প্রথম পর্ব
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। গত পাঁচ দশকে তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয়, কৃষি উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অবদানে দেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। দারিদ্র্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত অগ্রগতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির একটি স্বীকৃত সত্য হলো—কোনও দেশ দীর্ঘ সময় ধরে সীমিত কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভর করে টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে না। অর্থনীতিকে বহুমাত্রিক করতে হয়, নতুন কর্মসংস্থানের উৎস তৈরি করতে হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করতে হয়।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে যে খাতটি সবচেয়ে বড় অথচ তুলনামূলকভাবে কম ব্যবহৃত সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেটি হলো পর্যটন অর্থনীতি। পর্যটনকে আমরা প্রায়ই ভ্রমণ, বিনোদন কিংবা অবকাশযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি খাত হিসেবে দেখি। কিন্তু আধুনিক বিশ্বের অর্থনৈতিক অভিধানে পর্যটনের অর্থ অনেক বিস্তৃত। জাতিসংঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থা এবং বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) বিশ্লেষণ বলছে, পর্যটন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস।
পর্যটনের শক্তি তার বহুমাত্রিক প্রভাবের মধ্যে নিহিত। একজন পর্যটক যখন কোনও দেশে আসেন, তখন তিনি শুধু একটি হোটেলে রাতযাপন করেন না। তিনি বিমান বা নৌপথ ব্যবহার করেন, রেস্তোরাঁয় খাবার খান, স্থানীয় পরিবহন ব্যবহার করেন, স্মারকপণ্য কেনেন, বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশ নেন এবং স্থানীয় সেবা গ্রহণ করেন। অর্থাৎ একজন পর্যটকের ব্যয় অর্থনীতির বহু স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদরা একে মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট বলে অভিহিত করেন। একটি ডলার বা একটি টাকার পর্যটন ব্যয় স্থানীয় অর্থনীতিতে বহু গুণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি করতে পারে। এই কারণেই বিশ্বের বহু দেশ পর্যটনকে কেবল একটি শিল্প নয়, বরং একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনা করে।
মালদ্বীপের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তিগুলোর একটি পর্যটন। থাইল্যান্ড প্রতিবছর কোটি কোটি পর্যটককে আকৃষ্ট করে জাতীয় আয়ের বড় অংশ অর্জন করে। দুবাই ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তেলনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি পর্যটনকে দ্বিতীয় শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত করেছে। ভিয়েতনাম গত দুই দশকে পর্যটন খাতকে পরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারণ করে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে—সঠিক পরিকল্পনা থাকলে পর্যটন অর্থনীতি একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের চালিকাশক্তি হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনাটি কোনও কল্পনা নয়; এটি বাস্তব। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিনের সামুদ্রিক পরিবেশ, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সৌন্দর্য, সিলেটের চা-বাগান, হাওরাঞ্চলের অনন্য জলভূমি, প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি, বৈচিত্র্যময় উৎসব এবং অতিথিপরায়ণ মানুষ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এমন একটি পর্যটন সম্পদের অধিকারী, যা অনেক দেশ অর্জনের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে—এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন এখনও আন্তর্জাতিক পর্যটনের আলোচনায় একটি বড় অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই পর্যটন অর্থনীতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে পর্যটন নিয়ে আলোচনা সাধারণত পর্যটন স্পট, হোটেল বা ভ্রমণ সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ পর্যটন অর্থনীতি মূলত একটি সমন্বিত উন্নয়ন দর্শন।
এখানে নিরাপত্তা, যোগাযোগ, অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ, বিনিয়োগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বিপণন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ—সব কিছু একসঙ্গে কাজ করে। অন্যভাবে বললে, পর্যটন একটি বিচ্ছিন্ন খাত নয়—এটি বহু খাতকে একত্রে সংযুক্ত করে একটি অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম তৈরি করে।
বাংলাদেশের জন্য এর সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। একটি আধুনিক পর্যটন শিল্প প্রত্যক্ষভাবে হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন, গাইডিং, বিনোদন ও আতিথেয়তা খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্থানীয় সেবা খাতেও নতুন সুযোগ তৈরি করে। ফলে পর্যটন এমন একটি শিল্প, যার সুফল সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য এটি একটি নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র। পর্যটন ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল মার্কেটিং, ট্রাভেল সার্ভিস, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমে লাখো তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পর্যটনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। শিল্পকারখানা সাধারণত নির্দিষ্ট কয়েকটি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়। কিন্তু পর্যটন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি করতে পারে। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, সুন্দরবন, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল কিংবা উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক অঞ্চলগুলো পর্যটনের মাধ্যমে নতুন অর্থনৈতিক প্রাণশক্তি অর্জন করতে পারে।
পর্যটন শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই দেয় না—এটি একটি দেশের আন্তর্জাতিক পরিচিতিও নির্মাণ করে। আজকের বিশ্বে একটি দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি নিজেই একটি অর্থনৈতিক সম্পদ। একজন বিদেশি পর্যটক যখন বাংলাদেশে এসে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যান, তখন তিনি এক অর্থে বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক দূতে পরিণত হন। তার অভিজ্ঞতা, ছবি, ভিডিও এবং বক্তব্য অন্যদেরও বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—পর্যটনের সম্ভাবনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবে রূপ নেয় না। এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ, আধুনিক অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানের বিপণন কৌশল। বিশ্বের যে দেশগুলো পর্যটনে সফল হয়েছে, তারা কেউই কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপর নির্ভর করে সফল হয়নি—বরং তারা একটি সমন্বিত নীতিগত কাঠামো গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশও সেই সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রশ্নটি এখন আর সম্ভাবনার নয়, প্রশ্নটি অগ্রাধিকারের। আমরা কি পর্যটনকে কেবল একটি বিনোদন খাত হিসেবে দেখব, নাকি এটিকে জাতীয় অর্থনীতির একটি কৌশলগত স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করবো যদি আমরা দ্বিতীয় পথটি বেছে নিতে পারি, তাহলে পর্যটন শুধু নতুন আয়ের উৎস হবে না—এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, আঞ্চলিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়াবে এবং বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক ও শক্তিশালী পরিচয় গড়ে তুলবে। তখন পর্যটন শুধু একটি শিল্প থাকবে না, এটি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
লেখক: সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি