলতে সাহায্য করেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
শেখ সেলিম নয়বার জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন। শুধু এই তথ্য থেকেই গোপালগঞ্জে তাঁর জনপ্রিয়তা বা স্থানীয় প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়। শুধু তাই না। তিনি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে, অর্থাৎ শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই। তাঁর এই ঘনিষ্ঠ পারিবারিক পরিচয়ের কারণেই হয়তো অনেকেই শেখ সেলিমকে ‘সাময়িক দায়িত্বপ্রাপ্ত’ না ভেবে স্থায়ী উত্তরাধিকারী ভাবছেন। ঝামেলাটা সেখানেই।
ইতোমধ্যে ঢাকার একটি নিউজ পোর্টাল রিপোর্ট করেছে যে কলকাতায় অবস্থানকারী কয়েকজন সিনিয়র নেতা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে হাসিনার এই সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন। এই দায়িত্ব পালনের জন্য তারা প্রেসিডিয়ামের আরেক সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের নাম উল্লেখ করেন বলেও ওই রিপোর্টে বলা হয়।
এখানে সমস্যা হলো কিছু পর্যবেক্ষক রিপোর্টের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বৈঠক আদৌ হয়েছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। যাই হোক, একটা জিনিস পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে শেখ সেলিমের প্রতি পুরোপুরি সমর্থন নেই। তাঁকে অনেকেই ‘বিপদের সময় উধাও’ ধরনের নেতা হিসেবে দেখেন। শুধু শেখ সেলিম না, এই ঘটনা আওয়ামী লীগের ভেতরে ঘনীভূত সংকটের বার্তা দিচ্ছে। নির্বাসনে দলের নেতাদের মধ্যে কোন্দল যে কত প্রকট হয়ে উঠেছে, এই বৈঠক তার একটা ইঙ্গিত মাত্র।
হাসিনার উত্তরাধিকারী কে?
শেখ হাসিনার শাসনামল থেকেই একটা প্রশ্ন বারবার উচ্চারিত হলেও তার কোনও জুতসই জবাব পাওয়া যায়নি। শেখ হাসিনার পরে কে? হাসিনা অবসর নিলে কে আওয়ামী লীগের হাল ধরবেন? উত্তরাধিকার নিয়ে হাসিনার কোনও পরিকল্পনা আছে কি? এই প্রশ্নের সরাসরি কোনও উত্তর কখনও পাওয়া যায়নি। হ্যাঁ বা না, বা কোনও নাম। কিছুই না।
এ প্রশ্নের উত্তরে হাসিনা সব সময় বলতেন, দল ঠিক করবে কে নেতা হবে। কিন্তু দল যে কোনও একসময় সেরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় নাও থাকতে পারে, সেই সম্ভাবনা কেউ আমলে নেইনি। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বদলের রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে আওয়ামী লীগ হয়তো ভেবেছিল তারা দীর্ঘকালের জন্য নিরাপদে ক্ষমতা ভোগ করতে পারবে। কিন্তু এককালের রাজপথ কাঁপানো দলটি দীর্ঘদিন সরকারি আরামে থেকে ভুলে গিয়েছিল যে ক্ষমতা বদলের জন্য নির্বাচনের চেয়ে ভয়ানক রাস্তা আছে। সেই ভয়ানক রাস্তা দিয়েই ২০২৪ সালে তাদের ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল।
আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে এই প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে—নেতৃত্বে পরিবর্তন আসছে কি? আসলে কীভাবে আসবে, কে আসবে? এই প্রশ্নের উত্তর নানাজন নানাভাবে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অনেকে ভেবেছেন, আওয়ামী লীগের ভেতরে যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর কোনও অপরাধের অভিযোগ নেই, তাদের দিয়ে নতুন করে আওয়ামী লীগ সাজানো হবে। কিন্তু বোঝা গেল, অভিযোগ এই মুহূর্তে না থাকলেও যেই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের ঘর গোছানোর কাজ কোনও নেতা শুরু করবেন, তখনই তাঁর নাম কোনও না কোনও হত্যা বা ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’-এর মামলায় ঢুকিয়ে দেওয়া হবে।
তারপরও, রিফাইন্ড বা ‘পরিশোধিত আওয়ামী লীগ’ বলে একটা বস্তুর কথা আকাশে-বাতাসে ছড়াতে থাকে। সাবের হোসেন চৌধুরী, শিরিন শারমিন চৌধুরী, এমনকি নারায়ণগঞ্জের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভির নামও এই রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত হতে দেখা যায়, যদিও তারা কেউই দল পুনর্গঠনে কোনও ভূমিকার কথা জনসমক্ষে বলেননি।
পরিবারকেন্দ্রিক দল
কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে যায় যে আওয়ামী লীগের বর্তমান দুর্দশার জন্য সাবেক সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার যতই দায় থাকুক, দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ছাড়া আর কেউ নেতা নন। অন্য কারও নেতৃত্বে দল পুনর্গঠন হলে, সেই দল আর যাই হোক, আওয়ামী লীগ থাকবে না।
অপরদিকে, গত এক-দেড় বছরে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যসহ নেতাকর্মীদের সাথে আলাপ করে বোঝা যায় যে শেখ হাসিনা যদি নিজে একটা ট্রানজিশন প্রক্রিয়া শুরু করে তাঁর উত্তরাধিকারী বাছাই করেন, তাহলে নেতাকর্মীরা সেই নতুন নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেন। তবে এখানে আরেকটা সমস্যা আছে। বাংলাদেশের দুই বৃহৎ দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি বিগত প্রায় পাঁচ দশকে অতিমাত্রায় পরিবারনির্ভর হয়ে পড়েছে।
বিএনপি কখনোই দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ছায়া থেকে বের হতে পারেনি, বের হওয়ার কোনও চেষ্টাও করেনি। তারা ভালো করেই জানে, জিয়া পরিবারের ছায়াতলে না থাকলে বিএনপির ঐক্য ভেঙে পড়তে পারে। দলকে সুসংহত রাখার জন্যই জেনারেল জিয়ার পর তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া এবং তারপর সন্তান তারেক রহমান দায়িত্ব নেন। ইতোমধ্যে, তারেক রহমানের উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর স্ত্রী জোবায়েদা এবং মেয়ে জাইমাকে তৈরি করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং হুসেইন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী। কিন্তু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ স্বাধিকার আন্দোলন এবং ১৯৭০-এর নির্বাচন পরিচালনা করে। তিনি ১৯৭১-এর মার্চ মাসের স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর নামেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা হয়।
এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের ঘটনায় প্রায় গোটা পরিবারসহ মুজিবের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে আওয়ামী লীগ শেখ পরিবারের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। মুজিব হত্যার পর দলে বড় মাপের নেতা থাকা সত্ত্বেও ১৯৮১ সালে তারা শেখ হাসিনাকে দলের হাল ধরার জন্য নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনেন।
মানুষের কাছে দায়বদ্ধতা
এখন আওয়ামী লীগের এই দুর্দিনে দলের নেতাকর্মীরা আবার যদি শেখ পরিবারের দিকেই তাকিয়ে থাকেন, তাহলে সেখানে অবাক হবার কিছু থাকবে না। যেমন, বিএনপিতে খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর ছেলে তারেক রহমানকে দলের নেতাকর্মীরা স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবেই গ্রহণ করেছেন।
সাময়িক দায়িত্ব বা উত্তরাধিকারী যাই হোক না কেন, আওয়ামী লীগকে যে হাসিনা-পরবর্তী ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সাথে, ২০২৪ সালের ব্যাপক প্রাণহানির পর তারা জনগণের আস্থা কীভাবে ফিরে পাবে, তা নিয়েও তাদের কাজ করতে হবে। বর্তমানে যে সাংগঠনিক স্থবিরতা এবং মনোবলের সংকট লক্ষ করা যাচ্ছে, তার দুইটা স্পষ্ট কারণ থাকতে পারে।
প্রথমত, নেতৃত্ব। শেখ হাসিনার ওপর আস্থা থাকলেও আওয়ামী লীগ বর্তমানে বলতে গেলে নেতৃত্বহীন অবস্থায় আছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধের কারণে হোক, অনেক নেতা কারাগারে থাকার জন্য হোক, অনেক নেতার বিদেশে পাড়ি জমানোর জন্য হোক, অনেক নেতাকর্মীর মাথার ওপরে মামলার খড়গের কারণেই হোক, সব কথার মূল হচ্ছে আওয়ামী লীগে নেতৃত্বের সংকট প্রকট।
দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ দুই বছরেও ২০২৪ সালের ঘটনাবলির সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনি। দলের ভেতরে কোনও আত্মসমালোচনা, এমনকি কোনও আত্মপর্যালোচনা হয়েছে বলে মনে হয় না। দলের নেতারা এখনও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং নিজেদের দায়ভার সম্পর্কে অস্বীকৃতি নিয়ে পড়ে রয়েছেন।
কোটা সংস্কারের দাবি যে সরকার পতনের আন্দোলনের একটি অজুহাত ছিল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সরকার পতনের আন্দোলন কেন হলো, একটা সরকার পরিবর্তনের জন্য আন্দোলনই বা কেন করতে হবে, ছাত্ররা কেন বারবার রাজপথে নামছিল, শহুরে মধ্যবিত্ত কেন এই আন্দোলনে সমর্থন দিলো, আন্দোলন দমন করতে গিয়ে এত মানুষ কেন মারা গেল—এসব প্রশ্ন আওয়ামী লীগের নিজেদেরকেই করা উচিত।
প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে তারা জনগণের সামনে কী বার্তা নিয়ে আসবে। আওয়ামী লীগ যদি নিজেদের জনমানুষের দল মনে করে, তাহলে জনগণের কাছেই এই জবাবদিহি করতে হবে। এই কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কার কাছে যাবে, তা পরিষ্কার হতে পারে।
লেখক: একজন সাংবাদিক এবং পডকাস্টার
ইমেইল: [email protected]




