জলাশয় হারিয়ে যাচ্ছে, তো হারিয়ে যেতে দিচ্ছি কেন? 

ঢাকার জলাশয় নিয়ে আমাদের আরবান ডেভেলপমেন্ট ডিরেকটরেট বা ইউডিডি একটা গবেষণা চালাচ্ছে, যা ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হবে। প্রথমেই আমি এই উদ্যোগের জন্যে সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। অন্তত এখন আমরা অনুমান নয়, তথ্য দিয়ে বুঝতে পারছি এবং পারবো যে—ঢাকার নদী, খাল, পুকুর ও জলাভূমির নিয়ে আমরা গত আড়াইশত বছরে কী করেছি। এই গবেষণায় ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে আমরা নতুন কিছু তথ্য পেয়েছি, যা নিয়ে আরও অনেক বেশি আলোচনা এবং কাজে নেমে পড়া জরুরি। গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল গভীর দুশ্চিন্তার উদ্রেক করে।

বলা হচ্ছে, ১৭৭৬ সালে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৩৮৩ বর্গকিলোমিটার ভূ-পৃষ্ঠের জলাশয় ছিল। ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে মাত্র ৬৪ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ ২৫০ বছরে আমরা হারিয়েছি প্রায় ৩১৯ বর্গকিলোমিটার জলাশয় ও পানি ধারণের জায়গা। শতাংশের হিসাবে আমাদের জলাশয় হারিয়ে গেছে ৮৩.৪ শতাংশ।

তবে আরেকটা ভয়াবহ তথ্য এই গবেষণায় পাওয়া যাচ্ছে। গত মাত্র ৪৪ বছরেই ঢাকার প্রায় ৬০ শতাংশ জলাশয় হারিয়ে গেছে। এর অর্থটা বোঝার চেষ্টা করি। এর অর্থ হচ্ছে, ঢাকার জলাশয় যে ধ্বংস হয়েছে—তা শুধু শত শত বছরের নগরায়ণের কারণে নয়। গত ‘৪৪ বছর’ মানে হচ্ছে—আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ আইন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, পানি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান—এসব কিছু থাকা সত্ত্বেও আমাদের জলাশয় ত্বরিতগতিতে ধ্বংস হয়ে গেছে।

সংখ্যাগুলো খেয়াল করবেন ঠিক করে। গেলো মাত্র ৪৪ বছরেই ঢাকার ৬০ শতাংশ জলাশয় হারিয়ে গেছে। তাহলে? এত উন্নত হয়ে কী সাধন করলাম? একজন সাধারণ নাগরিকের দৃষ্টিতে একটা সরল প্রশ্ন করি— আমরা যদি জানিই কেন ঢাকার জলাশয় হারিয়ে যাচ্ছে, তাহলে এখনও সেগুলো হারিয়ে যেতে দিচ্ছি কেন? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারবেন না। না রাষ্ট্রপ্রধান, না এমপি-মন্ত্রী, না ইউএনও, না গ্রামের চেয়ারপারসন, না বড় ব্যবসায়ী, না সাধারণ মানুষ। কেউ না।

পানি চলাচলের জায়গা আমরা নিজেরাই বন্ধ করে দিয়েছি তা বেশ পরিষ্কার, যা প্রায় প্রতিদিনই খবরের কাগজে ছাপা হচ্ছে। আমাদের শহরকে দেখতে আমাদের চোখে গ্রাম- গ্রাম মনে হতো, তাই সৌন্দর্যের কথা ভেবেছি। এখনও তাই-ই ভাবি। একটা শহরের খাল, নদী, পুকুর ও জলাভূমি শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়। এগুলো শহরের অঙ্গ।

বৃষ্টি এলে সারা শহরের রাস্তাগুলো খাল হয়ে যায়, নদী হয়ে যায়। এই পানি কোথায়, কোনদিকে যাবে? কোথায় প্রবাহিত হবে? বা কীভাবে এই পানি আবার মাটির নিচে যাবে? যেই পানি খাল-নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আর কোথাও যেতে পারবে না, তা কোথায় জমা হবে? শহরের রাস্তার পানি খাল-নদীতে পৌঁছুবে কেমন করে? আমি বিশেষজ্ঞ নই, তবে সাধারণ মনে বুঝতে পারি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে—যদি আমরা প্রাকৃতিক পানি-ব্যবস্থার কথা ভাবি।

একসময় ঢাকায় প্রায় ৩৪৪ কিলোমিটার খাল ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১২৪ কিলোমিটার হারিয়ে গেছে। কোনাই, পাইনর, পান্ডু, নারাই ও আটি নদীর মতো ঐতিহাসিক জলপথ বিলুপ্তির পথে। ধোলাই খাল একসময় নৌপথ এবং বন্যার পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। আজ তার অস্তিত্বই খণ্ডিত।

সামান্য বৃষ্টিতে ঢাকা ডুবে যায়, তা দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই। পানি তার ঠিক পথেই চলতে পারতো যদি আমরা পানির পথ দখল না করতাম। যেখান দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার কথা, সেখানে আমরা রাস্তা বানিয়েছি, বাড়ি-স্থাপনা তুলেছি। খাল দখল করে সরু করেছি, পুকুর ভরাট করেছি, নদীর তীর দখল করেছি। তারপর পানি জমে গেলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে পাম্প বসানোর কথা ভেবেছি। প্রকৃতির ড্রেনেইজ সিস্টেম নষ্ট করে আমরা মেকানিক্যাল ড্রেনেইজ দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে চাইছি। তাও করা যেতো, যদি বুদ্ধিমানের মতো করা যেতো।

গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর ঢাকাকে বন্যা থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বাঁধ তৈরি করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে সৎ এবং প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু নদী ও খালের প্রাকৃতিক সংযোগ রক্ষার যে সুপারিশ ছিল, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অনেক জায়গায় খাল ও নদীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

বুদ্ধি থাকলে প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে পানি ব্যবস্থাপনা করার চিন্তা আমরা করতাম না। এক জায়গার বন্যা ঠেকাতে গিয়ে যদি আরেক জায়গার পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দিই, তাহলে সমস্যার সমাধান হয় না, সমস্যাটা শুধু তার দিক বদলায়। তো, এখন কী করবো?

প্রথম কাজটা এই গবেষণাই করে দিয়েছে, একটা মানচিত্র তৈরি হয়েছে। ১৭৭৬ সালে কোথায় নদী ছিল, কোথায় খাল ছিল, কোথায় জলাভূমি ছিল, ১৯৯০ সালে কী ছিল, এখন কী আছে—সব কিছু একটা সমন্বিত ডিজিটাল ম্যাপের মধ্যে আনা প্রয়োজন।

তারপর প্রয়োজন কঠিন সিদ্ধান্ত। কঠিন সিদ্ধান্ত ছাড়া হবেই না, যতই বক্তৃতা-বিবৃতি দেন, কিছুই করতে পারবেন না। যেই জলাশয়গুলো এখনও টিকে আছে, সেগুলোকে কেউ যেন আর দখল করে ভরে ফেলতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে পারবেন? ধরুন, কেউ একটা পুকুর আজ ভরাট করে ফেললো এবং আপনি মামলা করলেন? এই ব্যবস্থায় কী জলাশয় রক্ষা হবে? ভাই, ভরাট শুরু হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নিন।

হারিয়ে যাওয়া সব খালগুলো হয়তো এখন ফেরানো সম্ভব নয়। কিন্তু যেগুলো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, সেগুলোর একটা লিস্ট করে কাজে নামুন। এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে খাল কাটা নিয়ে হৈ চৈ শুরু হয়েছিল, তার ফলাফল কী? যেই খালগুলো পুনরুদ্ধার করলে নদীর সাথে সংযোগ তৈরি হবে—সেগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন তো? শুধু খাল খনন করলেই হবে না। খালের মুখ খুলে দিতে হবে। নদীর সঙ্গে খালের সংযোগ ফিরিয়ে দিতে হবে। বিচ্ছিন্ন খাল অনেকটা রক্তনালী কেটে রেখে শরীরে রক্ত চলাচল আশা করার মতো।

দূষণ বন্ধ করতে পারবেন? গৃহস্থালি ও শিল্প-বর্জ্য যদি সরাসরি নদী ও খালে পড়তেই থাকে, তাহলে খাল উদ্ধার করে লাভ কী? আমরা কী একটা মৃত খাল খনন করে আরেকটা দূষিত খাল তৈরি করতে চাই?

অনেক বছর ধরে আমরা দেখছি যে দেশ এবং রাজধানীর জলাশয় রক্ষার দায়িত্ব একের অধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। এটা একটা মস্ত বড় বোকামি। এটা করলে থাকলে জবাবদিহি থাকে না। কোন খাল কার, কে পরিষ্কার করবে, কে দখল ঠেকাবে, কে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করবে, তা ঠিক থাকে না।

আমরা সাধারণ মানুষেরা কে কী করছে তা জানতে চাই এবং প্রতিকার চাই। আমরা চাই যে যেই গবেষণাটা ইউডিডি চালাচ্ছে, তা যেন আরেকটা রিপোর্ট হয়ে না থাকে। গবেষণা শেষ হবে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে। শেষ হলে আমরা হয়তো একটা ম্যাপ পাবো, আরও সংখ্যা জানতে পারবো, কোথায় কী হারিয়েছি তার বিস্তারিত তালিকাও পাবো। তারপর কী হবে?

আমাদের সমস্যা শনাক্ত করার গবেষণার অভাব সবসময় আমাদের প্রধান সমস্যা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা সমস্যাটা জানি, কারণ জানি সমাধানও জানি। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারি না, অথবা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করি না।

ঢাকার জলাশয়ের ক্ষেত্রেও তাই হওয়ার ভয় আছে। আর তাই এই গবেষণার সাফল্য ৮৩.৪ শতাংশের সংখ্যাটা বের করা নয়। এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে, যদি এটা ঢাকার বাকি ১৬.৬ শতাংশ জলাশয়কে বাঁচাতে পারে।

১৭৭৬ সালের ঢাকা আমরা ফেরত পাবো না। হারিয়ে যাওয়া সব নদী-খালও হয়তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু যেগুলো এখনো আছে, সেগুলো তো আমরা বাঁচাতে পারি। এখন শক্ত সিদ্ধান্ত না নিলে আরও কয়েক বছর পর আরেকটা গবেষণা করে আমরা বলবো যে, ঢাকা তার ৯৫ শতাংশ জলাশয় হারিয়েছে?

কঠিন সিদ্ধান্ত নিন। না নিতে পারলে বক্তৃতা-বিবৃতি বন্ধ করুন। যেমন চলছে, তেমনই চলুক এবং ঢাকাসহ দেশের সব জলাশয় ধ্বংস হয়ে যাক।

[এই লেখাটা ওয়াটারএইডের দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক প্রয়াত ডা. খায়রুল ইসলামের প্রতি উৎসর্গীকৃত]

ইকরাম কবীর: কথাসাহিত্যিক

ekabir@gmail.com.