বাংলাদেশের পাহাড় ও সমতল অঞ্চলের আদিবাসীরা এই দেশের প্রাচীনতম বাসিন্দা, মাটির প্রাণ। কিন্তু আজও তারা সমাজের এক প্রান্তিক অবস্থানে আটকে আছেন— যেখানে তাদের কষ্ট আর অবিচারের গল্প তীব্র যন্ত্রণায় হৃদয় ভেঙে দেয়। তাদের ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হয়, নারীদের অপহরণ করা হয়, শিশুদের নিরাপত্তাহীনতায় ফেলা হয়, এমনকি পোষা প্রাণীদেরও জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। এই নির্মমতার চিত্র কয়েক যুগ ধরে যেন অতি পরিচিত হয়ে উঠেছে। যে দেশের মাটিতে তাদের হাজার বছরের শিকড়, সেই দেশেই তারা আজ পরবাসী।
রাজশাহীর পবা উপজেলার বাগসারা গ্রামের সাঁওতালপাড়ায় সাত সাঁওতাল, চার ওরাঁও ও এক রবিদাস পরিবারের বাস ছিল। বাঁধের ধারে গড়া সেই ছোট্ট পল্লীটি ছিল তাদের নিজস্ব পৃথিবী। স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি, যিনি অন্ত্যজ শ্রেণির পরিবারগুলোর উপস্থিতিতে আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিলেন, একই দিনে-দুপুর ও সন্ধ্যায় দুই দফা হামলা চালান। ঘরদোর ভাঙচুর হয়, সম্পদ লুট হয়, মানুষ আতঙ্কে পালায়। হামলার পর সবাই বাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। উচ্ছেদ হওয়া এই পরিবারগুলো এখন কোথায়, কেউ জানে না। এই একটি ঘটনা দেশজুড়ে চলতে থাকা এক বৃহৎ প্রবণতার ছোট্ট প্রতিচ্ছবি মাত্র।
বাংলাদেশে যে জনগোষ্ঠীগুলো আদিবাসী পরিচয়ে স্বীকৃতি চাইছে, সাঁওতাল, ওরাঁও, মুণ্ডা প্রভৃতি, তারা এই অঞ্চলে বসবাস করছে আর্যদের আগমনেরও বহু আগে থেকে। আর্যরা আসার পর যেভাবে আদিবাসীদের বাসভূমি দখল শুরু হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতা আজও চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রোসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠী জুমচাষ, বাঁশনির্ভর কুটিরশিল্প ও জৈব খাদ্যচক্রের মাধ্যমে পাহাড়ের সঙ্গে এক টেকসই সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, যা শত শত বছর ধরে পাহাড়ের প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অথচ ১৯৭১ সালে পার্বত্য তিন জেলায় আদিবাসী ছিলেন ৯৮ শতাংশ, ২০২২ সালের শুমারিতে সেই অনুপাত প্রায় সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিবর্তন স্বাভাবিক নিয়মে ঘটেনি, পরিকল্পিতভাবে সেটেলার বাঙ্গালিদের সংখ্যা বাড়ানোর ফলেই এই চিত্র। একটি জনগোষ্ঠীকে তার নিজের ভূমিতে সংখ্যালঘু করে ফেলার এই প্রক্রিয়া ইতিহাসে বিরল নয়, কিন্তু বেদনাদায়ক।
আদিবাসীদের মাটির প্রাণ বলাটা কেবল আবেগ নয়, এর বাস্তব ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আছে। তারা ভূমিকে মালিকানার দৃষ্টিতে নয়, সবার সম্পদ হিসেবে দেখেন। জল, বন, মাটি আর প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেবল জীবিকার নয়, অস্তিত্বের। অথচ সেই তারাই আজ নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন। রাষ্ট্রীয়নীতিতে ‘আদিবাসী’ শব্দটিও যেন অবজ্ঞার পরিচায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণমাধ্যমকে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বলার নির্দেশনা দেওয়ার চর্চা দীর্ঘদিনের। একটি শব্দ বদলে দিয়ে একটি জাতির পরিচয়কে খাটো করার এই রাজনীতি নিজেই এক ধরনের সাংস্কৃতিক নিপীড়ন।
১৯৯৬ সালে রাঙামাটির লাইল্যাঘোনায় আদিবাসী ছাত্রনেতা ও অধিকারকর্মী কল্পনা চাকমাকে রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ ছিল, একজন সামরিক কর্মকর্তার নেতৃত্বে এই অপহরণ ঘটে। সারা দেশে তুমুল আলোড়ন উঠেছিল সেদিন, কিন্তু আজও তার কোনও খোঁজ নেই। ২০০২ সালের ১৮ আগস্ট নওগাঁর ভীমপুরে ভূমি দখলের লোভে একদল দুষ্কৃতকারী আদিবাসী পল্লীতে আগুন ধরিয়ে দেয়। শিশুদের পুকুরে ছুড়ে ফেলা হয়, নারীরা নির্যাতিত হন, আর নির্মমভাবে হত্যা করা হয় আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেনকে, যিনি নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানুষের অধিকারের জন্য লড়েছিলেন। সেই হত্যার বিচার আজও হয়নি। অভিযুক্তরা জামিনে বেরিয়ে এখনও আদিবাসী পরিবারগুলোকে ভয়ের মধ্যে রেখেছে। এ প্রশ্ন তাই স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে, ক্ষমতাহীন মানুষের বিচার পাওয়ার পথ কি এই রাষ্ট্রে কার্যত বন্ধ?
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন বহু বছর আগে গঠিত হলেও প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে তা কার্যকর হয়ে ওঠেনি। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির অন্যতম মূল প্রতিশ্রুতি ছিল এই কমিশনের মাধ্যমে দখল হওয়া জমি ফিরিয়ে দেওয়া, কিন্তু দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি কাগজেই আটকে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আদিবাসীরা নিজেদের দখলে থাকা জমির আইনি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত, অথচ সেই জমিতেই তারা জন্মেছেন, বেড়ে উঠেছেন, পূর্বপুরুষের স্মৃতি মিশে আছে সেই মাটিতে। সমতলেও একই চিত্র। গারো পাহাড়ে বিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে স্থানীয় গারোদের শতবর্ষী বসতভিটা, কৃষিজমি ও বনজ সম্পদ ধ্বংস করা হয়েছে, অথচ সেই বিদ্যুতের আলো পৌঁছাচ্ছে মূলধারার জনগোষ্ঠীর ঘরে, স্থানীয়দের কাছে নয়। যারা সবকিছু হারালেন, তারাই থেকে গেলেন অন্ধকারে। উন্নয়নের সুফল সবসময় সবচেয়ে কম ত্যাগ স্বীকারকারীদের কাছেই পৌঁছায়, কারণ প্রকল্পের কোনও ধাপেই স্থানীয় আদিবাসীদের মতামত নেওয়ার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তাদের সম্মতি ছাড়াই তাদের ভিটেমাটি উন্নয়নের বলি হয়, আর রাষ্ট্র সেই বলিদানকে অগ্রগতির নাম দেয়।
আগামী ৯ আগস্ট আবারও উদযাপিত হবে বিশ্ব আদিবাসী দিবস। কিছু সভা হবে, কিছু বক্তৃতা হবে, পত্রিকায় দু-চারটি প্রতিবেদন ছাপা হবে। কিন্তু বাকি তিনশো চৌষট্টি দিন নিগৃহীত আদিবাসীদের কথা মনে রাখার প্রয়োজন কেউ বোধ করেন না। কল্পনা চাকমা আর আলফ্রেড সরেনের মতো অগণিত মানুষের ত্যাগ ও রক্তের কথা একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় মিলিয়ে যায়। এই উদাসীনতা যতদিন না ভাঙবে, ততদিন পরিবর্তনের কোনও সত্যিকারের সূচনা হবে না। সংবিধানে আদিবাসীদের স্বীকৃতি দিতে হবে, তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথ খুলে দিতে হবে এবং পাঠ্যক্রমে তাদের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেন নতুন প্রজন্ম তাদের প্রতি সম্মান ও দায়বদ্ধতা নিয়ে বেড়ে ওঠে। এগুলো আর কেবল আবেদন নয়, একটি মানবিক ও ন্যায়সংগত রাষ্ট্রের অনিবার্য দায়িত্ব।
লেখক: বিশ্লেষক ও প্রাবন্ধিক




