প্রতি বছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে লাখ লাখ শিক্ষার্থী সনদপত্র হাতে নিয়ে বের হয়ে আসে, অথচ শিল্প-কারখানা ও সেবা খাত দক্ষ জনশক্তির অভাবে ধুঁকছে। এই স্ববিরোধিতা আজ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি। একদিকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া স্নাতকদের একটি বড় অংশ উপযুক্ত কর্মসংস্থান পাচ্ছে না, অন্যদিকে নির্মাণ, তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা কৃষি প্রক্রিয়াকরণের মতো খাতগুলো দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলের তীব্র সংকটে ভুগছে। এই বাস্তবতা থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে দুটি সমান্তরাল পথে এগোতে হবে— একদিকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার (টিভিইটি) ব্যাপক সম্প্রসারণ, অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষার আমূল সংস্কার।
গত দেড় দশকে সরকারি নীতিনির্ধারকরা কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব বারবার স্বীকার করেছেন এবং এ খাতে কিছুটা অগ্রগতিও হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ২০০৯ সালের মাত্র ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৮ সালে প্রায় ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। অথচ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা (এনএসডিপি-২০১১) অনুযায়ী লক্ষ্য ছিল— ২০২০ সালের মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে কারিগরি ধারায় সম্পৃক্ত করা— সেই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।
এর মূল কারণ কেবল বিনিয়োগের ঘাটতি নয়, বরং সামাজিক মানসিকতা। বাংলাদেশে এখনও কারিগরি শিক্ষাকে দেখা হয় তাদের জন্য, যাদের সাধারণ শিক্ষায় ‘সুযোগ নেই’— মেধাবী বা সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের প্রথম পছন্দ নয় এটি। এই কলঙ্কের কারণে অভিভাবক ও শিক্ষার্থী উভয়েই সাধারণ শিক্ষার সনদমুখী দৌড়ে অংশ নিতে বাধ্য হন, যদিও বাস্তবে সেই সনদ অনেক ক্ষেত্রে কর্মবাজারে কোনও প্রাসঙ্গিকতা রাখে না। উপরন্তু, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই কারিগরি শিক্ষার সিংহভাগ বহন করে, যেখানে মানসম্পন্ন প্রশিক্ষক, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সরঞ্জাম ও শিল্পের সঙ্গে সংযোগের অভাব প্রকট।
আমাদের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা মূলত মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক সনদ অর্জনের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, যোগাযোগ ক্ষমতা কিংবা প্রযুক্তিগত দক্ষতা গড়ে তোলার দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয় না। ফলে একজন স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীও অনেক সময় কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ব্যবহারিক দক্ষতা নিয়ে প্রস্তুত থাকেন না। এই ফারাক শুধু দেশীয় শ্রমবাজারে নয়, বিদেশে জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রেও প্রকট। বাংলাদেশ থেকে যে বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে যান, তাদের সিংহভাগ অদক্ষ বা আধা-দক্ষ শ্রমিক হিসেবে গণ্য হন এবং তুলনামূলকভাবে কম মজুরি পান— অথচ সঠিক কারিগরি প্রশিক্ষণ পেলে তারা দক্ষ কর্মী হিসেবে অনেক বেশি রেমিট্যান্স অর্জন করতে পারতেন।
জার্মানির ‘দ্বৈত ব্যবস্থা’ একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত, যেখানে শিক্ষার্থীরা একইসাথে শ্রেণিকক্ষে তত্ত্বীয় জ্ঞান অর্জন করে এবং কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে বাস্তব কর্মপরিবেশে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নেয়। এই মডেলে উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী কোনও না কোনোভাবে বৃত্তিমূলক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকে। ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোও শিল্পায়নের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরি শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে রেখেছে। বাংলাদেশও যদি সত্যিকার অর্থে একটি মধ্যম আয়ের অর্থনীতি থেকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে উত্তরণ ঘটাতে চায়, তাহলে শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত এমন একটি বাস্তবভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য, যেখানে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ ও কর্মক্ষেত্র উভয় জায়গা থেকেই শিখবে।
কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার বিদ্যমান কাঠামোরও গভীর সংস্কার প্রয়োজন। বাংলাদেশের সামগ্রিক সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৮ শতাংশে পৌঁছালেও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— একাধিক আন্তর্জাতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আয়ের তুলনায় বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় যতটা অগ্রগতি অর্জন করেছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে ততটা করতে পারেনি।
এই সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত তিনটি বিষয়— প্রথমত, পাঠ্যক্রমকে মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করে বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানমুখী করে তোলা। দ্বিতীয়ত, মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল ও তথ্যপ্রযুক্তিগত সাক্ষরতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করা, যা আজকের অর্থনীতিতে প্রায় সকল পেশার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তৃতীয়ত, স্কুল পর্যায় থেকেই কার্যকর ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু করা, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ ও সামর্থ্য অনুযায়ী সাধারণ ও কারিগরি— উভয় ধারার মধ্যে সচেতনভাবে বেছে নিতে পারে, সামাজিক কলঙ্কের চাপে নয়।
শুধু আলাদা আলাদা প্রকল্প বা স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল, যেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বেসরকারি খাত এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো একসাথে কাজ করবে। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সেগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে— প্রশিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং শিল্পের সঙ্গে শিক্ষানবিশি সংযোগ জোরদার করা জরুরি। একইসাথে, কারিগরি শিক্ষা থেকে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত উত্তরণের পথ সহজ করতে হবে, যাতে একজন শিক্ষার্থী কারিগরি ধারায় পড়াশোনা করেও উচ্চশিক্ষার দুয়ার খোলা রাখতে পারে। এতে কারিগরি শিক্ষা সম্পর্কে সমাজে বিরাজমান নেতিবাচক ধারণাও ধীরে ধীরে দূর হবে।
বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে, তখন দক্ষ মানবসম্পদই হবে এই যাত্রার মূল চালিকাশক্তি। সনদনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে টিকে থাকা সম্ভব নয়। কারিগরি শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ দুটোই দিতে হবে, আর সাধারণ শিক্ষাকে হতে হবে চিন্তাশীল, বিশ্লেষণী ও বাস্তবমুখী। এই দুই স্তম্ভ একসাথে দাঁড়ালেই কেবল বাংলাদেশ তার তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারবে— নইলে জনসংখ্যার এই সুবিধা একসময় বোঝায় পরিণত হতে পারে।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর