ভাতের বদলে ভ্যানিশিং ক্রিম!

দেশের মানুষ বিদ্যুৎ চায়, গ্যাস চায়। কৃষকেরা সার চান, ব্যবসায়ীরা নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি চান। তরুণেরা চাকরি চান, আর সাধারণ মানুষ চান বাজারে গিয়ে অন্তত সংসারের হিসাবটা যেন পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে। সরকার অবশ্য আরও বড় কিছু ভাবছে। আকাশ নিয়ে ভাবছে। বাংলার আকাশে এখন পাখি কম, তাই বিমানই ভরসা।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিক করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি নতুন বিমান কেনার চূড়ান্ত চুক্তি হয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল সই করা এই চুক্তির তালিকামূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। প্রথম বিমান আসার কথা ২০৩১ সালের নভেম্বরে এবং পুরো সরবরাহ শেষ হওয়ার কথা ২০৩৫ সালের মধ্যে।

এখানেই অবশ্য গল্প শেষ নয়। মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরকালে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সমঝোতার আওতায় বিলিয়ন ডলার মূল্যের আরও বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে অতিরিক্ত কতটি বিমান কেনা হবে, কোন মডেলের হবে, মোট মূল্য কত এবং বিষয়টি আনুষ্ঠানিক ক্রয়চুক্তিতে পরিণত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত প্রকাশিত হয়নি। অর্থাৎ ১৪টি বিমান নিশ্চিত, আরও বিমানের সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সম্ভাবনার অঙ্কটি এখনও কুয়াশায়। কুয়াশা বিমানের জন্য ভালো না হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ঘোষণায় বেশ কাজে লাগে।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, বিমান কেনার দরকার কী? অবশ্যই দরকার থাকতে পারে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর পুরোনো হলে তা আধুনিক করতে হবে। আন্তর্জাতিক রুট বাড়াতে হলে নতুন উড়োজাহাজ লাগবে। জ্বালানি সাশ্রয়ী বিমান হলে পরিচালন ব্যয় কমতে পারে, যাত্রীসেবা উন্নত হতে পারে, নতুন রুট খুলে আয়ও বাড়তে পারে। কাজেই বিমান কেনার সিদ্ধান্তকে শুধু অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, এই কেনাকাটা কতটা বাণিজ্যিকভাবে যৌক্তিক, কতটা লাভজনক এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কতটা উপকারী?

এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন আমরা উন্নয়ন ও ভোগের সম্পর্কটি দেখি। একসময় বিনয় ঘোষ তাঁর ‘কালপেঁচার নকশা’য় ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন, ভাতের বদলে ভ্যানিসিং ক্রিম মাখার কথা। পেটে ভাত নেই, কিন্তু মুখে ক্রিম থাকলে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য খিদের কথা ভুলে থাকা যায়। তাঁর সেই ব্যঙ্গের মধ্যে ভোগবাদী বাজারব্যবস্থার একটি গভীর সমালোচনা ছিল। মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধান না করে তাকে সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পণ্য দেওয়া যায়।

আজকের করপোরেট সংস্কৃতিতেও সেই প্রবণতা কমবেশি দেখা যায়। আয় কম, কিন্তু রং ফর্সা করার ক্রিম আছে। চাকরি নেই, কিন্তু চুল সুন্দর রাখার শ্যাম্পু আছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু শরীরের দুর্গন্ধ দূর করার পারফিউম আছে। ঘরে খাবারের হিসাব মেলে না, কিন্তু আরামদায়ক শেভের জন্য উন্নতমানের রেজার আছে। এসব পণ্য মানুষের ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটায়, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এগুলো আয়, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা বা জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো মৌলিক সমস্যার সমাধান করে না। ফলে প্রশ্ন থাকে, আমরা সমস্যার সমাধান করছি, নাকি সমস্যাকে কিছুক্ষণের জন্য আড়াল করার আরও উন্নত উপায় আবিষ্কার করছি?

বোয়িংয়ের ক্ষেত্রেও অবশ্য সরাসরি এমন তুলনা টানা ঠিক হবে না। একটি আধুনিক বিমান কোনো প্রসাধনী নয়। এটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি এয়ারলাইন্সের ব্যবসায়িক সম্পদ। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটি আয় বাড়াতে পারে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ উন্নত করতে পারে এবং বিমান পরিবহন খাতে দেশের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়। বিমানটি কি বাংলাদেশের প্রয়োজন মেটাবে, নাকি প্রয়োজনের তালিকায় বিমানকে এমনভাবে বসানো হচ্ছে যে মাটির সমস্যাগুলো কিছুক্ষণের জন্য আড়ালে পড়ে যাবে?

কারণ বিমানের সঙ্গে আরেকটি বিষয় উড়ে এসেছে। সেটি হলো আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক। বোয়িং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে শুল্ক আলোচনা যখন তীব্র হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং বিমানসহ বিভিন্ন পণ্য কেনার মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে। ফলে বোয়িং কেনার মধ্যে শুধু বিমান পরিবহন নয়, বৃহত্তর বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সমীকরণও আছে।

আমেরিকার স্বার্থ নিয়ে ঠাট্টা করার কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্র তার শিল্প ও ব্যবসার স্বার্থ দেখবে, সেটিই স্বাভাবিক। বোয়িং বিমান বিক্রি করবে, মার্কিন শিল্প উপকৃত হবে। প্রশ্নটি বরং বাংলাদেশের দিকে। বাংলাদেশ নিজের স্বার্থ কতটা হিসাব করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?

বিমান কেনা হলে শুধু বিমানের দাম দিতে হয় না। জ্বালানি লাগে, রক্ষণাবেক্ষণ লাগে, যন্ত্রাংশ লাগে, বিমা লাগে। ঋণ নিয়ে কিনলে কিস্তি ও সুদ দিতে হয়। বিমানটি লাভজনকভাবে পরিচালনা করা না গেলে সেই খরচ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ে। আর সেই বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়তে পারে। ১৪টি বিমানের অর্থায়নে ঋণের বড় ভূমিকা থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক এ বিষয়ে সহায়তা করবে বলে জানানো হয়েছে। সার্বভৌম গ্যারান্টিও থাকবে। অর্থাৎ আজ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এর আর্থিক প্রভাব বহু বছর ধরে থাকবে।

তাই সাধারণ মানুষের প্রশ্ন খুব সরল। বিমান কেনা যদি ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক হয়, কিনুন। কিন্তু লাভের হিসাবটা দেখান। কত বছরে বিনিয়োগের টাকা উঠবে? কোন রুটে বিমানগুলো চলবে? বছরে কত আয় হবে? পরিচালন ব্যয় কত? ঋণের সুদ কত? সম্ভাব্য লোকসান কত? বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আর্থিক সক্ষমতা কতটা? এসব প্রশ্নের উত্তর থাকলে জনগণও বুঝবে কেন এত বড় বিনিয়োগ জরুরি।

আর যদি এর সঙ্গে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি যুক্ত থাকে, তাহলে আরও কিছু প্রশ্ন আসে। বাংলাদেশ কি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বেশি পণ্য প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে? বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য কী সুবিধা তৈরি হচ্ছে? মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ছে কি? প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ছে কি? নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি? কারণ শুধু আমেরিকা থেকে কেনা নয়, আমেরিকায় বিক্রি করাটাও গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিমান কিনি, তাহলে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য বিক্রির পথও কি আরও প্রশস্ত হবে? সেটিই হওয়া উচিত বুদ্ধিমান বাণিজ্যনীতির প্রশ্ন। একজন শুধু বিক্রি করবে আর অন্যজন শুধু কিনবে, সেটি বন্ধুত্বের চেয়ে ব্যবসায়িক সম্পর্কের কাছাকাছি। বন্ধুত্ব যত গভীরই হোক, ব্যাংকের কিস্তি আবেগ বোঝে না। বিমানের জ্বালানি কূটনৈতিক সৌজন্যে আসে না।

তাই বোয়িং কেনার বিরোধিতা করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বচ্ছতা, প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার। বিমান বহর আধুনিক করার প্রয়োজন থাকলে করুন। কিন্তু একই সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, গ্যাস সরবরাহ, কৃষকের সার, শিল্পের জ্বালানি এবং কর্মসংস্থানের প্রশ্নও সামনে রাখুন। রাষ্ট্রের সম্পদ সীমিত। তাই কোন খাতে কত টাকা আগে যাবে, সেটিই আসল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত।

দেশের মানুষ এখনো বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষা করে। শিল্প উদ্যোক্তা গ্যাসের জন্য চিন্তা করেন। কৃষক সার নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন। তরুণ চাকরির জন্য ঘুরে বেড়ান। সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে পকেটের সঙ্গে প্রয়োজনের লড়াই করেন। এই বাস্তবতার মধ্যে নতুন বিমান আসার খবর আনন্দের হতে পারে। কিন্তু সেটি যেন বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলোকে আড়াল করার ভ্যানিসিং ক্রিম না হয়ে যায়।

গরমের রাতে কোনো একটি বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। ঘরে অন্ধকার। রান্নাঘরে গ্যাস নেই। কৃষক পরদিন সার পাবেন কি না জানেন না। টেলিভিশনে তখন খবর চলছে, বাংলাদেশ আরও কয়েক বিলিয়ন ডলারের বোয়িং কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ঘরের একজন বললেন, ‘দেশ এগোচ্ছে।’
অন্যজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায়?’ উত্তর এলো, ‘আকাশে।’

রসিকতাটা এখানেই। উন্নয়ন যদি শুধু আকাশে দেখা যায়, কিন্তু মাটিতে তার আলো না পড়ে, তাহলে মানুষ একসময় প্রশ্ন করবেই, এই উন্নয়ন কার জন্য?

আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও ভালো হোক। বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ুক, মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ুক, প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ুক, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হোক। দুই দেশের সম্পর্ক এমন জায়গায় যাক যেখানে বাংলাদেশ শুধু আমেরিকা থেকে কিনবে না, আমেরিকার কাছেও আরও বেশি বিক্রি করবে। সেটিই হবে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক।

বোয়িংয়ের বিমান আকাশে উঠবে, এটাই তার কাজ। কিন্তু বাংলাদেশের উন্নয়নকে শুধু আকাশে উড়লে চলবে না। তাকে মাটিতেও হাঁটতে হবে। মানুষের ঘরে আলো দিতে হবে, শিল্পে জ্বালানি দিতে হবে, কৃষকের হাতে সার দিতে হবে, তরুণের হাতে কাজ দিতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বিমান বহর নয়, তার মানুষ।

বিমান যত উঁচুতেই উড়ুক, তার শেষ গন্তব্য মাটিই। বাংলাদেশের উন্নয়নেরও। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক আকাশ স্পর্শ করুক, ঝাঁকে ঝাঁকে বোয়িং উড়ুক, বাণিজ্য বাড়ুক। শুধু দেশের মাটির মানুষকে যেন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আকাশের উন্নয়ন দেখতে না হয়!

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট