২ বছর পর জুলাই অভ্যুত্থানকে সরকার কেন ‘বিপ্লব’ বলে অভিহিত করলো? 

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা যে আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলো—সেটি অভ্যুত্থান নাকি বিপ্লব? শুরু থেকেই শব্দের এই মারপ্যাঁচ থাকলেও এবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতির কারণে বিতর্কটি নতুন করে সামনে এসেছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয়বার্ষিকীর দিনে, গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার প্রতিবাদে এদিন রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো বিবৃতিতে লেখা হয়েছে– ‘‘On a day when the people of Bangladesh are observing the second anniversary of the July Revolution, this interaction by Sheikh Hasina on the Indian soil stands as an affront to the sovereignty of Bangladesh and a grievous insult to the martyrs of the July Revolution.’’

অর্থাৎ বিজ্ঞপ্তিতে জুলাই আন্দোলনকে সরাসরি Revolution বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ শুরু থেকে এই আন্দোলনকে অভ্যুত্থান হিসেবেই উল্লেখ করা হতো। এমনকি ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক ঐকমত্যের দলিল হিসেবে যে জুলাই জাতীয় সনদ সই করা হয়, সেখানেও লেখা হয়েছে—‘‘১৬ বছরের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়।’’ অর্থাৎ জুলাই সনদেও জুলাই আন্দোলনকে অভ্যুত্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপ্লব নয়।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির পক্ষে যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়, সেখানেও লেখা হয়েছে—‘‘যেহেতু সুদীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার সফল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটিয়েছে…।’’ এখানেও বলা হয়েছে অভ্যুত্থান। বিপ্লব নয়।

প্রশ্ন হলো, জুলাই আন্দোলন বা অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে কেন অভ্যুত্থান বা ইংরেজিতে আপরাইজিং না লিখে সরাসরি Revolution বা বিপ্লব লেখা হলো? তাছাড়া এই বিবৃতিতে উল্লিখিত কিছু শব্দ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা শুরু হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত বিবৃতিকে কয়েকবার সম্পাদনাও করা হয়। প্রশ্ন হলো, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত একটি বিবৃতি— যে বিবৃতির প্রধান লক্ষ্যবস্তু প্রতিবেশী দেশ ভারত, সেটি লিখতে গিয়ে কি যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি, নাকি অতিমাত্রায় তাড়াহুড়া করা হয়েছে? নাকি অতি উৎসাহী কোনও কর্মকর্তা এটি লিখেছেন এবং দায়িত্বশীলদের নজরে আসার পরে সেটি সংশোধন করা হয়েছে? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে এই কর্মকর্তাকে নিয়োগ ও পদায়নের আগে কি যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা হয়েছে? কেননা, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও রাষ্ট্রীয় ডকুমেন্টে যে আন্দোলনকে বিপ্লব লেখা হয়নি, সেখানে একটি নির্বাচিত সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় ডকুমেন্টে কেন বিপ্লব লেখা হলো, বা কাদের উদ্যোগে বা পরামর্শে এটি করা হলো—সেই প্রশ্নটি অনেকের মনে আছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা যে আন্দোলনটি সরকার পতনের একদফায় রূপ নিলো এবং সরকারের পতন হলো—সেটি কি বিপ্লব?

সাধারণ অর্থে বিপ্লব বলতে বুঝায় একটি সরকার ও ব্যবস্থাকে বলপূর্বক উচ্ছেদ করে নতুন সরকার-ব্যবস্থা কায়েম করা। অর্থাৎ বিপ্লব মানে আমূল পরিবর্তন। মার্কসবাদ অনুযায়ী বিপ্লব হলো—এক শ্রেণিকে উৎখাত করে অপর শ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা দখল। যেমন- বুর্জোয়াদের উৎখাত করে সর্বহারা শ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা দখল। মার্কসবাদী বিপ্লবের বস্তুগত ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি দীর্ঘদিনের হলেও ক্ষমতা দখলের ব্যাপারটি ঘটে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এবং আকস্মিকভাবে। তবে এটা ঠিক যে, ক্ষমতার পরিবর্তনকে বলা হয় বিপ্লবের প্রথম ধাপ। এরপর শুরু হয় বিপ্লবের কঠিনতর পর্যায়, অর্থাৎ সমাজব্যবস্থা পাল্টানোর কাজ। বিপ্লব সম্পন্ন করা এবং বিপ্লবের কাজ সম্পূর্ণ করা এক নয়।

শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের তত্ত্বে বিশ্বাসীরা মনে করেন, একটা শত্রু-সরকার ও ব্যবস্থাকে শান্তিপূর্ণ উপায়েও অপসারণ করা যায়—যদি ব্যাপক জনগণ ওই বিপ্লবের পক্ষে থাকে। তাদের মতে, রক্তপাত ও যুদ্ধে না গিয়ে সঠিক কর্মপদ্ধতির মাধ্যমেও একটি ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। এই মতবাদে বিশ্বাসীরা শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের উদাহরণ হিসেবে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোয় আর্থ-সামাজিক আমূল পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন।

অভ্যুত্থান বা Uprising বলতে বোঝায় সাধারণত কোনও শাসক, সরকার বা প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বৃহৎ আকারের জনবিদ্রোহ, গণআন্দোলন বা আকস্মিক রাজনৈতিক বিস্ফোরণ। অভ্যুত্থানের ফলে সরকারের পতন হতে পারে, কিন্তু তার ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় আর কোনও মৌলিক পরিবর্তন নাও হতে পারে। অর্থাৎ একটি সরকার পতনের সাধারণ আন্দোলনে ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সেটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলেও সেটি বিপ্লব নাও হতে পারে— যদি না সেখানে একটি বড় কর্মপদ্ধতি থাকে। সহজ ভাষায় অভ্যুত্থান হলো ক্ষমতাসীন কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিস্ফোরণ আর বিপ্লব হচ্ছে সেই সংঘাতের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজের মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন।

২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ডেইলি স্টারকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে সংবিধান সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলী রীয়াজও বলেছিলেন, এটি গণঅভ্যুত্থান, গণমানুষের অভ্যুত্থান। গণঅভ্যুত্থান এই কারণে যে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে স্বৈরাচারকে হটানো হয়েছে। আর বিপ্লব বলা যায় না এ কারণে যে বিপ্লবের পর নেতৃত্বদানকারীরা সরকার গঠন করে। এক্ষেত্রে তা হয়নি। আলী রায়ীজ বলেন, তিনি এটিকে দ্বিতীয় স্বাধীনতাও বলবেন না। কারণ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

জুলাই আন্দোলনকে বিপ্লব বলা যায় না এই কারণে যে এর মধ্য দিয়ে সরকার পতনের বাইরে সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোয় আর কোনও কিছুরই পরিবর্তন ঘটেনি। সংবিধান, রাষ্ট্রব্যবস্থার সাংবিধানিক কাঠামো, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও কোনও পরিবর্তন আসেনি। তবে পরিবর্তনের দাবি আছে।

এটা ঠিক কোনও আন্দোলনের দিনেই সেটিকে ‘বিপ্লব’ বলে অভিহিত করার চেয়ে ইতিহাসের বিচারে দেখা হয় যে এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র, সমাজ ও ক্ষমতার কাঠামো মৌলিকভাবে কতটা বদলে গেলো। যদি ক্ষমতার পরিবর্তন ছাড়া আর কোনও মৌলিক পরিবর্তন না হয়, তাহলে সেটিকে বিপ্লব বলার সুযোগ নেই। সুতরাং, জুলাই আন্দোলনটি আপাতত গণঅভ্যুত্থান হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হলেও এটিকে বিপ্লব বলা যাবে কিনা, সেজন্য আরও অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ এই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় যদি সত্যিই রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তন আসে—তখনই এটিকে বিপ্লব বলে অভিহিত করা যাবে। তার আগে নয়।

চব্বিশের জুলাইয়ে যে আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের মতো একটি সাধারণ দাবিতে, সেটি একপর্যায়ে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে রূপ নেয় এবং ‘বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার স্লোগানটি মুখ্য হয়ে ওঠে। বলা হয়, এর মধ্য দিয়ে একটি বৈপ্লবিক পরিস্থিতি বা বিপ্লবের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেটি পরিণতি লাভ করেনি বা সেই সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটেছে। ফলে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে দেশ একটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা শুরু করতে পেরেছে, নাকি আরও বড় সংকটের ভেতরে ঢুকে গেলো—সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে আরও অপেক্ষা করতে হবে এবং সেই ফলাফলের ওপরেই নির্ভর করবে জুলাইয়ের এই আন্দোলনটি নিছকই একটি সরকার পতনের আন্দোলন ছিল, নাকি এটি আসলে বিপ্লব— যেটি বেহাত হয়ে গেছে বলে অনেকে মনে করেন।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক