পকেটে নগদ টাকা ছাড়াই অ্যাপের মাধ্যমে কোড স্ক্যান করে কেনাকাটা করার সুবিধা এখন আরও একধাপ এগোলো। আগে বিকাশ কিংবা নগদের জন্য আলাদা কিউআর কোড খুঁজতে হতো, তবে গত ১ জুলাই থেকে সব দোকানে একটি মাত্র সর্বজনীন কিউআর কোড রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে—যা অমান্য করলে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই কড়াকড়ি দেশের লেনদেন সংস্কৃতিতে সত্যি কোনও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে, নাকি সময়ের স্রোতে অন্য অনেক উদ্যোগের মতোই ম্লান হয়ে যায়।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে বাংলা কিউআর আসলে কতটা পরিণত একটি প্রকল্প। এটি একদিনে তৈরি হওয়া কোনও তাড়াহুড়ার সিদ্ধান্ত নয়। এর প্রাথমিক বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল ২০২০-২০২১ সালের দিকে, আর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতেই ঢাকার মতিঝিলে প্রায় বারো শতাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছিল পাইলট প্রকল্প হিসেবে। একই বছর দৈনিক লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমাও তুলে নেওয়া হয়, যাতে ক্রেতা-বিক্রেতা প্রয়োজনমতো বড় অঙ্কের লেনদেনও করতে পারেন। অর্থাৎ পাঁচ বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা একটি অবকাঠামো এখন পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মুখে দাঁড়িয়েছে। ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশের অধীনে পরিচালিত এই প্ল্যাটফর্মে একচল্লিশটি ব্যাংক, সাতটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান এবং একাধিক পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার যুক্ত হয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে একটি অভিন্ন প্রযুক্তিগত মানদণ্ডের অধীনে সংযুক্ত করা মোটেও তুচ্ছ কাজ নয়, আর এই দীর্ঘ প্রস্তুতি পর্ব আমাকে আশাবাদী করে তোলে যে এবারের বাস্তবায়ন আগের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত।
সংখ্যার দিকে তাকালে এই উদ্যোগের সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হয়। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা এখন বাইশ কোটির বেশি, আর সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই খাতে মাসিক লেনদেন দেড় লাখ কোটি টাকার ঘর ছাড়িয়ে গেছে। এই বিপুল লেনদেনের সিংহভাগ এখনও ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির টাকা পাঠানো, বেতন বিতরণ বা বিল পরিশোধের মতো সীমিত কাজে ব্যবহৃত হয়। মার্চেন্ট পেমেন্টের অংশ তুলনামূলক কম। বাংলা কিউআর এই ভারসাম্য বদলে দেওয়ার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি করেছে। যে বিপুল অঙ্কের টাকা এখন হাতবদল হচ্ছে অ্যাকাউন্ট টু অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফারে, তার একটি বড় অংশ যদি সরাসরি কেনাকাটায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে, তাহলে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকবে।
এই পদক্ষেপের পেছনে অভিপ্রায় ঠিক কী। সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে নগদ টাকার লেনদেন কমিয়ে অনলাইনভিত্তিক লেনদেন বাড়ানোই মূল লক্ষ্য। নগদ অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনও কর জালের বাইরে থেকে যায়, আর প্রতিটি লেনদেন ডিজিটাল খাতায় নথিভুক্ত হলে সেই ফাঁক ধীরে ধীরে সংকুচিত হবে। এই যুক্তি অর্থনৈতিক বিচারে সঠিক। তবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, এই লক্ষ্য অর্জনের পথে শুধু বাধ্যবাধকতা যথেষ্ট নয়। ব্যবসায়ীকে যদি মনে করানো হয় যে ডিজিটাল লেনদেন মানেই বাড়তি করের নজরদারি, তাহলে তিনি সৃজনশীল উপায়ে এই ব্যবস্থা এড়ানোর চেষ্টা করবেন। বরং প্রয়োজন প্রণোদনার ভাষায় এই পরিবর্তনকে উপস্থাপন করা, যেমন ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস থাকলে ঋণপ্রাপ্তি সহজ হওয়া বা কর রেয়াতের সুযোগ তৈরি করা।
ব্যবসায়ীদের জন্য এই পরিবর্তনটি কেবল একটি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি বাস্তব আর্থিক সাশ্রয়। একাধিক কিউআর স্ট্যান্ড বা ব্যয়বহুল পিওএস (পিওএস) মেশিনের বদলে এখন একটিমাত্র স্ট্যান্ড দিয়েই সব লেনদেন চালানো সম্ভব। এছাড়া, মাইক্রো মার্চেন্টদের (মাসিক লেনদেন ১০ লাখ টাকার মধ্যে) জন্য শুধুমাত্র জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি দিয়ে নিবন্ধনের অতি সহজ ব্যবস্থা করা হয়েছে। জটিল কাগজের ঝামেলা এড়ানোর এই বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপটি ডিজিটাল রূপান্তরকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য ও সফল করে তুলবে।
তবে বিনামূল্যে কিছু হয় না, এই নিয়ম এখানেও খাটে। বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করে মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান মার্চেন্টের কাছ থেকে সর্বনিম্ন এক শতাংশ ফি আদায় করতে পারবে। শুনতে সামান্য মনে হলেও প্রান্তিক ব্যবসায়ীর জন্য এটি প্রতিদিনের মুনাফায় একটি প্রকৃত চাপ। এখানেই আমার মূল প্রস্তাব। যে উদ্যোগের লক্ষ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে ডিজিটাল অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা, সেখানে প্রথম এক-দুই বছরের জন্য মাইক্রো মার্চেন্ট শ্রেণির ফি ভর্তুকি দিয়ে শূন্যের কাছাকাছি রাখা যেতে পারে, যেমনটা ভারতের ইউপিআই ব্যবস্থায় শুরুর দিকে করা হয়েছিল। এতে ব্যবসায়ীরা প্রাথমিক অভ্যাস গড়ে তোলার সুযোগ পাবেন, আর অভ্যস্ত হয়ে গেলে ধীরে ধীরে যৌক্তিক ফি কাঠামোয় ফেরা সহজ হবে।
নিরাপত্তার প্রশ্নটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী গত বছর ডিজিটাল লেনদেনে আশি হাজারের বেশি প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে প্রায় একশত কোটি টাকা খোয়া গেছে। কার্ডভিত্তিক লেনদেনে ক্লোনিং বা স্কিমিংয়ের যে ঝুঁকি থাকে, কিউআর ব্যবস্থায় তা তুলনামূলক কম, কারণ পিন সরাসরি গ্রাহকের নিজের অ্যাপে প্রবেশ করানো হয়। তবে ভুয়া কিউআর স্টিকার বসিয়ে প্রতারণার আশঙ্কা থেকেই যায়। পিন বা ওটিপি শেয়ার না করার সতর্কবার্তা যথাযথ, কিন্তু যথেষ্ট নয়। প্রতিটি নিবন্ধিত মার্চেন্টের কিউআর কোড একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের সঙ্গে যাচাইযোগ্য করে রাখা গেলে, যাতে গ্রাহক স্ক্যান করার আগেই দেখতে পারেন কোডটি কার নামে নিবন্ধিত, তাহলে এই ছোট প্রযুক্তিগত সংযোজন প্রতারণার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারবে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখলে বাংলা কিউআর অনেকটা ভারতের ইউপিআইয়ের পথ অনুসরণ করছে, যা সেই দেশের লেনদেন সংস্কৃতি আমূল বদলে দিয়েছে। ইউপিআই বাস্তবায়নে প্রথম কয়েক বছর কোনও মার্চেন্ট ফি রাখা হয়নি, ফলে গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বেড়েছিল। বাংলাদেশ শুরু থেকেই ফি আরোপ করে ভিন্ন পথে হাঁটছে, যা রাজস্ব সংগ্রহের বিচারে যৌক্তিক হলেও গ্রহণযোগ্যতার গতি কিছুটা শ্লথ করে দিতে পারে।
তাই প্রথম পর্যায়ে প্রচারণা ও প্রণোদনায় বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগের অস্থিরতা এবং প্রযুক্তিতে অনভ্যস্ত ব্যবসায়ীদের অভ্যাস বদলও একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। রাজশাহী ও তার আশপাশের জেলাগুলোতে আমি নিজে লক্ষ করেছি, ছোট ব্যবসায়ীরা প্রযুক্তি নিয়ে ভয় পান না, বরং প্রক্রিয়াটি বুঝিয়ে বলার মতো মানুষের অভাব বোধ করেন। স্থানীয় পর্যায়ে এজেন্ট ও শাখা কর্মীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও ব্যাপক করা গেলে এই ফাঁক পূরণ হবে, আর গ্রহণযোগ্যতার গতিও বাড়বে।
তাহলে কি বাংলা কিউআর সত্যিই দেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারবে? সামনের বছরগুলোতে যদি একটি ইন্টারঅপারেবল ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেম যুক্ত হয়, যেখানে যেকোনও মোবাইল ওয়ালেট থেকে ব্যাংক হিসাবে বা তার বিপরীতে তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর সম্ভব হবে, তাহলে বাংলা কিউআর হয়ে উঠতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার ভিত্তি। রাস্তার পাশের চায়ের দোকান থেকে বড় শপিং মল, সর্বত্র একই সরলতায় লেনদেনের সুযোগ অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বড় ধাপ হতে পারে। সব মিলিয়ে বাংলা কিউআর পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা ও সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ফসল। এখন এর সাফল্য নির্ভর করবে ফি কাঠামোর ভারসাম্য, নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং প্রান্তিক ব্যবসায়ীবান্ধব বাস্তবায়নের ওপর।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক