সুবিধা নয়, স্বাধিকার: নাগরিক সত্তা ও রাষ্ট্রের দায় 

ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ
০৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০

একটি স্বাধীন ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানুষ হিসেবে আমরা কি কেবল দৈহিক আয়ু নিয়ে কোনওমতে টিকে থাকার সুযোগ পাই, নাকি নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর পূর্ণ আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা পাই? নাগরিকত্ব কি কেবল জন্মসূত্রে পাওয়া একটি কাগজের পরিচয়পত্র, নাকি এটি অধিকার অর্জন ও দায়বদ্ধতা পালনের এক গতিশীল সামাজিক চুক্তি? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আমাদের সমকালীন জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব।

রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে নজর দিতে হবে সেই দর্শনের দিকে, যা মানুষের অস্তিত্বকে করুণা বা দয়ার ঊর্ধ্বে তুলে ধরে মর্যাদার আসনে বসায়। রাষ্ট্র কোনও দানশীল সংস্থা নয়, আর নাগরিক কোনও দয়াগ্রহীতা নয়। তাদের সম্পর্কটি গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্মান ও আইনি দায়ের ওপর ভিত্তি করে—যেখানে নাগরিকত্ব কোনও স্থবির সনদ নয়, বরং অধিকারের আলোয় দায়িত্বের হাত ধরে হেঁটে চলার এক অন্তহীন মানবিক মহাকাব্য। আমরা প্রতিদিনের আলোচনায় অজান্তেই এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করি, যা আমাদের অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রভাবনাকে অজান্তেই দুর্বল করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, যখন আমরা বলি কাউকে কোনও ‘সুবিধা’ দেওয়া হচ্ছে, কিংবা কোনও জনগোষ্ঠীকে ‘সুবিধাবঞ্চিত’ বলে আখ্যায়িত করি, অথবা কাউকে সেবা পাওয়ার ‘সুযোগ’ করে দেওয়া হচ্ছে—তখন আমরা মূলত সামন্ততান্ত্রিক ও দানশীলতার এক মানসিকতাকে প্রশ্রয় দিই। ‘সুবিধা’ বা ‘সুযোগ’ কথাগুলোর ভেতরে এক ধরনের করুণা ও দয়াভাব লুকিয়ে থাকে, যেন রাষ্ট্র বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ দয়া করে নাগরিককে কিছু খয়রাত দিচ্ছে, যা তারা চাইলে যেকোনও মুহূর্তে কেড়েও নিতে পারে।

মানবাধিকার, নারী সংবেদনশীলতা ও সুশাসনের মূল দর্শন অনুযায়ী নাগরিকের জন্য যা বরাদ্দ, তা কোনও ‘সুবিধা’ নয়—তা হলো তার আইনি ও নৈতিক ‘প্রাপ্য’ বা ‘অধিকার’। একইভাবে ‘সুবিধাবঞ্চিত’ শব্দের বদলে ‘অধিকারবঞ্চিত’ বা ‘প্রান্তিক’ শব্দটি ব্যবহার করা হলে—তা রাষ্ট্রের অবহেলা ও আইনি ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করে তোলে। অধিকারকে যখন ‘সুযোগ’ হিসেবে দেখা হয়, তখন সুশাসনের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে; কিন্তু যখন তাকে সর্বজনীন ‘প্রাপ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তখন জবাবদিহি বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। ভাষার এই পরিবর্তন কেবল ব্যাকরণের বিষয় নয়, এটি নাগরিককে ভিক্ষুকের অবস্থান থেকে তুলে এনে সম্মানের আসনে বসানোর প্রথম রাজনৈতিক পদক্ষেপ—কারণ রাষ্ট্র যখন করুণার ভাষা ত্যাগ করে প্রাপ্য অধিকারের ভাষায় কথা বলে, তখনই শিকল ভেঙে জেগে ওঠে মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা। মানবিক মুক্তির পথ রেখাও গড়ে ওঠে ভাবনার স্পষ্ট ধাপে ধাপে। আমাদের রাষ্ট্রভাবনায় কতগুলো অতি মৌলিক ধারণাকে স্পষ্ট সংজ্ঞায়িত করা জরুরি। প্রথমত, ‘মৌলিক প্রয়োজন’ হলো খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয় ও পানির মতো দৈহিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ন্যূনতম রসদ। এটি চরম বস্তুগত চাহিদা, যা কেবল মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে এবং যা কোনও দানশীলতার মাধ্যমেও মেটানো সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, এই প্রয়োজন যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি এবং আইনি স্বীকৃতি পায়, তখন তা রূপান্তরিত হয় ‘অধিকারে’—যা নাগরিকের দাবি করার বৈধ শক্তিতে পরিণত হয়।

তৃতীয়ত, ‘মানবাধিকার’ হলো কোনও রাষ্ট্র বা সরকারের দেওয়া উপহার নয়; জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার কারণেই সর্বজনীনভাবে প্রাপ্ত অলঙ্ঘনীয় সম্মান ও সুরক্ষা।

চতুর্থত, এই মানবাধিকারের যে অংশটি দেশের সংবিধানে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং যার লঙ্ঘনে সুপ্রিম কোর্ট বা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাছে সরাসরি আইনি বিচার পাওয়া যায়, তা-ই হলো ‘মৌলিক অধিকার’। পঞ্চমত, এই অধিকারগুলোকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ‘সুশাসন’—যার মূল স্তম্ভ হলো স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, বিকেন্দ্রীকরণ ও দুর্নীতির শূন্য সহনশীলতা। আর এই প্রতিটি ধারণার সফল সমন্বয়ে অর্জিত হয় ‘মানবিক মুক্তি’—যেখানে দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্যের শৃঙ্খল ভেঙে একজন মানুষ তার মেধা ও সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে—প্রয়োজন যখন প্রদীপের সলতে, অধিকার সেখানে আলো, আর সেই আলোর সর্বজনীন প্রবাহেই ঘটে মানুষের চিরন্তন মুক্তি।

নদীর এপার আর ওপার যেমন একই স্রোতের দুই হাত ধরে বাঁচে, তেমনই রাষ্ট্র ও নাগরিক বাঁচে পারস্পরিক দায়বদ্ধতার নিবিড় বাঁধার বন্ধনে। নাগরিকত্ব কোনও একতরফা প্রত্যাশার নাম নয়।

রাষ্ট্র যেমন তার নাগরিকের জীবন, সম্পত্তি ও মর্যাদার সুরক্ষা দিতে বাধ্য, নাগরিককেও তেমনই রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হয়। কর প্রদান করা বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করার পাশাপাশি নাগরিকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার থাকা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং সামাজিক কল্যাণে অংশ নেওয়া।

বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে এই দ্বিমুখী চুক্তির বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায়। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার সাংবিধানিক আদালতের ঐতিহাসিক রায়ে বলা হয়েছে, নিরাপদ পানির অধিকার রক্ষা করা কেবল সরকারের একা কাজ নয়, এটি নাগরিকদের পরিবেশ রক্ষার সম্মিলিত দায়বদ্ধতার সাথে যুক্ত। আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় প্রতিমাসের শেষে পরিচালিত হয় ‘উমুগান্ডা’ নামের নাগরিক পরিচ্ছন্নতা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, যেখানে রাষ্ট্রপতি থেকে সাধারণ নাগরিক সবাই নিজ নিজ এলাকার পরিচ্ছন্নতায় অংশ নেন, যা দেশটিকে আফ্রিকার অন্যতম সুশাসিত রাষ্ট্রে রূপান্তর করেছে। আবার আমাদের প্রতিবেশী নেপাল তাদের সংবিধানে পানি ও স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকারের মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি নাগরিকদের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার আইনি দায়িত্বও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে— দায়িত্বহীন অধিকার যেমন ঔদ্ধত্যের জন্ম দেয়, তেমনই অধিকারহীন দায়িত্ব মানুষকে পরিণত করে এক নিঃশব্দ বাকহীন বন্দিতে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল চেতনা ছিল মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। আমাদের সংবিধানে সেই চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায়। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে এবং মানবসত্তার মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হবে। ১৫ অনুচ্ছেদে মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছে, ১৯ অনুচ্ছেদে সর্বস্তরে সুযোগের সমতা ও সুষম বণ্টনের কথা বলা হয়েছে, আর ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যহীনতা এবং জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষাকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

এই সাংবিধানিক অনুশাসনের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ তৈরি করেছে জাতীয় পানি নীতি, জাতীয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন নীতি এবং দুর্গম ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিশেষ কৌশলপত্র। এসব নীতিমালায় পরিষ্কার বলা আছে, পানি বা স্যানিটেশন সেবা পাওয়া কোনও সরকারি করুণা নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের সংবিধান স্বীকৃত আইনি অধিকার—আইনের ধারাগুলো তাই কেবল শুষ্ক কাগজের দলিল নয়, তা হলো প্রতিটি নাগরিকের মাথার ওপর এক সুবিশাল আশ্বাসের নীল আকাশ।

একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একাধিক আইনি ও নৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ। ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের আলোকে ২০১০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ তার ঐতিহাসিক প্রস্তাবের মাধ্যমে নিরাপদ সুপেয় পানি এবং স্যানিটেশনকে পৃথক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

একইসঙ্গে, জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ষষ্ঠ লক্ষ্য—নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, পঞ্চম লক্ষ্য—লিঙ্গসমতা, এবং ষোড়শ লক্ষ্য—শান্তি, ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি অর্জনে বাংলাদেশ বৈশ্বিক মঞ্চে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলো কোনও আনুষ্ঠানিকতা নয়, এগুলো পূরণ করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্বের অংশ—এই বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি কোনও দূর দেশের বাণী নয়, এটি নিজ গৃহের আলো জ্বালানোর এক সর্বজনীন নৈতিক শপথ।

এক ঘড়া পানির গভীরে ভেসে ওঠে গোটা জীবনের ছবি, আর এক ফোঁটা পরিচ্ছন্নতায় নির্ধারিত হয় কোনও এক নারীর নীরব আত্মসম্মান। অধিকারের এই দার্শনিক আলোচনা তখনই সার্থক হয়, যখন তা মানুষের প্রতিদিনের জীবনের সাথে মিলে যায়। নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা—এগুলো কেবল জনস্বাস্থ্যের বিষয় নয়, এগুলো মানুষের মর্যাদার মূল ভিত্তি। বৈশ্বিক ও জাতীয় তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উৎস বা নলকূপের সংখ্যা বাড়লেও জীবাণুমুক্ত ও গুণগত মানসম্পন্ন ‘নিরাপদভাবে পরিচালিত’ পানির সুপেয়তা নিশ্চিত করতে আমাদের উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চল, হাওর, পাহাড় ও শহুরে বস্তিগুলোতে আজও তীব্র সংগ্রাম বিদ্যমান। বিশেষ করে নারীদের ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে দীর্ঘদিন সামাজিক সংকোচের আড়ালে রেখে তাদের মানবাধিকারকে খর্ব করা হয়েছে।

বিদ্যাপীঠ ও কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব ও প্রতিবন্ধীবান্ধব স্যানিটেশনের অভাব সরাসরি সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হার্ভার্ড, ইয়েল এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক নীতি ও জনস্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় দেখা গেছে—যেসব বিকাশমান দেশে বিদ্যাপীঠ ও কর্মক্ষেত্রে মানসম্মত স্যানিটেশন এবং ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা গেছে, সেখানে মেয়েদের স্কুল ছুটের হার এক ধাক্কায় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ কমেছে এবং নারীদের অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যে সমাজে পানি ও স্যানিটেশনের মতো প্রাথমিক সম্পদ সুষম ও স্বচ্ছভাবে বিতরণ করা হয়, সেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ও সুশাসনের মান বহুগুণ বেড়ে যায় কারণ যেখানে নারীর লজ্জা নয়, বরং স্বাস্থ্যই মর্যাদা পায়, সেখানেই নতুন প্রজন্মের মুক্তির প্রথম বীজটি রোপিত হয়।

নতুন দিনের নতুন আলো যখন প্রশাসনিক জানালায় এসে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের চোখ খোঁজে প্রতিশ্রুতির আসল প্রতিফলন। যেকোনও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসনিক যাত্রায় সরকারের সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটে তার কর্মপরিকল্পনায়। বর্তমান সরকারের ঘোষিত রাজনৈতিক ইশতেহার এবং তাদের প্রথম ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সামাজিক নিরাপত্তার আধুনিকায়ন, নদী-নালা পুনরুদ্ধার এবং জনসেবাকে সহজ করার যেসব কথা বলা হয়েছে—তা নাগরিকের মনে আশার সঞ্চার করে।

তবে এসব ইশতেহার বা ১৮০ দিনের পরিকল্পনাকে সুশাসনের কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ করতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, দুর্নীতি প্রতিরোধে কঠোর নীতি গ্রহণ করা এবং মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের সেবাকে গতিশীল করা প্রয়োজন। এই কার্যক্রমে সরকার এবং নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোকে পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে হবে। সরকার অবকাঠামো তৈরি করবে ও নীতিগত বাজেট বরাদ্দ দেবে, আর নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলো প্রান্তিক মানুষের না-বলা কথাগুলোকে নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং সামাজিক নিরীক্ষার মাধ্যমে স্বচ্ছতা তদারকি করবে—রাষ্ট্র যখন সেবকের বিনয়ে দাঁড়ায় আর নাগরিক সমাজ যখন পাহারাদারের জাগরণে থাকে, তখনই গড়ে ওঠে এক দুর্ভেদ্য সুশাসনের দুর্গ।

ভোরের উদয়কে রুখে দেওয়ার শক্তি যেমন কোনও অন্ধকারের নেই, তেমনই জাগ্রত নাগরিকের মুক্তির আকুতিকেও রোধ করতে পারে না কোনও বৈষম্যের দেয়াল। আমাদের পূর্বসূরিরা এই বিশ্বকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে যাওয়ার যে দীপ্ত শপথ নিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নের সময় এখনই।

নাগরিকত্ব হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, নিজের পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখা এবং অপরের অধিকার সুরক্ষায় সোচ্চার হওয়ার নৈতিক শক্তি। রাষ্ট্র যখন অনুকম্পার দান নয় বরং নাগরিকের প্রাপ্য অধিকার হিসেবে তার সেবা পৌঁছে দেবে, আর নাগরিক যখন অধিকার সচেতনতার পাশাপাশি নিজের সামাজিক দায়িত্ব পালন করবে—তখনই ভাঙবে শতাব্দীর বৈষম্য। বাস্তবায়িত হবে আমাদের রক্তের আখরে লেখা সংবিধানের মূল চেতনা, আর অর্জিত হবে মানুষের বহুল কাঙ্ক্ষিত সত্যিকারের মানবিক মুক্তি—আসুন, করুণার ভাষা মুছে অধিকারের আলোয় পথ চলি, যেখানে শুধু বেঁচে থাকা নয়, পূর্ণ মর্যাদায় মাথাতুলে বাঁচাই হবে প্রতিটি মানুষের একমাত্র পরিচয়।

লেখক: একজন উন্নয়নকর্মী

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
প্রথম শ্রেণিতে লাটারির মাধ্যমে ভর্তির খবর, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ‘হয়নি’
প্রথম শ্রেণিতে লাটারির মাধ্যমে ভর্তির খবর, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ‘হয়নি’
বুধবার ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
বুধবার ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
অন্যের শরীরে এমপির চেহারা বসিয়ে ভিডিও বানানো একজন গ্রেফতার
অন্যের শরীরে এমপির চেহারা বসিয়ে ভিডিও বানানো একজন গ্রেফতার
‘তিন হাজারের’ বিদ্যুৎ বিল জুনে ৭৮৮৪ টাকা, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইলেন শিল্পী
‘তিন হাজারের’ বিদ্যুৎ বিল জুনে ৭৮৮৪ টাকা, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইলেন শিল্পী
সর্বশেষসর্বাধিক