পাঁচ মাসেই সরকার পতনের আহ্বান: গণতন্ত্র কী বলে? 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ধানের শীষ প্রতীকে ৪৯.৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে (২০৯টি) বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের মূল্যায়নে নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার পর জনগণ একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করে যে তারা অন্তত একটি যৌক্তিক সময় পাবে নিজেদের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য। এমন বাস্তবতায় সরকার গঠনের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় রাজনৈতিক সমাবেশ থেকে সরকারকে এক সপ্তাহের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বানধর্মী বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই সৃষ্টি করে না, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সাংবিধানিক শিষ্টাচারের প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।

সিলেটে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক সমাবেশে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, ‘‘জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা নাহিদ ইসলাম ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক একত্রিত হলে এক সপ্তাহের মধ্যেই সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে উঠবে।’’ তিনি আরও দাবি করেন, ‘‘এই তিন নেতা চাইলে কয়েক মিলিয়ন মানুষকে ঢাকায় সমবেত করতে পারবেন এবং রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করে সরকারের ওপর অপ্রতিরোধ্য চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।’’ একই বক্তব্যে তিনি সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, সংস্কার প্রক্রিয়া, দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনা করেন। তবে তার বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল নির্বাচিত সরকারের অতি দ্রুত পতনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশ্য ঘোষণা।

গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা। বিরোধী দল নির্বাচনোত্তর নানা প্রশ্ন তুলতে পারে, সরকারের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করতে পারে, এমনকি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনও করতে পারে। কিন্তু যদি নির্বাচনকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা না করা হয়, কিংবা জনগণের ভোটাধিকার সুস্পষ্টভাবে অস্বীকৃত হয়েছে—এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, তাহলে নির্বাচনের ফলাফলকে রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করাই গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পরিচয়। সে কারণে নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাস পর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘোষণা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বাভাবিক ভাষা নয়। এটি রাজনৈতিক উগ্রতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

গণতন্ত্রে সরকার গঠনের মতো সরকার পরিবর্তনেরও নির্দিষ্ট সাংবিধানিক পদ্ধতি রয়েছে। সংসদীয় অনাস্থা, সাংবিধানিক সংকট অথবা নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনই ক্ষমতা পরিবর্তনের স্বীকৃত পথ। এর বাইরে বৃহৎ জনসমাবেশের মাধ্যমে দ্রুত সরকার পতনের ঘোষণা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে, তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে না। বরং এতে জনগণের মধ্যে এমন ধারণা জন্ম নিতে পারে যে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের পরিবর্তে ক্রমাগত শক্তি প্রদর্শনই রাজনৈতিক সাফল্যের প্রধান উপায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসও একই শিক্ষা দেয়। ১৯৯৬ সালের প্রথমার্ধে নির্বাচন বর্জনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ আন্দোলনের পর সাংবিধানিক সমাধানের পথ তৈরি হয়। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে তীব্র রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হলে শেষ পর্যন্ত জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ও ব্যবসা বাণিজ্য, পরিবহন, শিক্ষা, পর্যটন ও বিনিয়োগ ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য পরিশোধ করতে হয় সাধারণ জনগণকে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করে। যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে প্রবল রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা হয়, বিরোধী দল সংসদে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত সংসদীয় প্রক্রিয়া ও দলীয় নেতৃত্বের পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই নিষ্পত্তি হয়। রাস্তায় শক্তি প্রদর্শন নয়, সাংবিধানিক কাঠামোই সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করেছে।

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোট আগের তুলনায় কম আসন পেলেও সরকার সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে। বিরোধী জোট সংসদে তীব্র সমালোচনা করছে, বিভিন্ন নীতির বিরোধিতা করছে, জনমত সংগঠিত করছে। কিন্তু নির্বাচনের কয়েক মাসের মধ্যেই সরকারকে উৎখাতের রাজনৈতিক ভাষা সেখানে মূলধারার গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ নয়। বিরোধী দল পরবর্তী নির্বাচনের জন্য নিজেদের বিকল্প কর্মসূচি উপস্থাপনের দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

জার্মানির অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। দেশটিতে বহু বছর ধরে জোট সরকার পরিচালিত হচ্ছে। অনেক সময় সরকারের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, জোটের অভ্যন্তরেও মতপার্থক্য দেখা দেয়। তবু সরকার পরিবর্তন হয় সংসদীয় অনাস্থা, জোট পুনর্গঠন কিংবা নির্ধারিত নির্বাচনের মাধ্যমে। রাজনৈতিক সমাবেশ সেখানে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি সাংবিধানিক ব্যবস্থার বিকল্প নয়।

জাপানেও বহু প্রধানমন্ত্রী জনসমর্থন হারানোর কারণে পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই পরিবর্তন ঘটেছে দলীয় নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, সংসদীয় সিদ্ধান্ত কিংবা নির্বাচনের মাধ্যমে। জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া আর সরকারকে অবিলম্বে ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বান এক বিষয় নয়। পরিণত গণতন্ত্রগুলো এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান শর্ত। বহুদলীয় গণতন্ত্রে আপস, সংলাপ, সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করে। অর্থাৎ গণতন্ত্রে বিরোধিতা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু সেই বিরোধিতা যদি সাংবিধানিক সীমারেখার মধ্যে পরিচালিত হয়, তবেই প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়।

বিশ্বব্যাপী সুশাসন নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণাও একই বাস্তবতা তুলে ধরে। বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটরস রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সুশাসনের অন্যতম মৌলিক সূচক হিসেবে বিবেচনা করে।

রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়, কর্মসংস্থান সংকুচিত করে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক মূল্যায়নে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন, যেখানে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া পূর্বানুমেয় ও সাংবিধানিক।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে নির্বাচিত সরকার সমালোচনার ঊর্ধ্বে। গণতন্ত্রে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা কিংবা সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে বিরোধী দল কঠোর সমালোচনা করবে, বিকল্প প্রস্তাব দেবে, জনগণের মতামত সংগঠিত করবে। কিন্তু এসব দাবিকে শক্তিশালী করতে হলে—যুক্তি, তথ্য, গবেষণা ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করাই অধিক কার্যকর। ক্ষমতা পরিবর্তনের একমাত্র ভাষা যদি দ্রুত সরকার পতনের আহ্বান হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে রাজনৈতিক সংলাপের পরিসর সংকুচিত হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক অবিশ্বাস, কঠোর ভাষা ও সংঘাতনির্ভর রাজনৈতিক কৌশল বিদ্যমান। এর ফলে প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রতিযোগী নয়, শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। সরকারকে যেমন বিরোধী মতের প্রতি সহনশীল হতে হবে, তেমনই বিরোধী দলকেও জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের সাংবিধানিক বৈধতাকে সম্মান করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রকৃত শক্তি সরকারের পতনের হুমকিতে নয়, জনগণের আস্থা অর্জনের সক্ষমতায় নিহিত।

বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক নীতি বাস্তবায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট মাত্রার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। বিরোধী দল সরকারের ভুল তুলে ধরবে, সরকার তার জবাব দেবে, সংসদে বিতর্ক হবে, আদালত সাংবিধানিক প্রশ্নে সিদ্ধান্ত দেবে, গণমাধ্যম সমালোচনা করবে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।

মোটকথা, সরকার গঠনের মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে প্রকাশ্যে এক সপ্তাহের মধ্যে সরকার পতনের ঘোষণা রাজনৈতিক আবেগ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা পরিণত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজনৈতিক আন্দোলনেরও সময়, প্রেক্ষাপট ও সাংবিধানিক যৌক্তিকতা থাকে। যদি কোনও সরকার দীর্ঘ সময় ধরে জনগণের আস্থা হারায়, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, অথবা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে তোলে, তখন বিরোধী দলের কঠোর আন্দোলনের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হতে পারে।

কিন্তু একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারকে মাত্র পাঁচ মাস পর ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বান গণতন্ত্রের চেয়ে রাজনৈতিক সংঘাতকেই উসকে দেয়। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে নির্বাচন জনগণের রায় নির্ধারণ করবে, বিরোধী দল তথ্যভিত্তিক সমালোচনার মাধ্যমে বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তুলবে, সরকার জবাবদিহির মধ্যে থেকে কাজ করবে এবং ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটবে সংবিধান, ভোট ও জনগণের শান্তিপূর্ণ রায়ের ভিত্তিতে। এ পথই গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল, বিশ্বাসযোগ্য ও টেকসই করে তুলতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়