বাংলাদেশে কি সশস্ত্র জঙ্গিবাদ পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে? সাম্প্রতিক কিছু খবর এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। দুবছর আগে গণঅভ্যুত্থানের সময় জেল থেকে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী পালিয়ে যাওয়া এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছু জঙ্গির কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর জঙ্গিবাদের পুনরুত্থান নিয়ে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হতে যাচ্ছে কি না, সেটাই এখন আলোচনার বিষয়।
পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠতে পারে, এরকম আভাস পাওয়া যাচ্ছিল জুলাই মাসের শুরুর দিকে, যখন দেশের বিভন্ন স্থানে হঠাৎ করেই আরবি হরফে কলেমা (ইসলামের মূল ভিত্তি এবং বিশ্বাসের প্রকাশ) লেখা পতাকা উড়তে দেখা যায়। কিছু শহরে কলেমা লেখা পতাকা হাতে নিয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে ইসলামপন্থিদের মিছিল করতে দেখা যায়।
এই পতাকার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সম্পৃক্ততাই ছিল উদ্বেগের মূল কারণ। ইসলামি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আল-কায়েদা এবং আফগানিস্তানের কট্টরপন্থী সশস্ত্র ইসলামি দল, তালেবান সাদা কাপড়ে কলেমা লেখা এই পতাকা ব্যবহার করে। আরেকটি অত্যন্ত নৃশংস ইসলামি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, যারা ইসলামিক স্টেট বা আইসিস নামে পরিচিত, তাদের পতাকাতেও কলেমা লেখা আছে। তবে তারা কালো কাপড়ে সাদা অক্ষরে, ভিন্ন নকশায় (ফন্টে) কালিমা লিখেছে।
পতাকা নিয়ে উদ্বেগ কাটতে না কাটতেই, বড় রকমের একটি ঘটনা জঙ্গিবাদের পুনরুত্থানের ‘প্রমাণ’ নিয়ে হাজির হয়েছে। চলতি মাসের ১২ তারিখ ঢাকার অদূরে সাভারে এক অভিযান চালিয়ে পুলিশ বেশ কিছু বোমা এবং বোমা বানানোর সরঞ্জাম উদ্ধার করে। একটা বড় আকারের বোমা পরের দিন ধ্বংস করা হয়। এখানে উদ্বেগের বিষয় হলো, পুলিশ যাদের গ্রেফতার করেছে এবং যাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস-বিরোধী আইনে মামলা করা হয়েছে, তাদের নব্য-জেএমবির (জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) সদস্য বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
আল-কায়েদার ছায়া
সাভারের ঘটনা এবং অন্যান্য বিস্ফোরণের জন্য পুলিশ যে নাজমুল হাসান ওরফে ‘বোমারু’ মামুনকে খুঁজছে, তাকে ৯ বছর আগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে চলতি বছর জানুয়ারিতে আদালত ২০১৭ সালের এক বিস্ফোরণের মামলা থেকে তাকে বেকসুর খালাস দেয়। রায়ে মামুনকে ‘ফ্যাসিবাদ-বিরোধী কর্মী’ বলেও আখ্যায়িত করা হয় বলে গণমাধ্যমে বলা হয়েছে।
এরই মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক রিপোর্টে হুশিয়ারি দেওয়া হয় যে, আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা ‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ বা ‘একিউআইএস’ বাংলাদেশে তৎপরতা বাড়িয়েছে। গত বছর ৬ ডিসেম্বর থেকে চলতি ২০২৬ সালের ৯ জুন পর্যন্ত সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি রিপোর্টে বলা হয় যে, একিউআইএ সক্রিয় সেল-এর ভিত্তিতে বাংলাদেশে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এই রিপোর্ট প্রকাশ করার দুদিন পরেই সাভারে নব্য-জেএমবির একটি সেল উন্মোচন করে অস্ত্র উদ্ধার করা হলো।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উপস্থিতি এবং তাদের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে সব সময়ই বিতর্ক ছিল, বিশেষ করে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ-এর শাসনামলে। পুলিশ এবং র্যাব-এর জঙ্গিবাদ-বিরোধী অভিযানকে বিতর্কিত করার জন্য কিছু মহল থেকে এমনও অভিযোগ তোলা হতো যে, সরকার সন্ত্রাস মোকাবিলা করার কথা বললেও, তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিরোধীদল দমন। এমনকি ২০১৩ সাল থেকে শুরু হওয়া ব্লগার হত্যাকাণ্ড যে জঙ্গিদের কাজ, তা নিয়েও সন্দেহের ধুম্রজাল সৃষ্টি করা হতো।
হোলি আর্টিজান-এর ইতিহাস
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকার জঙ্গি তৎপরতাকে শুধু ‘অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস’ বলে অভিহিত করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা বিভিন্ন সময়ে দেশীয় জঙ্গিদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বিশেষ করে আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেট-এর সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে। কিন্তু ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় দুজন সিনিয়র পুলিশ অফিসারসহ ২৪ জন নিহত হওয়ার পর বিদেশি সম্পৃক্ততা স্পষ্ট হয়ে যায়।
হোলি আর্টিজান বেকারি সংলগ্ন ‘ও কিচেন’ রেস্টুরেন্টের ভেতরে মেঝেতে পড়ে থাকা রক্তাক্ত লাশের ছবি প্রথমে ইসলামিক স্টেট-এর সংবাদ মাধ্যম ‘আমাক’ সোশাল মিডিয়া টুইটার-এর মাধ্যমে প্রকাশ করে। সেনাবাহিনীর অভিযানে পাঁচজন সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার পর, তাদের অস্ত্র হাতে, মাথায় কিফিয়ে পরা হাস্যোজ্জ্বল ছবি আমাক-ই প্রথম প্রকাশ করে। দেখে বোঝা যায়, সন্ত্রাসীরা অভিযানে যাওয়ার আগে নিজেদের ছবি আমাকের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল।
সরকার সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ সঙ্গে জড়িত হয়ে যাওয়ার ভয়ে দেশের জঙ্গি তৎপরতাকে শুধু ‘অভ্যন্তরীণ’ বলে প্রচার করার চেষ্টা করতো। হোলি আর্টিজান ঘটনার পর পুলিশ এবং র্যাব-এর ব্যাপক অভিযানে দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের হত্যা এবং আটকের ঘটনা ঘটেছে। এই অভিযানের ফলে হোলি আর্টিজান-এর পর দেশে বড় আকারের কোনও আক্রমণ হয়নি। তবে এর জন্য পুলিশ বা র্যাব খুব একটা প্রশংসা পায়নি, মূলত জঙ্গি মোকাবিলার নামে ‘বিরোধীমত দমনের’ প্রচারণার ফলে।
দুবছর আগের গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন দেয়ালে ‘জঙ্গি নাটক’ লেখা থাকতে দেখা গেছে। অর্থাৎ, সন্ত্রাস-বিরোধী অভিযানকে নিছক একটা নাটক বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা দৃশ্যমান হয়। হোলি আর্টিজান হামলায় নিহত দুই অফিসার-এর স্মরণে গুলশান থানার সামনে স্থাপিত ভাস্কর্য ভেঙে দেওয়া হয়, যা আজও পুনর্নির্মাণ করা হয় নাই। এমনকি ঢাকায় ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের অফিসের ফটক থেকে শহিদ এসি রবিউল করিম-এর নামও সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
হামলার এক দশক পূর্তি উপলক্ষে ইতালি দূতাবাসে একটি অনুষ্ঠান করা হয়, যেহেতু নিহতদের অনেকেই ইতালির নাগরিক ছিলেন; কিন্তু বাংলাদেশ সরকার, এমনকি পুলিশ কর্তৃপক্ষের কোনও স্মরণ সভা চোখে পরেনি। ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হয়, ২০২৪-পরবর্তী ক্ষমতাসীনরা বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার গুরুত্ব শুধু কমাতে চাইছে তাই না, এমনকি হামলায় নিহত পুলিশ অফিসারদের স্মৃতিও মুছে ফেলতে চাইছে।
‘বাংলা ভাই’ আর ‘শায়েখ আব্দুর রহমান’
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে ইসলামপন্থি দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় নানান উগ্রবাদী গোষ্ঠী রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে চলে আসে। নতুন এই ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা বিগত বছরগুলোর জঙ্গি তৎপরতা অপরাধের খাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে - যার প্রমাণ হোলি আর্টিজান ঘটনার পরিণাম। একইসঙ্গে তাদের প্রোপাগান্ডা আওয়ামী লীগ সরকারের সন্ত্রাস-বিরোধী কার্যকলাপকে বিরোধী মত দমন হিসেবে তুলে ধরে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার নীরবতার মাধ্যমে তাদের তৈরি নতুন বয়ানকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে।
এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, বর্তমান বিশ্বে ‘সন্ত্রাস’ বলতে যা বোঝায়, বাংলাদেশে তার শুরু হয়েছিল বিএনপির আরেক আমলে। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় জেএমবি-এর তৎপরতা প্রকাশ পেতে থাকে। ‘বাংলা ভাই’ নামে পরিচিত উগ্রপন্থী নেতা উত্তরাঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। শায়েখ আব্দুর রহমান নামে আরেকজন জঙ্গিনেতা কুখ্যাতি অর্জন করে।
ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকারও জঙ্গি তৎপরতা দমনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে মনে হয় না। যেসব জঙ্গি ২০২৪ সালে জেল থেকে পালিয়েছে, তাদের ধরার ওপর কোন জোর দেওয়া হচ্ছে না, বা আদালতের মাধ্যমে মুক্তিপ্রাপ্ত জঙ্গিনেতাদের পুনরায় হেফাজতে নেওয়ার কোনও প্রক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
সাভারের ঘটনা এবং নিরাপত্তা পরিষদের হুঁশিয়ারি, এই দুটো মিলে যে চিত্র উঠে আসছে, তাতে সরকারের পক্ষে ‘জঙ্গি নাটক’ লাইন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। শুধু কঠিন নয়, জঙ্গিবাদের পুনরুত্থানের আশঙ্কা উপেক্ষা করলে সরকার দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে।
সরকারের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
উগ্রবাদীদের প্রতি ইউনূস সরকারের আপোষকামী নীতির কারণেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে অবস্থিত ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর’ ধ্বংস করা হয়, যে ভবনে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়; ইউনূস সরকার উগ্রবাদীদের প্রশ্রয় দিয়েছিল বলেই তারা প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টার প্রত্রিকা অফিসে ভাংচুর চালিয়ে, আগুন দিয়ে নাগালের বাইরে থেকে গেলো।
জনসাধারণকে নানা কৌশলে বোঝানো হয় যে, ইসলামি রাজনীতির অনুসারীরা এত দিন নির্যাতিত ছিল বলেই তারা সন্ত্রাসের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল। তাদের রাজনীতির মূলধারায় আসতে দিলেই তারা সুবোধ বালকের মতো নিয়মতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ কার্যক্রমে ফিরে যাবে বলে প্রচারণা চালানো হয়।
কিন্তু যাদের মতাদর্শই হচ্ছে চরম উগ্রপন্থী, যেখানে ভিন্নমতের কোনও স্থান নেই, যেখানে সহনশীলতা বলে কোনও মূল্যবোধ নেই, সেই মতাদর্শ রাজনীতির যে ধারায়ই থাকুক না কেন; তার লক্ষ্যই থাকবে সমাজে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। সন্ত্রাস এখানে একটি প্রাথমিক পর্যায় মাত্র। সাভারের ঘটনা এবং নিরাপত্তা পরিষদের আশঙ্কা প্রমাণ করে যে, উগ্রবাদকে রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে গ্রহণ করার মানে এই না যে সন্ত্রাস দূর হয়ে যাবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কি স্বীকার করবে যে দেশে আসলেই জঙ্গিবাদের পুনরুত্থানের আশঙ্কা রয়েছে, এবং তা প্রতিহতের জন্য কিছু কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন? কঠিন, কারণ উগ্রবাদকে নরমালাইজ করা বা তাদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ থেকে চোখ ঘুরিয়ে নেওয়ার যে নীতি ইউনূস আমল থেকে চলে আসছে, সেটায় এখন আমূল সংস্কার প্রয়োজন।
লেখক: সাংবাদিক এবং পডকাস্টার
যোগাযোগ: [email protected]
X handle: @Sabir59




