পিংক বাসগুলো নারীর, অন্য সব বাস কি তবে পুরুষের 

নারীর জন্য নির্ধারিত গোলাপি বাস চালু হওয়ার পরদিন থেকেই কয়েকটি টিভি চ্যানেল, বিশেষ করে ইউটিউবারদের করা ভিডিওগুলো দেখে অবাক হয়েছি। এই বাস সার্ভিস দেওয়াটা ভালো না মন্দ, বা প্রয়োজনীয় না অপ্রয়োজনীয়, এই বিচারের চেয়েও বড় হয়ে এসেছে নারীকে কতটা হাস্যকর ও ছোট করে উপস্থাপন করা যায়, এই দিকটি।

গোলাপি বাস ইস্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীকে খাটো করে বেশিরভাগ মন্তব্য দেখা যাচ্ছে। এগুলোকে লিঙ্গভিত্তিক অপমানও বলা যায়। বারবার নারীর প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য, কটূক্তি বা মৌখিক আক্রমণ করা হচ্ছে। ঘুরেফিরে ভিডিওগুলোর উদ্দেশ্য যেন একটাই— গোলাপি বাসের চালক কতটা অদক্ষ, এইটা দেখানো। তারা বারবার নারী চালকদের ইন্টারভিউ নিচ্ছেন, তাদের চালানোর কৌশল ভিডিও করছেন, কখন কোন গাড়ি এসে ধাক্কা দিচ্ছে বা গোলাপি বাস কোন রিকশাকে ধাক্কা দিচ্ছে এটা দেখানো।

সর্বোপরি নারী চালকের সঙ্গে একজন পুরুষ সহযোগী রাখার বিষয়টিকে তুলে ধরছেন খুব নেতিবাচকভাবে। তারা দেখাতে চাইছেন নারী চালককে গাইড করার জন্য সেই পুরুষ চালকেরই দরকার হচ্ছে। এখন আলোচ্য বিষয় দুটি—এক. বাস, ট্রাক, গাড়ি, মোটরসাইকেল, টেসলা ও রিকশা চালনাকারী পুরুষরা চালকরা আসলে কতটা ‘দক্ষ’? বছরের পর বছর ধরে তাদের বেশিরভাগেরই বেপরোয়া গাড়ি চালনার প্রত্যক্ষদর্শী আমরা সবাই।

ধরে নিলাম পুরুষ চালক সবাই দক্ষ, তাহলে ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি থেকে জুলাই) বাংলাদেশে ৪৯১০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলো কীভাবে? একই সময়ে ৩,২৫৭ জন নিহত হলো কেমন করে? এই পরিবহনগুলোর চালক সবাই পুরুষ, নারী নয়।

অনেকে অলরেডি ফতোয়া দেওয়া শুরু করেছেন যে ভারি গাড়ি চালানো নারীর কাজ নয়। তারা হয়তো জানেন না বিশ্বের বহু দেশে বড় লরি, ট্রাক ও বাস নারীরা অবলীলায় চালাচ্ছেন বহু বছর যাবৎ। কাজেই এসব ফতোয়ার কোনও মূল্য নাই।

বড় গাড়ি চালানো নারীর কাজ নয়, এটা প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন একশ্রেণির মিডিয়া ও পুরুষ ইউটিউবার? দ্বিতল বাস, বাস ও ট্রাক চালানোর জন্য বিশেষ ট্রেনিং ও দক্ষতার দরকার হয়, তাই প্রথম অবস্থায় নারী চালকদের সহায়তা করার জন্য পুরুষ চালককে দেওয়া হয়েছে। এর মানে এই নয় যে ঢাকার রাস্তায় নারী চালকরা গাড়ি চালাতে অক্ষম।

দুই. এটাও ঠিক যে চালক পুরুষ বা নারী, যেই হোন না কেন, ভারী গাড়ি চালানোর জন্য বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন আছে। বিষয়টা ‘আমি নারী, আমিই সব পারির’ মতো নয়। ঢাকার ভাঙা রাস্তা, বাজে ট্রাফিক, নানা রকমের গাড়ির উদ্ভ্রান্ত চলাচলকে সয়ে নিয়ে নিরাপদে বাস চালানোটা সত্যিই কঠিন। এর ওপর আছে টানা বাসে বসে থাকা, টয়লেটের কোনও বন্দোবস্ত না থাকা, খিস্তি-খেউর, নারীবিদ্বেষী কিছু মানুষের আক্রমণ।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, খুব তাড়াহুড়ো করে ট্রেনিং দিয়ে নারী চালকদের হাতে স্টিয়ারিং তুলে দেওয়া হয়েছে। দেশের অন্যান্য জেলা থেকে আগত চালকরা নিজেরাই বলছেন, ঢাকা শহরের রাস্তা তারা চেনেন না। একজন বললেন, জিপিএস ফলো করতে পারেন না। অথচ কথা শুনে মনে হলো, ওনারা শিক্ষিত, ম্যাচিউরড এবং স্মার্ট। তাহলে ওনাদের ঠিকমতো ট্রেনিং না দিয়ে পথে নামানো হলো কেন?

টয়লেটের ব্যবস্থা কি করা হয়েছে নারী চালক ও কন্ডাকটরদের জন্য? তাদের পার্সোনাল সিকিউরিটির কী অবস্থা সেটাও দেখতে হবে। দরকার হলে আরও একমাস পরে গোলাপি বাস রাস্তায় নামতো। নারী পরিবহনকর্মীরা যদি তাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেন, তাহলে পরিবহন খাতে তাদের সংখ্যা বাড়বে। অবশ্য নারী বাস চালু করার মাধ্যমে রাষ্ট্র স্বীকার করছে যে গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা একটি আলাদা বড় সমস্যা। এরপরের প্রশ্ন, গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা বিষয়ক নানাধরনের সমস্যা আছে, কিন্তু শুধু নারী-নির্দিষ্ট বাস চালু করলেই কি এই সমস্যাগুলোর সমাধান হবে?

গণপরিবহনে নারীরা ঠিক কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তা নিয়ে গবেষণা করেছে ‘ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ’ ২০২৪ সালে। জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৯ শতাংশ নারীযাত্রী গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬০ শতাংশ মানসিকভাবে ট্রমাগ্রস্ত এবং প্রতি ছয় জন নারী যাত্রীর মধ্যে প্রায় একজন প্রতিদিন যৌন হয়রানির মুখোমুখি হন। এগুলো সহ্য করার পরও নানা কারণে নারীরা গণপরিবহন ব্যবহার করতে বাধ্য হন।

নারীর জন্য আলাদা বাস দরকার এ জন্য যে এতে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা বাড়বে, বাসে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, যৌন হয়রানি বা পুরুষ যাত্রী ও কন্ডাকটরদের কাছ থেকে অস্বস্তির ঝুঁকি কমতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অনুভূতিও বাড়বে। যেসব নারী, নিয়মিত হয়রানির অভিজ্ঞতার কারণে ট্রমার মধ্যে থাকেন, তাদের এক ধরনের নিরাপত্তা দেবে এই বাস। এককথায় বলা যায়, নারীর চলাচল সহজ ও নিরাপদ হবে।

তেমই এর বিপক্ষেও যুক্তি আছে। নারী-নির্দিষ্ট এই বাসের সংখ্যা খুব কম হলে লাভ কী? কারণ, ঢাকাতে নারী কর্মজীবীর সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ লাখ। এর পাশাপাশি আছেন অসংখ্য ছাত্রী। এই স্বল্প সংখ্যক বাস বড় এই অংশের চাহিদা পূরণ করতে পারবে না।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অফিস বা ক্লাসের সময় নির্ধারিত গোলাপি বাস না পেয়ে মেয়েরা অন্যান্য বাসেই চড়ছেন। অফিস টাইমে নারী বাসের জন্য অপেক্ষা করা সম্ভব নয়, নির্ধারিত সময়ে বাস পাওয়াটা এখানে মুখ্য। যেহেতু নির্দিষ্ট রুট, সময় বা গন্তব্যের কারণে অনেক নারী নারী-বাস ব্যবহার করতে পারবেন না। তাই ‘নিরাপদ পরিবহন’ ব্যবস্থা সাধারণ বাসেই থাকতে হবে।

নারীর জন্য বাস নারীকে স্বস্তি দেবে, কিন্তু নারী বাস চালু করলেও সাধারণ বাসে হয়রানি, অতিরিক্ত ভিড়, দুর্বল নজরদারি ও নিরাপত্তার সমস্যা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। তাই শুধু নারী-নির্দিষ্ট কিছু পরিবহন দিয়ে পুরো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

নারী বাস চালুর পরদিনই দেখা গেছে, পুরুষদের কারও কারও মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে নারী যদি হয়রানি এড়াতে চান, তাহলে তারা নারী বাসেই উঠুক। নারী যাত্রীকে না নিয়েই কিছু সাধারণ বাসকে চলে যেতে দেখা গেছে।

এমনিতেই প্রচণ্ড ভিড়ে, ঠেলাঠেলি করে, নারী যাত্রীদের বাসে উঠতে কষ্ট হয়, এরপর যদি এই আচরণ অব্যাহত রাখে তাহলে বিপদ আরও বাড়বে। তাতে নারীকে হেনস্তাকারীরা তাদের আচরণ পরিবর্তন করবে না, বরং ভুক্তভোগীকেই নিজের চলাচল সীমিত করতে বলবে।

গণপরিবহনে আরও লিঙ্গ-বিভাজন তৈরি হওয়ার আশংকা তৈরি হতে পারে। যেমন- সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীবিদ্বেষী পুরুষরা মনে করতে পারে পিংক বাসগুলোই হচ্ছে নারীর বাস, অন্য সব বাস হচ্ছে পুরুষের বাস। এমন ধারণা তৈরি হলে সাধারণ বাসে নারীরা আরও বেশি অস্বস্তিকর আচরণের মুখে পড়তে পারেন। সেজন্য নারী- নির্দিষ্ট পরিবহনের তাৎক্ষণিক সুবিধার পাশাপাশি এর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা জরুরি।

এতক্ষণ আলোচনা করা হলো নারী বাসের সুবিধা ও অসুবিধার দিকটি নিয়ে। এই বিতর্কে না গিয়ে আমাদের ভাবা উচিত, কেন একজন নারীর নিরাপদে চলাচল করার জন্য আলাদা বাসের প্রয়োজন হচ্ছে? আমাদের কি নারী-নির্দিষ্ট বাস দরকার, নাকি সাধারণ বাসে নারীর নিরাপত্তা দরকার?

সাধারণ বাসকে নারীর জন্য নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক করাটা বেশি প্রয়োজন। যানবাহনে আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি করা গেলে কোনও নারীকে নিরাপদে চলাচলের জন্য আলাদা বাস খুঁজতে হবে না। অবশ্যই বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি খুবই চ্যালেঞ্জিং। কারণ এখানে অসংখ্য পুরুষ ধর্ষকামী মন নিয়ে চলাচল করে, যারা নারীর শরীরে হাত দিতে পারলেই যৌন আনন্দ উপভোগ করে।

কিছু পুরুষ প্রকাশ্যে বা মিডিয়ার সামনে পিংক বাস নিয়ে বিদ্বেষমূলক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। কেন কিছু পুরুষ এমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন? হতে পারে তারা নারী-নির্দিষ্ট বাসকে সরাসরি ‘রিভার্স ডিসক্রিমিনেশন’ বা ‘বিপরীত বৈষম্য’ বলে ভাবছেন। বিপরীত বৈষম্য এমন এক পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে কোনও সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর সদস্যের প্রতি তার সংরক্ষিত বৈশিষ্ট্য (যেমন- জাতি, লিঙ্গ বা যৌন পরিচয়) ভিত্তিক বৈষম্যমূলক আচরণ করা। এখানে পুরুষ ভাবছেন নারীকে প্রাধান্য দেওয়ার নীতি বা পদক্ষেপের কারণে পুরুষ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

তারা ‘সমতা’ ও ‘নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ এই দুটোকে এক করে ফেলছেন। এছাড়া নারী বাস চালাবে—এই ধারণাটিই কিছু মানুষের প্রচলিত জেন্ডার ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমনও মানুষ আছেন, যারা মনে করেন এত সমস্যা হলে নারীর বাইরে কাজ করার দরকার কী, ঘরেই থাকুক।

তাই সরকারকে ভাবতে হবে সাধারণ বাসে নারীর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কী হবে? সাধারণ বাসে ওঠার পর কোনও নারীকে যেন আগামীকাল শুনতে না হয়, “এই বাসে কী করছেন? পিংক বাসে যান।”

শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক