সাধারণ আলোচনায় যাওয়ার আগে আমরা এপিআই জগৎটা ঘুরে আসি। অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেসকে সংক্ষেপে এপিআই বলে। এটা এমন একটি প্রোটোকলের সামষ্টিক বা গুচ্ছসেবা— যা একাধিক সফটওয়্যার বা কম্পিউটার সিস্টেমকে পারস্পরিক বন্ধনে সহায়তা করে। সহজ কথায় একাধিক সফটওয়্যার ব্যবহারকারী একে অপরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন, তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। এই এপিআই সিস্টেম বহুবিধ কোম্পানির সফটওয়্যার ব্যবহারকারীদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি কাজ করে।
মজার খবর হলো, আমাদের দেশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই এপিআই সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে। তা নিয়ে আমাদের করদাতাদের মধ্যে নানান ধরনের আলোচনা, উৎকণ্ঠা বা উদ্বেগ কাজ করছে। ব্যক্তিগত তথ্য অন্যের হাতে চলে যায় কিনা, বা গোপনীয় কিছু তথ্য প্রকাশ হয়ে যায় কিনা ইত্যাদি। এটা স্বাভাবিক। করদাতাদের ভাবনা একেবারে অমূলক নয়। যা ভাবনায় রয়েছে, তা ঘটতেও পারে। তবে সতর্ক থাকতে হবে এর ব্যবহারকারীকে। আমাদের নতুন কিছু পেতে হলে ঝুঁকিও গ্রহণ করতে হবে। ঝুঁকি না নিলে আমরা প্রযুক্তির ব্যবহারে পিছিয়ে পড়বো, যার নেতিবাচক দিক অনেক।
এখন আসি নতুন এই এপিআই সিস্টেম কোন কোন দেশে ব্যবহার হয়, এর চ্যালেঞ্জগুলো কী, সুবিধা কী, না করলে কী হবে?
এপিআই কোন কোন দেশে ব্যবহার করা হয়
প্রযুক্তির ব্যবহারের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৬৪ সালে যুক্ত রাষ্ট্রের আইবিএম কোম্পানি সর্ব প্রথম তাদের সিস্টেমে এপিআই ধারণার প্রবর্তন করে। পরে মার্কিন প্রতিষ্ঠান সেলসফোর্স ইন্টারনেটে এপিআই সিস্টেম চালু করে। বর্তমানে বিশ্বের প্রযুক্তি নির্ভর প্রায় সব দেশেই এপিআই সিস্টেম চালু রয়েছে। তবে রাজস্ব খাতে এপিআই চালুর ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম ইউরোপিয়ান দেশগুলো শীর্ষে। চিলি ও স্পেনও উল্লেখযোগ্য। পরে ভারত ও সিঙ্গাপুর তাদের রাজস্ব খাতে এপিআই সিস্টেম চালু করে।
রাজস্ব খাতে এপিআই ব্যবহারের সুবিধা কী
রাজস্ব খাতে এপিআই সিস্টেমের মাধ্যমে সরকার, করদাতা ও কর ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে। কর ব্যবস্থাপনার গতিশীলতা আনয়নে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক কর-ব্যবস্থাপনা তৈরির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিসরে এই সিস্টেম অবদান রাখতে পারে। এর ফলে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ইআরপি বা অ্যাকাইটং সিস্টেম সরাসরি রাজস্ব বিভাগের পোর্টালের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনভয়েসিং, করদাতার রিটার্ন ফরমে আর্থিক ডেটা সংযুক্তকরণ ও রিয়েল টাইম ডেটা রিকনসিলেশন কাজ করতে পারে।
এছাড়া নিম্ন বর্ণিত সুবিধাগুলোও পাওয়া সম্ভব
ক) সঠিক তথ্য পেতে সহায়তা: অনেক সময় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের তথ্য আদান-প্রদানে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারে না। এপিআই সিস্টেম রাজস্ব পোর্টালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আর্থিক তথ্যাদি সংযুক্ত হওয়ার কারণে যথাযথভাবে সঠিক তথ্য আদান-প্রদানে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে করদাতাদের মধ্যে যারা রাজস্ব বিভাগকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছেন, তাদের পক্ষে নির্ভুল তথ্য প্রদান করতে সহায়ক সেবা পাবেন।
খ) রিয়েল-টাইম ডেটা প্রাপ্তি: কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে করদাতার আর্থিক লেনদেন হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজস্ব বিভাগের পোর্টালে তথ্য চলে আসে। এ কারণে কোনও করদাতা তথ্য গোপন করার সুযোগ থাকবে না। একইভাবে করদাতার সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে আয়কর-রিটার্ন প্রস্তুত হলে ভবিষ্যতে তার অতিরিক্ত ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকবেন।
গ) করফাঁকি হ্রাস: করদাতার ডেটা এপিআই কর্তৃক স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজস্ব বিভাগের পোর্টালে জমা হওয়ার কারণে ইচ্ছা করে কোনও আয় গোপন রাখার সুযোগ থাকবে না। ফলে প্রকৃত আয়ের ওপর প্রদেয় করদায় পরিশোধ করতে করদাতা বাধ্য থাকবেন। যার ফলে করফাঁকি হ্রাস পাবে।
ঘ) দ্রুত অডিট মামলা নিষ্পত্তি সহজ: করদাতার ফাইল অডিট-এ পড়লে সব ডেটা পোর্টালে সংযুক্ত থাকায় অডিট মামলা নিষ্পত্তি করা সহজ হবে।
ঙ) রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পাবে: করদাতাদের সব দেনদেন ও ভূমি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পোর্টালে আপডেট হওয়ার ফলে করদাতার প্রকৃত আয় ও সম্পত্তি পরিবৃদ্ধির তথ্য পাওয়া যাবে। যার ফলে রাজস্ব আহরণ আগের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি হবে।
চ) কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আসবে: স্বয়ংক্রিয় ডেটা থাকায় রাজস্ব ব্যবস্থাপনার গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সরকারকে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। যার ফলে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় রাজস্ব বিভাগের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য সহায়তা বাড়বে এবং রাজস্ব কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
রাজস্ব খাতে এপিআই ব্যবহারের চ্যালেঞ্জ কী
রাজস্ব বিভাগ যেকোনও দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। এই বিভাগের সফলতার ওপর সরকারের সব ধরনের কর্মকাণ্ড গতি প্রকৃতি নির্ভরশীল। তাই রাজস্ব আহরণে সব ধরনের উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে এটাই স্বাভাবিক। একইসঙ্গে নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক, আর্থিক ডেটার সুরক্ষা করাও সরকারের দায়িত্ব। এপিআই সিস্টেম একজন করদাতার আর্থিক, স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তির সব ধরনের ডেটা রাজস্ব বিভাগের পোর্টালের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এই ডেটাগুলোর সুরক্ষার বিষয়ে পদক্ষেপ সম্পর্কে এখনও কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে কিনা, তা জানা নেই।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো, ভারত, সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশে রাজস্ব খাতে এপিআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা গ্রহণ করা হলে এই চ্যালেঞ্জগুলো অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
যে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি
১. অথেনটিকেশন: এপিআই সিস্টেমের সঙ্গে জড়িত সব অংশীজনের পরিচয়, তথ্য নিশ্চিত হওয়া এবং ডেটা সংরক্ষণ করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া। অথরাইজড ব্যক্তি ছাড়া যেন কেউ এই সিস্টেমে প্রবেশ ও ডেটা কপি করতে না পারে, সেই দিকে কঠোর সুরক্ষানীতি অনুসরণ করা। সিস্টেমে প্রবেশ করার জন্য শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহারের দিক নির্দেশনা দেওয়া।
২. ইনপুট ভ্যালিডেশন: অথরাইজড ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ যেন ক্ষতিকর কোড দিয়ে সিস্টেমে প্রবেশ না করতে পারে বা সিস্টেম ক্রাশ হওয়া বা করদাতার ডেটার সঠিক সুরক্ষার জন্য ইনপুট ভেলিডেশন জরুরি। তাই সিস্টেমে সঠিক তথ্য ইনপুট হচ্ছে কিনা বা নির্ধারিত খাতে ও স্থানে নির্ধারিত ডেটা দেওয়া হচ্ছে কিনা, তা অটো যাচাই প্রক্রিয়া থাকা এবং ইনপুট দেওয়া। যাতে করে কেউ ইচ্ছা করে যেমন ভুল তথ্য দিতে পারবে না, তেমনই কোনও হ্যাকার সিস্টেমে প্রবেশ করে তথ্য চুরি করতে পারবে না।
৩. নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা: এপিআই সিস্টেমকে প্রযুক্তিগত মনিটরিং ব্যবস্থার মধ্যে রাখা। যাতে করে পুরো সিস্টেমটির সুরক্ষা করা সম্ভব হয়।
অবশেষে বলতে হবে, কিছুটা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও রাজস্ব ক্ষেত্রে এপিআই সিস্টেমের ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। কারণ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত, সেখানে আমাদের করদাতা, রাজস্ব বিভাগ ও সরকারের নীতি প্রণয়ন ও পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করা না গেলে আমাদের অর্থনৈতিক সূচক উর্ধ্বমুখী করা কঠিন হবে। প্রযুক্তির ব্যবহারে ঝুঁকির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক সম্ভাবনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা জরুরি। এই উদ্যোগগুলোর বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপও গ্রহণ জরুরি।
লেখক: আইনজীবী
republiclawchamber@gmail.com