সমাজ ধর্ষণকে ‘যৌনতা’ হিসেবে দেখে, ‘অপরাধ’ হিসেবে নয় 

শাহানা হুদা রঞ্জনা
০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৭

ধর্ষণের মুখোমুখি হওয়া এক নারী বলেছিলেন, ঘটনার পর এলাকার পুরুষরা তাঁর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে—মনে হয় তারা চোখ দিয়ে তাকে পুনরায় ধর্ষণ করছে। এলাকার নারী পাড়া-প্রতিবেশীরাও জানতে চেয়েছে ধর্ষণ করার সময় মেয়েটির অনুভূতি কেমন ছিল? এই প্রশ্ন যে সুস্থ কোনও মানুষ, বিশেষ করে নারী করতে পারে এটা কল্পনাতীত। এই ভয়াবহ অসুস্থ মানসিকতা আমাদের অনেকের মধ্যেই আছে। এরা সরাসরি নারীকে ধর্ষণ করে না, কিন্তু এদের মন ধর্ষকামী। সমাজে এই ধর্ষকামী মানুষের সংখ্যা কম নয়, বরং বাড়ছে।

এ ধরনের অসুস্থ মানসিকতা অবশ্য নতুন নয়, এর বর্ণনা পাওয়া যায় টারকুইনাসের ‘দ্য রেপ অব লুক্রেশিয়া’র মতো প্রাচীন রোমের একটি ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক ঘটনায়। যেখানে রাজা টারকুইন-এর ছেলে সেক্সটাস রোমান সেনাপতির সতী ও গুণবতী স্ত্রী লুক্রেটিয়াকে লাঞ্ছনার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। ঘটনার পর লুক্রেটিয়া তাঁর স্বামী ও পিতাকে ডেকে সব ঘটনা জানান এবং সম্মানহানির গ্লানি সইতে না পেরে তাঁদের সামনেই আত্মঘাতী হন। ধর্ষণের শিকার লুক্রেশিয়া আত্মহত্যা করেও রেহাই পাননি। কতিপয় পণ্ডিত তাকে ‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও যৌন আনন্দ ভোগ করার পাপে পাপী’ বলে অভিযুক্ত করেছিলেন।

ঠিক একইভাবে আকিরা কুরোসাওয়ার ‘রশোমন’ চলচ্চিত্রে দেখিয়েছেন যে বনের ভেতর ডাকাত সর্দার, সামুরাই পুরুষটিকে গাছের সঙ্গে বেঁধে তার বউকে ধর্ষণ করে, মেয়েটি শুরুতে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলেও একসময় তার প্রতিরোধ শিথিল হতে দেখা যায় এবং সে আত্মসমর্পণ করে। এই ভয়াবহ ব্যাপারটি সে উপভোগ করা শুরু করেছে, এমন দৃশ্যও দেখানো হয়েছে। (সূত্র: অদিতি ফাল্গুনী, কথাসাহিত্যিক)

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় একটি গ্রামে বাসার গ্রিল ভেঙে একজন স্কুলছাত্রীকে অপহরণের পর সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। জানি না এই কিশোরীকেও পরবর্তীকালে একই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হবে কিনা।

চলতি বছরের জুলাইতে ধর্ষণ এবং আত্মহত্যার হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জুনের তুলনায় জুলাইতে ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাইতে ৯০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে জুনে এই সংখ্যা ছিল ৬৮টি। ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যু হলে এক ধরনের নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। আর বেঁচে থাকলে অনেকেই ভিকটিম ব্লেইমিংয়ের মুখে পড়েন। আর এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অনেক মেয়ে লজ্জায়, অপমানে আত্মহত্যা করে।

ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর, বড় ট্রমা ভিকটিম ব্লেইমিং। যে নারী বা শিশু ধর্ষণের শিকার হন, তাকেই নানা ধরনের কু-যুক্তি দিয়ে ধর্ষণ ঘটনার জন্য দায়ী করার চেষ্টা করে সমাজ। শিশু যদি গৃহের ভেতরে, নিজের পরিবারের কারও দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়, পরিবারই প্রথমত তা বিশ্বাস করে না। এভাবেই যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে প্রতিটি আসল ঘটনা ছাপিয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় পরিবারের সম্মান ও সমাজের নেতিবাচক মনোভাব।

ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানি বন্ধ করতে হলে আইনকে যেমন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, রাষ্ট্রকে এর দায়িত্ব নিতে হবে, তেমনই যাদের মন ও মগজ ধর্ষকামী তাদের সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একজন ছেলে তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছে, ‘‘একটা ছেলের পক্ষে একা একটা মেয়েকে ধর্ষণ করা সম্ভব নয়, যদি না মেয়েটির ক্ষেত্রে সেক্সুায়াল অ্যাপিল কাজ না করে।’’

এই স্ট্যাটাস দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় যে সমাজ পেছনে হাঁটছে। এর চেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার হলো—যে ছেলেটি এই নোংরা স্ট্যাটাসটি দিয়েছে, তার সঙ্গে আমার মিউচ্যুয়াল ফ্রেন্ড ৯ জন। তার বন্ধুর তালিকায় লেখক, কবি, সাংবাদিক, শিক্ষক, পিএইচডিধারী সবাই আছেন। এর মানে চিহ্নিত কিছু দানব ধর্ষণের মতো অপরাধ করছে, আর সমাজের আরও কিছু শিক্ষিত, ধর্ষকামী পুরুষ এই কাজকে সমর্থন করছে। ছেলেটির স্ট্যাটাসের নিচে অনেকেই ওকে সমর্থন করে আরও অশ্লীল মন্তব্য করেছে। 

ধর্ষণের পক্ষে কোনও কারণ থাকতে পারে না। নারীর পোশাক এবং চলাফেরার দোষ দিয়ে, ধর্ষণকে জায়েজ করা বিকৃতিরই প্রকাশ। বিপদ হচ্ছে ধর্ষকের চেয়ে ধর্ষকামী মানসিকতার লোকের সংখ্যা অনেক বেশি। যারা ধর্ষণকে অপরাধ বলে যতটা না মনে করে, এর চাইতে বেশি কারণ খোঁজার চেষ্টা করে।

প্রাচীন গ্রিক ও রোমক পুরাণের সূত্র ধরেই জানা যাচ্ছে, খ্রিষ্টপূর্ব ৯০০ অব্দ থেকেই পৃথিবীতে ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ চালু হয়। গ্রিক পুরাণে খোদ দেবরাজ জিউস একাধিক নারীকে ধর্ষণ করেছে। সমুদ্র দেবতা পসেইদন ধর্ষণ করে মেডুসাকে। রোমক সম্রাট কনস্ট্যান্টিন প্রথম ‘ধর্ষণ’কে ব্যক্তিগত অন্যায়ের বদলে ‘জনপরিসরে সংঘটিত অপরাধ’ হিসেবে পুনর্সংজ্ঞায়িত করলেও ‘সম্মতি’দানের অপরাধে ঘটনার শিকার নারীকে প্রায়ই ঘটনার হোতা পুরুষটির সঙ্গে আগুনে পুড়িয়ে মারা হতো। সম্মতি প্রমাণিত না হলেও নারীটিকে ‘দুষ্কর্মের সহযোগী’ হিসেবে দণ্ড দেওয়া হতো। সেই ঐতিহ্য আজও চলছে। (ধর্ষণ: পুরাণ থেকে বর্তমানে, অদিতি ফাল্গুনী)

এখনও ধর্ষণের শিকার নারীকেই যেকোনোভাবে ‘দুষ্কর্মের সহযোগী’ হিসেবে দেখা হয়। তাই সমাজ ধর্ষণের মুখোমুখি হওয়া মেয়েদের একঘরে করে। তাদেরই জবাবদিহি করতে হয় কেন সে ধর্ষণের মুখোমুখি হলো? আইনের সামনে তাকেই প্রমাণপত্র হাজির করতে হয় যে সে ধর্ষণের শিকার।

বাংলাদেশের সমাজে ধর্ষণের শিকার নারী বা মেয়েকেই আংশিক বা পুরোপুরি দায়ী করার প্রবণতা খুব বেশি। পিতৃতন্ত্র এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে পুরুষের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নারীর চাইতে তুলনামূলক অনেক বেশি। তাই ধর্ষণের ঘটনার পর পুরুষের ওপর পুরো দোষ না চাপিয়ে নারীর আচরণ, পোশাক বা চলাফেরা এবং ‘পরিবারের সম্মান’-এর ওপর দায় চাপানো হয়। সেই হিসেবে যৌন সহিংসতার দায় অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীর ওপর চাপানোটা সহজ হয়ে যায়।

একজন নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর অনেকেই প্রশ্ন করে—মেয়েটি রাতে বের হয়েছিল কেন? ওই জায়গায় গেল কেন? পোশাকটা এমন ছিল কেন? এভাবে অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীর আচরণকে কারণ হিসেবে খোঁজা হয়, কারণ এতে তাদের কাছে পৃথিবীকে ‘ন্যায্য’ বলে মনে হয়।

‘জাস্ট ওয়ার্ল্ড হাইপোথিসিস’ বা ‘ন্যায়সঙ্গ পৃথিবী’ ধারণা মেলভিন জে. লারনার-এর একটি মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, যা ব্যাখ্যা করে—কেন অনেক মানুষ অন্যায়ের শিকার ব্যক্তিকেই দোষারোপ করে। কারণ তারা অবচেতনভাবে বিশ্বাস করতে চায়, পৃথিবী মূলত ন্যায্য এবং প্রত্যেকে নিজের প্রাপ্যটাই পায়। অর্থাৎ যে যেমন কাজ করে, তেমন ফলাফল পায়।

তারা এও বিশ্বাস করে যে ‘‘ভালো মানুষের সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটে না।’’ তাই যখন ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ ঘটে, তখন তারা ভাবে ‘‘নিশ্চয়ই মেয়েটির কোনও ভুল ছিল।’’ তবে এই বিশ্বাস যখন ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধকে অস্বীকার করে এবং ভুক্তভোগীকেই দোষী বানায়, তখন তা সাংঘাতিক রকমের ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

সমাজে এখনও কিছু ভুল এবং অন্যায় ধারণা প্রচলিত আছে, যেমন- ‘‘প্রতিরোধ করলে ধর্ষণ সম্ভব নয়।’’ অথবা ‘‘ভালো পরিবারের মেয়েদের এমন হয় না।’’ বাংলাদেশে এখনও যৌন সহিংসতাকে ব্যক্তিগত অপরাধের পরিবর্তে ‘‘পারিবারিক লজ্জা’’ হিসেবে দেখা হয়। ফলে মামলা না করতে চাপ দেওয়া হয় ও ঘটনা গোপন রাখতে বলা হয়। অন্যদিকে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হয়, যাতে পরিবার, এই সমাজের সমালোচনা এড়াতে পারে।

সমাজ ভুক্তভোগীকে অনেক প্রশ্ন করে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে অনেক কম প্রশ্ন করে অপরাধীকে। কী অদ্ভুত বৈপরীত্য। যখন অপরাধীর পক্ষে থাকা লোকজন দেখে অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীর আচরণ নিয়ে আলোচনা করলে, ঘটনার দায় স্থানান্তর করা যায়, তখন তারা সেদিকেই সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ঘোরানোর চেষ্টা করে, নানাভাবে। এই কাজে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ব্যবহৃত হয়। তেমনই প্রয়োজনে গুজবও ছড়ানো হয়।

যদি ধরেও নিই কোনও মেয়ে ’মন্দ’, তাহলে কি তাকে ধর্ষণ করাটা জায়েজ? একজন যৌনকর্মীকেও ধর্ষণ করার অধিকার কারও নেই। পুরোনো সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ১৫৫ ধারার ৪ উপধারা অনুযায়ী, কোনও পুরুষ যখন ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তখন ভিকটিমের অতীত চরিত্র বা নৈতিক স্খলন নিয়ে প্রশ্ন তোলার আইনি সুযোগ ছিল।

তবে নারীর মর্যাদাহানি ও মানবাধিকারবিরোধী হওয়ায় পরবর্তীকালে এই বিধানটি বাতিল বা বিলুপ্ত করা হয়। ঢাকায় দুজন তরুণীকে ধর্ষণের আলোচিত একটি মামলায় আসামিরা খালাস পাওয়ার ঘটনায় নারী অধিকারকর্মীরা বিতর্কিত এই ধারাটি বাতিলের দাবি সামনে এনেছিলেন।

মনোচিকিৎসক অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম মনে করেন, ‘‘ধর্ষণ বিষয়টি আমরা সেক্সুলাইজ করছি, কিন্তু এটাকে ক্রিমিনাইলজ করার কথা।” সেক্সুয়াল সিম্বলটাকে নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাকে মানুষ হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে না। এটা কুরুচিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।” (বাংলা ট্রিবিউন)। আমাদের সমাজে ধর্ষণকে যৌন রূপ দেওয়া হয় বলেই পুরুষকে ধর্ষক হিসেবে সাধারণত অপরাধী বলে ভাবা হয় না। প্রকারান্তরে ধর্ষণের জন্য নারীকেই দায়ী করা হয়।

যে মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হন সেই মেয়েটির জীবন যে কতটা বিপর্যস্ত ও কষ্টকর হতে পারে, তা বুঝতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। ধর্ষণের শিকার হওয়া তো অনেক বড় ঘটনা, কোনও মেয়ে যৌন হয়রানির শিকার হলেই এ সমাজে তার বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। সমাজে ধর্ষণের শিকার নারী যতটা ঘৃণিত ও অবহেলিত হন, ধর্ষণ যে করে সে মোটামুটি নিরাপদেই থাকে।

এছাড়া নৈতিক পুলিশিং ও ভিকটিম ব্লেইমিংয়ের কারণে ধর্ষণের শিকার মেয়েটির পক্ষে আর কখনোই শান্তিতে থাকা হয় না, বিচার পাওয়াও হয় না। এমনকি এই সমাজ তাকে ন্যূনতম সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা দেয় না।

শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিশ্বকাপে মেসিকে হত্যার হুমকি, ফাঁস হলো ভয়ংকর নথি
বিশ্বকাপে মেসিকে হত্যার হুমকি, ফাঁস হলো ভয়ংকর নথি
রাষ্ট্রীয় কাজে গাফিলতি হলে কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী: রিজভী
রাষ্ট্রীয় কাজে গাফিলতি হলে কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী: রিজভী
রোজমেরি কেন এত আলোচনায়, মস্তিষ্ক ও চুলের যত্নে কতটা উপকারী
রোজমেরি কেন এত আলোচনায়, মস্তিষ্ক ও চুলের যত্নে কতটা উপকারী
ইঞ্জিন লাইনচ্যুত, রংপুরের সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন চলাচল ২ ঘণ্টা বন্ধ
ইঞ্জিন লাইনচ্যুত, রংপুরের সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন চলাচল ২ ঘণ্টা বন্ধ
সর্বশেষসর্বাধিক