বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে বেসরকারি খাত ও সুশীল সমাজের মধ্যে আমলাতন্ত্রের সমালোচনা যেন এক স্বাভাবিক চর্চা ও প্রায় ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতা, ধীরগতি, দুর্নীতি বা অদক্ষতা এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা অবশ্যই জরুরি; তবে সাম্প্রতিক চিন্তাধারা দেখাচ্ছে যে কেবল নেতিবাচকতা-কেন্দ্রিক বিশ্লেষণ সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান দিতে পারে না। বরং একমাত্র সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় প্রশাসনের ভেতরে হতাশা তৈরি করে, উদ্ভাবনকে নিরুৎসাহিত করে এবং জনআস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই বাস্তবতায় একটি নতুন ধারণা সম্প্রতি গুরুত্ব পাচ্ছে, ইতিবাচকতার মাধ্যমে প্রশাসনিক উন্নয়ন।
এই প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক জনপ্রশাসন (পজিটিভ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-পিপিএ) জনপ্রশাসন গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি দীর্ঘদিনের সেই প্রচলিত প্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ করে, যেখানে প্রশাসনিক বিশ্লেষণ মূলত ব্যর্থতা, দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার ওপর কেন্দ্রীভূত। ‘ইতিবাচক জনপ্রশাসন’ ধারণার পরিবর্তে কোন সরকারি কার্যক্রম সফল হচ্ছে, কেন তা সফল হচ্ছে এবং সেই সাফল্যকে কীভাবে বৃহত্তর পরিসরে প্রয়োগ করা যায়, তা পর্যালোচনা করে এবং বিবেচনায় নেয়।
প্রচলিত জনপ্রশাসনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘ডেফিসিট মডেল’ অর্থাৎ সমস্যার তালিকা তৈরি করা এবং সেই সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজা। এতে দুর্নীতি, জবাবদিহির ঘাটতি, নীতিগত ব্যর্থতা ও প্রশাসনিক অদক্ষতা প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। যদিও এসব বাস্তব সমস্যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তবু পিপিএ ধারণা মনে করে যে শুধু সমস্যার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে পিপিএ তিনটি মৌলিক ধারণার ওপর গুরুত্ব প্রদান করে। প্রথমত, সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সফলভাবে কাজ করে। দ্বিতীয়ত, এই সাফল্যগুলোর মধ্যে ভবিষ্যৎ সংস্কারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিহিত থাকে। তৃতীয়ত, ইতিবাচক বর্ণনা ও স্বীকৃতি কর্মীদের প্রেরণা বৃদ্ধি করে এবং নাগরিকদের মধ্যে আস্থা তৈরি করে।
অতএব, পিপিএ কোনও সমস্যাকে অস্বীকার করে না, বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণ পদ্ধতির প্রস্তাব দেয়, যেখানে সাফল্য ও ব্যর্থতা উভয়ই সমান গুরুত্ব পায়।
পাশাপাশি পিপিএ জনপ্রশাসনকে একটি নতুন গবেষণামুখী দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এটি গবেষকদের উৎসাহিত করে এমন প্রতিষ্ঠান, কর্মসূচি এবং নীতিমালাকে চিহ্নিত করতে, যেগুলো বাস্তবে কার্যকর এবং উচ্চ কর্মদক্ষতা প্রদর্শন করছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রশাসনিক কর্মচারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন করে। এর মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের কেবল নিয়ম অনুসরণকারী হিসেবে না দেখে, বরং উদ্ভাবনী এবং সক্রিয় পরিবর্তন-সৃষ্টিকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এছাড়া পিপিএ আচরণগত বিজ্ঞানকে জনপ্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত করে। এতে বোঝানো হয় যে প্রশাসনের কার্যকারিতা কেবল কাঠামো বা নিয়মের ওপর নির্ভর করে না; বরং কর্মীদের মনোবল, অন্তর্নিহিত প্রেরণা, নেতৃত্বের ধরন এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এখন দেখা যাক, এর বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে প্রভাব ফেলে। বর্তমান সময়ে পিপিএ শুধু তাত্ত্বিক ধারণা নয়; বরং এর বাস্তব প্রয়োগ ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। জনসেবা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা আলোকে এটি প্রমাণিত সত্য যে সরকারি কর্মচারীদের প্রেরণা বাড়ানো উন্নত সেবা প্রদানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেশ কিছু গবেষণা প্রমাণ করে যে কেবল নিয়ন্ত্রণ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং স্বীকৃতি, প্রশংসা এবং সহায়ক নেতৃত্ব কর্মীদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে বেশি কার্যকর। এর ফলে কর্মীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পায় এবং তারা নিজেদের কাজকে অর্থবহ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
সেই সঙ্গে পিপিএ নীতি বিশ্লেষণে একটি মৌলিক পরিবর্তন আনে। এটি ব্যর্থতার কারণ খোঁজার পাশাপাশি সফল নীতির বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করতে উৎসাহিত করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনও সফল শিক্ষা বা স্বাস্থ্য কর্মসূচি কীভাবে ফলপ্রসূ হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে একই ধরনের উদ্যোগ অন্যান্য অঞ্চলে সম্প্রসারণ করা সম্ভব। এর পাশাপাশি পিপিএ সংকট ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করে। কোভিড-১৯ মহামারির মতো বৈশ্বিক সংকট দেখিয়েছে যে কিছু দেশ বা প্রতিষ্ঠান অন্যদের তুলনায় ভালোভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। পিপিএ এই সফল অভিজ্ঞতাগুলো বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তিশালী ও কষ্ট সহিষ্ণু প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করে।
সেই সঙ্গে যখন প্রশাসন সম্পর্কে কেবল নেতিবাচক খবর প্রচারিত হয়, তখন নাগরিকদের মধ্যে আস্থা কমে যায়। পিপিএ ইতিবাচক অর্জনগুলো তুলে ধরার মাধ্যমে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে সহায়তা করে এবং সামাজিক চুক্তিকে আরও দৃঢ় করে। অধিকন্তু, পিপিএ উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে এবং প্রশাসনকে আরও অংশগ্রহণমূলক করে তোলে। এতে নাগরিক, বেসরকারি খাত এবং সিভিল সোসাইটির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা নীতিনির্ধারণ ও সেবা প্রদানে নতুন মাত্রা যোগ করে।
এখন উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে আলোচনা করা যাক। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পিপিএ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এসব দেশে সীমিত সম্পদ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। প্রচলিতভাবে এসব দেশের প্রশাসনকে দুর্বলতা ও ব্যর্থতার দৃষ্টিতে দেখা হয়, যা কর্মীদের মনোবল কমিয়ে দেয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। পিপিএ এই প্রেক্ষাপটে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। এটি দেখায় যে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অনেক ক্ষেত্রে সফল উদ্যোগ রয়েছে, যেমন স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল সেবা বা শিক্ষা কর্মসূচি। এসব সফলতা চিহ্নিত করে বৃহত্তর পরিসরে প্রয়োগ করলে প্রশাসনিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতে পারে।
এছাড়া, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ই বাইরের ‘সেরা অনুশীলন’ অনুসরণ করে সংস্কার আনা হয়, যা অনেক সময় স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। পিপিএ স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও সফলতার ওপর ভিত্তি করে নীতি প্রণয়নকে উৎসাহিত করে, যা অধিক টেকসই ও কার্যকর।
যদিও পিপিএ একটি সম্ভাবনাময় দৃষ্টিভঙ্গি, তবু এটি নিখুঁত নয়। এর প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো এটি কখনও কখনও কাঠামোগত সমস্যা যেমন বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রভাব বা দুর্নীতিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব নাও দিতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত ইতিবাচকতার ফলে বাস্তব সমস্যাগুলো আড়াল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই, পিপিএ-কে একমাত্র সমাধান হিসেবে না দেখে একটি পরিপূরক পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত, যেখানে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকের সমন্বিত বিশ্লেষণ করা হবে।
বর্তমান জটিল ও পরিবর্তনশীল বিশ্বে জনপ্রশাসনের জন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। পজিটিভ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সেই প্রয়োজন পূরণে একটি শক্তিশালী ও বাস্তবসম্মত কাঠামো প্রদান করে। এটি ধারণা প্রদান করে যে প্রশাসনিক উন্নয়ন কেবল সমস্যা চিহ্নিত করার মাধ্যমে নয়, বরং বিদ্যমান শক্তিকে চিহ্নিত ও সম্প্রসারণের মাধ্যমেও সম্ভব। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সীমিত সম্পদ ও জটিল চ্যালেঞ্জের মধ্যে ‘যা কাজ করছে’ তা থেকে শিক্ষাগ্রহণ এবং তা প্রয়োগ করা, এই কৌশলই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান পথ হতে পারে। তবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে সতর্কতার সঙ্গে, যাতে বাস্তব সমস্যাগুলো উপেক্ষিত না হয় এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
লেখক: জনপ্রশাসন ও জননীতি বিশ্লেষক