জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন কৌশল: আমদানি-নির্ভরতা থেকে বহুমুখী প্রস্তুতি

বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, জ্বালানি নিরাপত্তাকে কেবল উৎপাদন বাড়ানোর প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না। উৎপাদন, আমদানি, অবকাঠামো, বৈদেশিক মুদ্রা, মজুত, পরিবহন, প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি—সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে পরিস্থিতি আবারও সেই প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। ১৩ আগস্ট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হয়, আর ১৪ আগস্ট সামিটের এলএনজি টার্মিনালে সাময়িক বিঘ্ন নতুন করে সরবরাহব্যবস্থার ভঙ্গুরতা প্রকাশ করে।

বাংলাদেশের জন্য প্রথম শিক্ষা হলো, সস্তা দেশীয় গ্যাসের যুগ শেষের দিকে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে। একই সঙ্গে সরকার দেশীয় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য শক্তি, এলএনজি অবকাঠামো এবং অন্যান্য উৎস সম্প্রসারণের কথা বলছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কৌশল হতে হবে আমদানি বন্ধ করা নয়, আমদানির ঝুঁকি কমানো এবং দেশীয় উৎসের ব্যবহার যতটা সম্ভব বাড়ানো।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান তাই জাতীয় অগ্রাধিকারে থাকতে হবে। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেশীয় ক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত হচ্ছে, যেখানে চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট। সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। জুলাইয়ে বাপেক্সের মাধ্যমে বেগমগঞ্জ ও সুনেত্র এলাকায় তিনটি কূপ খননের জন্য প্রায় ৭২৯ কোটি টাকার প্রকল্পের কথাও সামনে এসেছে।

এখানে গতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া আর বাণিজ্যিক গ্যাস উৎপাদন শুরু করা এক বিষয় নয়। ভূতাত্ত্বিক জরিপ, সিসমিক সার্ভে, অনুসন্ধান কূপ, মূল্যায়ন, উন্নয়ন কূপ এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস পৌঁছানো পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে আজ অনুসন্ধান শুরু করলে আগামী দিনের সংকট পুরোপুরি সামলানো সম্ভব হবে না। কিন্তু আজ শুরু না করলে আগামী দশকের সংকট আরও গভীর হবে।

সমুদ্রাঞ্চলও এই পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশ হওয়া প্রয়োজন। ২০২৬-২৭ সালের বাজেট পরিকল্পনায় অনশোর ও অফশোর অনুসন্ধান জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। নতুন অফশোর বিডিং রাউন্ডে অগভীর ও গভীর সমুদ্রের ব্লক আন্তর্জাতিক কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাপেক্সের অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়াতে নতুন দুটি আধুনিক ড্রিলিং রিগ সংগ্রহের উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে।

তবে দেশীয় গ্যাসই একমাত্র সমাধান নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি মিশ্রণে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ু, আঞ্চলিক জলবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ আমদানি এবং শক্তি দক্ষতার ভূমিকা বাড়াতে হবে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য জানিয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও গুদামের ছাদকে উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ করা যেতে পারে।

আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিনিময় আরও স্থিতিশীল করার পাশাপাশি নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ আঞ্চলিক গ্রিডের মাধ্যমে আনার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। এতে বাংলাদেশকে সব সময় জ্বালানি আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উৎস থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে। জ্বালানি নিরাপত্তার মূল দর্শনই হলো একক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।

এলএনজি ব্যবস্থাপনাতেও মৌলিক পরিবর্তন দরকার। ২০২৬ সালে কাতার থেকে বাংলাদেশের নির্ধারিত সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে যাওয়ার পর দেশকে স্পট মার্কেট ও বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে যেতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থির সময়ে স্পট কার্গোর দাম দ্রুত বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, মধ্যমেয়াদি সরবরাহ এবং সীমিত স্পট ক্রয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে উৎসের বৈচিত্র্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাতার ও ওমানের ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা ও অন্যান্য সম্ভাব্য সরবরাহকারীর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ খুঁজতে হবে। কাতারএনার্জি নিজেই হরমুজ সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহকারী দেশগুলো যখন নিজেদের ঝুঁকি কমাতে উৎস পরিবর্তন করছে, বাংলাদেশও একইভাবে নমনীয় ক্রয়নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য।

এফএসআরইউ ব্যবস্থাপনাও নতুন করে ভাবতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মোট সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু জুলাইয়ে এক্সিলারেটের টার্মিনাল অচল হওয়ার পর প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ কমে যায়। আগস্টে সামিটের টার্মিনালেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সরবরাহ বন্ধ হয়। এই ঘটনা দেখিয়েছে, আমদানি সক্ষমতা বাড়ালেই নিরাপত্তা বাড়ে না; টার্মিনালের নির্ভরযোগ্যতা, রক্ষণাবেক্ষণ, পাইপলাইন সক্ষমতা ও বিকল্প ব্যবস্থা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার এখন নতুন এফএসআরইউ ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল সম্প্রসারণের কথা ভাবছে। জুলাইয়ে মহেশখালীতে নতুন এফএসআরইউ এবং মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক টার্মিনালের পরিকল্পনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। আবার সরকার জি-টু-জি পদ্ধতিতে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য বিদেশি রাষ্ট্রীয় কোম্পানির কাছ থেকে প্রস্তাবও চেয়েছে। কিন্তু নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগে অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, ব্যবহারযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি।

জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি স্তম্ভ কৌশলগত মজুত। তেল ও ডিজেলের ক্ষেত্রে মজুত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। আন্তর্জাতিক সরবরাহপথে সাময়িক বিঘ্ন ঘটলেও যেন দেশ কয়েক সপ্তাহের চাহিদা সামাল দিতে পারে, সেই সক্ষমতা প্রয়োজন। এলএনজির ক্ষেত্রে বড় মজুত প্রযুক্তিগতভাবে জটিল হলেও বিকল্প কার্গো, নমনীয় চুক্তি এবং জরুরি ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিত করা যায়।

বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও সংস্কারের অংশ হতে হবে। বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির অর্থায়ন ও সরবরাহ নিরাপত্তা বাড়াতে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। এই সহায়তার লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানিতে আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যয়বহুল স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমানো। অর্থাৎ জ্বালানি নিরাপত্তা এখন কেবল জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনারও প্রশ্ন।

একই সঙ্গে শক্তি দক্ষতা জাতীয় নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। শিল্পে দক্ষ যন্ত্রপাতি, সরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ, শক্তি সাশ্রয়ী আলো, উন্নত শীতাতপ ব্যবস্থা এবং সময়ভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ানো গেলে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কমবে। একই উৎপাদন কম বিদ্যুৎ দিয়ে সম্ভব হলে আমদানিকৃত জ্বালানির প্রয়োজনও কমে।

সংকটের সময়ে ন্যায্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতাল, পানি সরবরাহ, সেচ, খাদ্য সংরক্ষণ, গণপরিবহন ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে। লোডশেডিং হলে সময়সূচি আগাম জানাতে হবে। ১৪ আগস্ট ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার খবর প্রকাশিত হওয়া দেখিয়ে দিয়েছে, সংকট আর শুধু গ্রামীণ অঞ্চলের সমস্যা নেই।

সবশেষে প্রয়োজন ১৫ থেকে ২০ বছরের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নীতি। তাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য, কৌশলগত মজুত, টার্মিনাল সক্ষমতা ও শক্তি দক্ষতার নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে। সরকার বদলালেও মূল কৌশল যেন অকারণে বদলে না যায়।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা তাই আরও কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কিংবা আরও এলএনজি কেনার নাম নয়। নিরাপত্তা আসবে উৎসের বৈচিত্র্য, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো, দেশীয় অনুসন্ধান, সুশৃঙ্খল অর্থায়ন, কৌশলগত মজুত এবং দক্ষ ব্যবহারের সমন্বয়ে। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না; কিন্তু সেই পরিস্থিতির অভিঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা পৌঁছাবে, তা অনেকাংশে বাংলাদেশের নিজের প্রস্তুতি নির্ধারণ করবে। বর্তমান সংকট তাই কেবল অন্ধকারের সময় নয়, ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নির্মাণেরও সুযোগ।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়