গুমবিরোধী আইন: তদন্তের দায়িত্ব কি পুলিশেরই হওয়া উচিত? 

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০

বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার পরিস্থিতির অন্যতম উদ্বেগজনক অধ্যায়। বহু বছর ধরে অসংখ্য পরিবার তাদের স্বজনের সন্ধানে আদালত, প্রশাসন ও মানবাধিকার সংস্থার শরণাপন্ন হয়েছে। কেউ ফিরে এসেছেন, কেউ আর কখনও ফিরে আসেননি, আবার অনেকের ভাগ্যে জুটেছে শুধু অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা আর অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা। গুম কেবল একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা হরণ নয়—এটি একটি পরিবারের ওপর দীর্ঘস্থায়ী মানসিক নির্যাতন এবং সমাজে ভয় ও অনিরাপত্তার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার এক নির্মম উপায়। এ কারণেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে গুমকে সবচেয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই বাস্তবতায় সরকার জোরপূর্বক গুমকে একটি স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এবং মন্ত্রিসভা সংশ্লিষ্ট আইনের অনুমোদন দিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার সংগঠন, ভুক্তভোগী পরিবার এবং নাগরিক সমাজ যে আইনের দাবি জানিয়ে এসেছে, সরকারের এই উদ্যোগ—সেই প্রত্যাশারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। রাষ্ট্র যখন একটি অপরাধকে স্বতন্ত্রভাবে সংজ্ঞায়িত করে এবং তার প্রতিরোধ ও বিচারের জন্য বিশেষ আইন প্রণয়ন করে, তখন সেটি সমস্যাটির গুরুত্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে। সে অর্থে এই উদ্যোগ অবশ্যই স্বাগতযোগ্য।

তবে একটি আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়। একটি আইনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সেটি কতটা কার্যকর, কতটা বিশ্বাসযোগ্য এবং সবচেয়ে বড় কথা, ভুক্তভোগীর জন্য কতটা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে তার ওপর। সেই জায়গায় আইনের দুটি বিধান বিশেষভাবে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

প্রথমত, গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অভিযোগ আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এই দুটি বিষয় আইনের কার্যকারিতা এবং জনআস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশে গুমের অভিযোগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতীতে এ ধরনের সকল অভিযোগই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু যখন অভিযোগের কেন্দ্রেই রাষ্ট্রের কোনও বাহিনী থাকে, তখন সেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোরই একটি সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত পরিচালিত হলে তদন্তের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এটি কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সততা নিয়ে প্রশ্ন নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন।

ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক নীতি হলো বিচার শুধু নিরপেক্ষ হলেই যথেষ্ট নয়, বিচার যে নিরপেক্ষ হচ্ছে, জনগণের মধ্যেও সেই আস্থা সৃষ্টি হতে হবে। একইভাবে তদন্তও শুধু নিরপেক্ষ হলেই চলবে না—তদন্ত এমন হতে হবে, যার স্বাধীনতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার, আদালত এবং সাধারণ মানুষের মনে কোনও যৌক্তিক সন্দেহ না থাকে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। আর্জেন্টিনা ও চিলি সামরিক শাসন-পরবর্তী সময়ে গুমের ঘটনা অনুসন্ধানে বিশেষ কমিশন গঠন করেছিল। মেক্সিকো গুম-সংক্রান্ত মামলার তদন্তে বিশেষ প্রসিকিউশন কাঠামো গড়ে তুলেছে। কলম্বিয়া শান্তিচুক্তির পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান ও গুমের তদন্তের জন্য স্বাধীন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা যুদ্ধকালীন গুমের তদন্ত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্তে পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

দেশভেদে কাঠামো ভিন্ন হলেও একটি বিষয় অভিন্ন-গুমের মতো গুরুতর অপরাধে তদন্তকে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত থেকে দূরে রাখা। বাংলাদেশ ২০২৪ সালে জাতিসংঘের International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance-এ যোগদান করেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্যকর, দ্রুত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার করেছে। ফলে নতুন আইনেও সেই অঙ্গীকারের প্রতিফলন থাকা স্বাভাবিক প্রত্যাশা।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আইন প্রণয়নের অভিজ্ঞতাও এখানে প্রাসঙ্গিক। ২০১৩ সালে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়া এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্দেশ্যে। আইনটি সে সময় মানবাধিকার সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। দেশে হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়মিত সামনে এলেও এই আইনের ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত। দায়ের হওয়া বেশ কয়েকটি মামলায় তদন্ত সংস্থা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে বলেও জানা যায়। এর পেছনে বিভিন্ন আইনি ও বাস্তব কারণ থাকতে পারে। তবে এই অভিজ্ঞতা অন্তত একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত যখন একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল থাকে, তখন ভুক্তভোগী পরিবার কতটা আস্থা পায়?

অতীতের এই অভিজ্ঞতা থেকেই আশঙ্কা তৈরি হয় যে গুমবিরোধী আইনেও যদি তদন্তের দায়িত্ব একইভাবে পুলিশের ওপর ন্যস্ত থাকে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একটি নতুন আইন কার্যকর করতে হলে শুধু নতুন বিধান প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়; এমন একটি তদন্ত কাঠামোও প্রয়োজন, যা স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং বিশ্বাসযোগ্য। আইনের দ্বিতীয় উদ্বেগের বিষয়টি আরও গভীর। অভিযোগ আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

নিশ্চয়ই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু গুমের মতো অপরাধের বাস্তবতা ভিন্ন। এ ধরনের ঘটনায় প্রত্যক্ষ সাক্ষী সচরাচর থাকে না, আলামত সংগ্রহ অত্যন্ত কঠিন এবং ভুক্তভোগী পরিবার শুরু থেকেই ক্ষমতার অসম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। অনেক সময় একটি অভিযোগ দায়ের করাই তাঁদের জন্য অসাধারণ সাহসের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

এই পরিস্থিতিতে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে, কারাদণ্ডের আশঙ্কা যুক্ত করা হলে—অনেক পরিবারই অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত হতে পারে। কারও কারও মনে হতে পারে, ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেরাই অভিযুক্ত হয়ে পড়বেন না তো। ফলে প্রকৃত ঘটনাও আড়ালে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। যদি তদন্ত সংস্থা পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থ হয়, অথবা তদন্তের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় কি অভিযোগকারীর ওপর বর্তাবে? বিশেষ করে যখন তদন্ত পরিচালনা করছে সেই একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি সংস্থা, যার সদস্যদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠতে পারে, তখন এই উদ্বেগকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব মিথ্যা অভিযোগ প্রতিরোধ করা। কিন্তু দেশের প্রচলিত আইনেই মিথ্যা সাক্ষ্য, মিথ্যা তথ্য প্রদান কিংবা বিচার প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই গুমবিরোধী আইনে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে প্রকৃত ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার ভয় না পেয়ে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করেছে এবং ৩২ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা দিয়েছে। গুমবিরোধী কনভেনশনে যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ, কার্যকর তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। ফলে নতুন আইনটি এমন হওয়া প্রয়োজন—যা শুধু একটি অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করবে না; বরং ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি পূর্ণ আস্থা সৃষ্টি করবে।

সরকারের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে সংসদে আইনটি পাস হওয়ার আগে অন্তত দুটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, গুমের অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন ও বিশেষায়িত তদন্ত ব্যবস্থা বা কমিশনের ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান পুনর্বিবেচনা করা, যাতে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার চাওয়ার পথেই নিরুৎসাহিত না হন।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা প্রতিশোধ নয়—তারা সত্য জানতে চায়, তাঁদের স্বজনের ভাগ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চায় এবং দায়ীদের জবাবদিহি দেখতে চায়। গুমবিরোধী আইন সেই প্রত্যাশা পূরণের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। তবে সেই সুযোগের সার্থকতা নির্ভর করবে আইনটি কতটা স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করতে পারে, ভুক্তভোগীদের আস্থা অর্জন করতে পারে এবং সত্য উদ্ঘাটনের পথকে কতটা উন্মুক্ত রাখতে পারে তার ওপর। একটি কার্যকর গুমবিরোধী আইন শুধু অপরাধের বিচার নিশ্চিত করবে না; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
চিন্তায় গাফিলতি এলে জুলাই জাদুঘর থেকেই পথ খুঁজে নেবো: ড. ইউনূস  
চিন্তায় গাফিলতি এলে জুলাই জাদুঘর থেকেই পথ খুঁজে নেবো: ড. ইউনূস  
মহারাষ্ট্রে নিষিদ্ধ ‘অ্যানালগ পনির’, অমান্য করলেই কারাদণ্ড ও জরিমানা
মহারাষ্ট্রে নিষিদ্ধ ‘অ্যানালগ পনির’, অমান্য করলেই কারাদণ্ড ও জরিমানা
শহীদের নামে হবে এলাকার সড়ক-প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি অপরাধের বিচার হবে: প্রধানমন্ত্রী 
শহীদের নামে হবে এলাকার সড়ক-প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি অপরাধের বিচার হবে: প্রধানমন্ত্রী 
জুলাইয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে ট্রাইব্যুনালে বাড়ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা
জুলাইয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে ট্রাইব্যুনালে বাড়ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা
সর্বশেষসর্বাধিক