দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্ব আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে আদর্শগত প্রতিযোগিতার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক জোটের আবির্ভাব হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে দুই ক্যাম্পের প্রতিযোগিতাও নেই, আর খুব বেশি অঞ্চলে সেরকম সামরিক জোটও নেই। সে কারণেই হয়তো ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কা শহরে স্বাক্ষরিত মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্সে এগ্রিমেন্ট নিয়ে অনেক দেশেই কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। মক্কা জোটের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জোট গঠনের প্রেক্ষাপট এই জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে।
মাসখানেক আগে সৌদি আরব, তুরস্ক আর পাকিস্তান নিয়ে গঠিত এই জোটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সেপ্টেম্বরের ১ তারিখে ইস্তানবুলে ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’-এর প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সচিবালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসঙ্গে একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তাকে জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে তিন বছরের জন্য নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেয়—তিন দেশের সামরিক এবং কূটনৈতিক নেতারা।
জোট গঠনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পর শুরু হচ্ছে প্রশাসনিক আর ব্যবস্থাপনার কাঠামো গঠনের প্রক্রিয়া। সহজ কাজগুলো আগে হবে। একটি সামরিক জোটকে কার্যকর করার জন্য যেসব জটিল পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সেগুলো আগামীতে নেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে শুধু জটিল পদক্ষেপ নয়, এই জোটের আদর্শ, উদ্দেশ্য, কর্মপন্থা, সম্প্রসারণ, শত্রু-মিত্র নির্ধারণ ইত্যাদি কাজও বাকি রয়ে গেছে।
বলা যায়, জোট সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি এখনও অজানা রয়ে গেছে। আর সে কারণেই জোটের বাইরে অন্যান্য দেশের মধ্যে জোট সম্পর্কে এত কৌতূহল দেখা যাচ্ছে। তবে ইস্তানবুল বৈঠকে স্বাগতিক দেশের কর্মকর্তারা এই কৌতূহল মেটানোর কিছুটা চেষ্টা করেছেন—যাতে সব না হলেও কিছু প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়।
‘সবার জন্য জোট উন্মুক্ত’
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, এই জোট সবার সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার মতো আন্তর্জাতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সৃষ্টি করা হয়েছে। অবশ্য, এ ধরনের মূল্যবোধের ঘোষণা দেওয়া যত সহজ, তা মেনে চলা যে তত সহজ না, সেটা বিশ্ব রাজনীতির দিকে দুই মিনিট তাকালেই বোঝা যাবে।
তবে ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিষয়টা যে এই জোটের জন্য বিশাল গুরুত্ব বহন করে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। জোট সদস্য তুরস্ক যেমন দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী কুর্দি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তেমনই আরেক সদস্য পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হাকান ফিদান জানান, মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের কোনও শত্রু নেই এবং তাদের দরজা অন্যান্য দেশের জন্য খোলা। “এই জোট কোনও একটি দেশের বিরুদ্ধে নয়, এবং আমাদের অঞ্চলে যারাই আমাদের মূল্যবোধ ধারণ করবে, তাদের সবার জন্য এই জোট উন্মুক্ত”- তিনি বলেন।
জোটের সম্ভাব্য সম্প্রসারণের ব্যাপারে ফিদান এখানে একবাক্যে দুটো কথা বলেছেন। প্রথম, “সবার জন্য উন্মুক্ত,” অর্থাৎ যে কেউ যোগ দিতে পারে। এই কথা থেকে বাংলাদেশে যারা জোটে যোগদানে আগ্রহী, তারা আশান্বিত হবেন। বাংলাদেশকে এখন পর্যন্ত কেউ জোটে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়নি—কিন্তু ঢাকার কর্মকর্তারা বেশ কয়েকদিন ধরেই তাদের আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন।
কিন্তু ফিদান তার বাক্যে “আমাদের অঞ্চলে” শব্দ দুটোও যোগ করেছেন। এখানে ‘অঞ্চল’ বলতে তিনি কী বোঝাচ্ছেন? জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা মূলত পশ্চিম এশিয়া-পারস্য উপসাগর-ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের দেশ। অপরদিকে বাংলাদেশ হচ্ছে দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব এশিয়া-বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের দেশ।
বাংলাদেশের আলোচনায় ভারত
জোটের ভেতরে সম্ভাব্য নতুন সদস্য নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে বলে আঞ্চলিক পত্র-পত্রিকায় রিপোর্ট হচ্ছে, সেখানে মিসর এবং সিরিয়ার নাম বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। এখানে সন্দেহ নেই যে সৌদি আরব মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী, অপরদিকে তুরস্ক সিরিয়াকে এই জোটের আওতায় নিয়ে আসতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এই নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনায় বাংলাদেশের কোনও ভূমিকা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
নতুন সদস্য নিয়ে জোটের ভেতরেও কিছু উদ্বেগ আছে বলে বিভিন্ন স্থানীয় মিডিয়াতে বলা হয়েছে। যেকোনও নতুন সদস্য বাড়তি সামরিক এবং রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে আসতে পারে ঠিকই। কিন্তু এর ফলে ভিন্ন নীতিগত অগ্রাধিকার, বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এবং ভিন্ন নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি যোগ হতে পারে—যা জোটের কার্যক্রমকে জটিল করে তুলতে পারে।
যেমন, বাংলাদেশ এই জোটে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অভিজ্ঞ সৈন্য সরবরাহ করতে পারলেও ঢাকার ভূ-রাজনৈতিক এবং কৌশলগত অগ্রাধিকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলেই থাকবে। পশ্চিম এশিয়ায় সব দেশের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখাই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত। এই অঞ্চলের কোনও সামরিক জোটে অংশ নেওয়া মানেই হবে স্থানীয় বিবাদে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা, যা বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থি হবে।
জোট নিয়ে ঢাকায় যে চিন্তাভাবনা চলছে, তাতে ভারতের বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে দুদিক থেকেই দেখা হচ্ছে। একদিক থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে এই জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে এবং ভারতকে আগ্রাসন থেকে নিরুৎসাহিত করা যাবে। অপরদিকে, জোটে যোগ দিলে ঠিক তার বিপরীত পরিণতিও হতে পারে। এই জোটে যোগ দেওয়া মানেই হবে পাকিস্তানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সামরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা—যার কারণে ভারত বাংলাদেশকে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখতে পারে।
ইরানের প্রতি ইঙ্গিত?
একটি সামরিক জোট কীভাবে কোনও ‘শত্রু’ চিহ্নিত না করেই তৈরি হয়, সেটা বোঝা বেশ কঠিন। জোট যতই ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হোক না কেন, কোনও একটি হুমকি অনুভব না করে তিনটি দেশ কেন একে অপরকে রক্ষা করার জন্য সামরিক পদক্ষেপের অঙ্গীকার করবে? করার প্রশ্ন ওঠে না, বিশেষ করে এই তিন দেশের একটির হাতে যখন শ’দেড়েক পারমাণবিক বোমা রয়েছে।
হুমকির সূত্র অবশ্যই নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু এই লুকোচুরি থেকে বোঝা যায়—সেই দেশ বা গোষ্ঠীকে প্রকাশ্যে চিহ্নিত করা হলে জোটের আবেদন এবং তার কার্যকারিতা হয়তো ব্যাহত হতে পারে।
ফিদান তার বক্তব্যে কিছু মূল্যবোধের ওপর জোর দিয়েছেন, যার একটা হচ্ছে ‘‘কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা।” এই মূল্যবোধ সম্ভবত ইরানের দিকে ইঙ্গিত করেই তুলে ধরা হয়েছে। ইরানে ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই উপসাগরীয় আরব দেশগুলো অভিযোগ করে আসছে যে তেহরান তাদের বিপ্লব আরব দেশগুলোতে রফতানি করতে চায়। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা যে ইরানের বিপ্লবীরা উৎখাত করতে চেয়েছিল, তা নিয়ে খুব একটা সন্দেহ নেই।
আরব দেশগুলোর ইন্ধন এবং আর্থিক সহায়তায় ইরাক ১৯৮০ সালে ইরান আক্রমণ করে। সাদ্দাম হুসেইন ধারণা করেছিলেন, বিপ্লবোত্তর ইরানকে খুব সহজেই পরাজিত করা যাবে। কিন্তু আট বছর যুদ্ধ চলার পর কোনও লক্ষ্য অর্জন না করেই ইরাক যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই মক্কা প্রতিরক্ষা জোট কি ইরানের দিকে তাকিয়েই তৈরি করা হয়েছে? সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের কথা বিবেচনা করলে, সেটাই স্বাভাবিক মনে হবে। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও ইসলামাবাদ কয়েক দশক ধরে সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য সৈন্য সরবরাহ করে এসেছে।
উপসাগরে নিরাপত্তা শূন্যতা
তুরস্কের অন্তর্ভুক্তি অন্য একটা বার্তা দিচ্ছে। সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তুরস্ককে লক্ষ্য করে কিছু মন্তব্য করেছেন, যা থেকে ধারণা করা যেতে পারে যে এই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ এখন সময়ের ব্যাপার-মাত্র। তুরস্ক বিগত এক-দেড় বছরে সিরিয়ায় তার সামরিক উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব জোরদার করেছে—যা ইসরায়েলিরা তাদের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখছে।
ইসরায়েলের পরিকল্পনা ছিল গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং সিরিয়ায় আসাদ সরকার ধ্বংস করার পর পুরো অঞ্চলে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। শেষ বাধা ছিল ইরান। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ব্যর্থ হওয়ায় ইসরায়েলের পরিকল্পনা প্রায় ভেস্তে গেছে। তারা এখন সিরিয়াকে নিরস্ত্র রাখার জন্য ব্যস্ত, কিন্তু সেখানে বাধা হচ্ছে তুরস্ক।
এই জোট গঠনের ঘোষণা এমন সময় এলো, যখন পারস্য উপসাগর এবং পূর্ব ভূ-মধ্যসাগর এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। ইরানের ইসলামি শাসন ব্যবস্থা উৎখাতের প্রচেষ্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান কার্যত ব্যর্থ হওয়ায় এই অঞ্চলে একটি নিরাপত্তাশূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি সৌদি আরব এবং অন্যান্য আরব রাজতান্ত্রিক দেশগুলোকে নিরাপত্তা দেয় বলে যে ধারণা ছিল, ইরান সেটা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। উপসাগর এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো কবে ফিরবে, আদৌ ফিরবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মক্কা নিরাপত্তা জোট এই নিরাপত্তাশূন্যতা পূরণ করার চেষ্টা করবে।
প্রাথমিক চিন্তা-ভাবনা হচ্ছে, এই জোটের নিশানায় আছে ইরান এবং ইয়েমেনে হুথি গোষ্ঠী। সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি আসছে মূলত এই দুই সূত্র থেকে। ইসরায়েলের আশা ছিল—ইরানকে পরাজিত করে যে নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরি হবে, সেখানে তারাই হবে মূল চালিকাশক্তি। ইরান সেই পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিয়ে আরব দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল তাদের নিরাপত্তার বিষয়টা তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় করতে।
মক্কা প্রতিরক্ষা জোট পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে নতুন একটি মেরুকরণের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের বাইরে একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা সম্ভবত মনে করছেন, এই জোটে যোগ দিলে যেমন তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ-জনশক্তি রফতানি এবং জ্বালানি আমদানি আরও জোরদার হবে, তেমনই এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে ঢাকা একটি কৌশলগত ভূমিকা রাখতে পারবে।
কিন্তু জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের স্বার্থ এবং দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। নতুন যারা যোগ দেবে, তাদের বেলায়ও একই ব্যাপার প্রযোজ্য হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস শিক্ষা দেয় যে সেখানে মিত্রতা এবং শত্রুতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মরুভূমির বালুর মতো আনুগত্য স্থান বদল করতে পারে। বাংলাদেশকে এখানে অতি সাবধানেই পা ফেলতে হবে, যাতে চোরাবালিতে না ঢুকে পড়ে।
লেখক: সাংবাদিক এবং পডকাস্টার
ইমেইল: [email protected]




