খেজুর-শসা-ইয়াবায় খুনের রহস্য সমাধান! সত্যিই কি তাই? 

চিররঞ্জন সরকার
২৪ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৫৮আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ২০:২৮

রংপুরে একই পরিবারের চার জনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। এটা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিরই নমুনা। গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও ১৩ বছরের ছেলে আয়ুশ—একটি পরিবারের চারটি প্রাণ এক রাতে নিভে যাওয়া কোনও সাধারণ অপরাধ নয়। হত্যাকারী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য উদ্ঘাটন করা পুলিশের দায়িত্ব।

কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশে অনেক সময় পুলিশ তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তদন্তের ফলাফল ঘোষণা করে ফেলে। তারপর শুরু হয় ঘোষিত ফলের সঙ্গে তথ্য-প্রমাণ মেলানোর চেষ্টা। অর্থাৎ আগে গল্প, পরে প্রমাণ; আগে আসামি, পরে আলামত; আগে সংবাদ সম্মেলন, পরে তদন্ত। রংপুরের এই ঘটনাতেও তাই প্রশ্ন করার যথেষ্ট কারণ আছে।

পুলিশের ভাষ্য, দুই তরুণ—সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করেন। এরপর তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও একে একে হত্যা করেন। পরে ডাকাতির নাটক সাজাতে ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে দেন। পুলিশ আরও বলেছে, হত্যার পর তারা গোসল করেন, ফ্রিজ থেকে খেজুর ও শসা খান, ইয়াবা সেবন করেন এবং যাওয়ার আগে আলমারি-ড্রয়ার খুলে জিনিসপত্র ছড়িয়ে দেন। খেজুরের বিচি, ইয়াবার সরঞ্জাম ও স্বর্ণালংকারসহ নানা আলামত থেকে তাদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।

শুনতে বেশ গোছানো গল্প। এত বেশি গোছানো, সন্দেহটা সেখানেই দানা বাঁধে।

অপরাধ সাধারণত পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ের মতো গোছানো হয় না। বাস্তব অপরাধে থাকে অসংখ্য অজানা, অসংলগ্ন ও পরস্পর-সংঘাতপূর্ণ তথ্য। তদন্তের কাজ সেগুলো যাচাই করে সত্য বের করা। কিন্তু শুরুতেই যদি কাহিনি তৈরি হয়ে যায়, তদন্ত তখন সত্য অনুসন্ধান না হয়ে ঘোষিত কাহিনির পক্ষে প্রমাণ খোঁজার কাজে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আমাদের ইতিহাসে এর ভয়াবহ নজির আছে। ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পর জজ মিয়াকে গ্রেফতার করে যে কাহিনি দাঁড় করানো হয়েছিল, পরে সেটি সাজানো নাটক হিসেবে সামনে আসে। নিরপরাধ মানুষকে ধরে এনে নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায়, নিজেদের মতো মামলা সাজানো কিংবা চাপের কারণে তদন্তকে নির্দিষ্ট দিকে ঠেলে দেওয়া—এসব আমাদের পুলিশি তদন্তের ইতিহাসে অচেনা নয়। তাই পুলিশকে অবিশ্বাস করার জন্য নয়, বরং অতীতের কারণেই আরও বেশি প্রমাণ চাই।

প্রথম প্রশ্ন ডিএনএ নিয়ে। পুলিশ বলেছে, ঘর থেকে খেজুরের বিচি উদ্ধার করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

তাহলে আসামিদের শনাক্ত করা হলো কীভাবে? তাদের লালা বা ডিএনএ নমুনা কখন সংগ্রহ করা হলো? পরীক্ষা কখন হলো?

ফলাফলই বা কখন পাওয়া গেল? যদি পরীক্ষা চলমান থাকে, সেটি ভবিষ্যতের প্রমাণ; বর্তমানের নয়। আর ফল পাওয়া গেলে পুলিশকে বলতে হবে কোন নমুনা, কখন, কোথায় পরীক্ষা হয়েছে এবং ফল কী। ‘খেজুরের বিচি পাওয়া গেছে, তাই আসামি ধরা গেছে’ কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়।

আরও বড় প্রশ্ন হত্যার ধরন নিয়ে। পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী দুই তরুণ চার জনকে একে একে হত্যা করেছে। প্রথমে ৬৫ বছরের গণপতি চক্রবর্তীকে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ, তার চিৎকার শুনে স্ত্রী এলে তাঁকেও হত্যা, এরপর মেয়েকে এবং শেষে ঘুমন্ত ১৩ বছরের ছেলেকে হত্যা।

প্রশ্ন হলো, শারীরিক প্রতিরোধের চিহ্ন কোথায়? একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করা কোনও বোতাম টেপার মতো কাজ নয়। ধস্তাধস্তি, আঁচড়, নখের দাগ, কাপড় ছেঁড়া বা অন্য আঘাতের আলামত থাকার কথা। স্ত্রী চিৎকার শুনে বেরিয়ে এলেন, মেয়ে পরে এলেন—তারা কি কিছুই বুঝলেন না? কোনও প্রতিরোধ হলো না? দুই হত্যাকারী চার জনকে একে একে এমন নির্বিঘ্নে হত্যা করলো—ফরেনসিক আলামত কি সেই বর্ণনাকে সমর্থন করে?

মেয়ের ক্ষেত্রে গামছার সঙ্গে রশি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কেন? গামছা দিয়ে কাজ হলো না কেন? তার শরীরে প্রতিরোধের চিহ্ন ছিল কি? নখের নিচে ত্বক, রক্ত, চুল বা অন্য জৈবিক আলামত পাওয়া গেছে কি? ছেলেটির ক্ষেত্রেও প্রশ্ন আছে। সে কি ঘুমন্ত ছিল? তার ঘরে ধস্তাধস্তির চিহ্ন ছিল কি? হত্যাকারীরা কি তাকে চিনতো, নাকি সে তাদের দেখে ফেলেছিল? এসবের উত্তর ছাড়া ‘পরিকল্পিত চার হত্যা’ কাহিনি পূর্ণ হয় না।

আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন—ইয়াবা সেবনের জায়গা। পাশের ভবনটি যদি নির্মাণাধীন এবং সেখানে কেউ না থাকে, তাহলে তুলনামূলক নির্জন সেই ভবন ছেড়ে বসতবাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করতে যাওয়ার যুক্তি কী? পুলিশ বলছে, তারা পাশের ভবন থেকে লাফিয়ে ওই বাড়ির ছাদে উঠেছেন। ভবন দুটির উচ্চতা ও অবস্থান কী? বাস্তবে একজন মানুষ কীভাবে সেই লাফ দিতে পারে? ঘটনাস্থল দেখে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন তুলেছেন। পুলিশকে এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে হবে।

এরপর বিদ্যুতের লাইন। বাসার বিদ্যুৎ লাইন কেন কাটা ছিল? কখন কাটা হয়েছিল? কে কেটেছিল? হত্যার আগে না পরে? এটি কাকতালীয় হলে সেটিও তদন্তে পরিষ্কার হওয়া দরকার।

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নতুন বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে গত দেড় বছর ধরে যারা চাঁদার জন্য হুমকি দিচ্ছিল বলে পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, সেই বিষয়ে তদন্ত কতদূর? তাদের নাম-পরিচয় কী? জিজ্ঞাসাবাদ হয়েছে কি? নিহত পরিবারের সঙ্গে তাদের বিরোধ ছিল কি? কারণ ‘ইয়াবা সেবনে বাধা’ একটি সম্ভাব্য মোটিভ হতে পারে, কিন্তু সেটিই একমাত্র মোটিভ—এ কথা বলার আগে অন্য সম্ভাবনা বাদ দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আটক দুজনের বিরুদ্ধে বস্তুগত প্রমাণ কী? তাদের পোশাকে বা শরীরে নিহতদের রক্ত কিংবা ডিএনএ আছে? নখে আঁচড়ের চিহ্ন? ঘটনাস্থলে আঙুলের ছাপ বা পায়ের ছাপ? মোবাইলের লোকেশন, কল রেকর্ড বা সিসিটিভি ফুটেজ? বিশেষ করে শুক্রবার দুপুরে তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে আশপাশের কোনও ক্যামেরায় তাদের দেখা গেছে কিনা, তা গুরুত্বপূর্ণ। হত্যার আগে ও পরে তাদের গতিবিধিও যাচাই করতে হবে।

পুলিশ বলেছে, হত্যার পরও তারা বাড়িতে ছিলেন, গোসল করেছেন, খেজুর-শসা খেয়েছেন, ইয়াবা সেবন করেছেন। যদি সত্যি হয়, তাহলে ঘটনাস্থলে তাদের উপস্থিতির শক্তিশালী আলামত থাকার কথা। ফরেনসিক পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে, সেটিই আসল প্রশ্ন।

‘স্বীকারোক্তি’ নিয়েও সতর্ক থাকা দরকার। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে কেউ অপরাধ স্বীকার করেছে—এটি তদন্তের শেষ কথা নয়। স্বীকারোক্তির সঙ্গে স্বাধীন, বস্তুগত ও ফরেনসিক প্রমাণের মিল থাকতে হবে। ভয়, চাপ, নির্যাতন, প্রলোভন বা মানসিক বিপর্যয়ে পাওয়া স্বীকারোক্তি অবিশ্বস্ত হতে পারে। আমাদের ইতিহাসে এর উদাহরণ কম নেই। তাই পুলিশকে বলতেই হয়—স্বীকারোক্তি নয়, প্রমাণ দেখান।

এখানে পুলিশকে শত্রু ভাবার প্রশ্ন নেই। বরং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থেই প্রশ্ন করা হচ্ছে। পুলিশ যদি সত্যিই সঠিক আসামি ধরে থাকে, তবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই তাদের শক্তি হবে।

পুলিশের সংবাদ সম্মেলন আদালত নয়। গ্রেফতার মানেই অপরাধী নয়। স্বীকারোক্তি মানেই সত্য নয়। আলমারি-ড্রয়ার খোলা দেখলেই ডাকাতির নাটক প্রমাণিত হয় না। চার জনের মৃত্যুর প্রতি সবচেয়ে বড় অবিচার হবে, যদি প্রকৃত হত্যাকারীদের খোঁজার বদলে দ্রুত একটি সুবিধাজনক গল্প দাঁড় করিয়ে তদন্ত শেষ করে দেওয়া হয়।

আটক দুই তরুণই যদি অপরাধী হন, তাদের বিরুদ্ধে আদালতে টেকসই প্রমাণ হাজির হোক। আর যদি তারা নির্দোষ হন, তাদের যেন আরেকটি ‘জজ মিয়া’ বানানো না হয়। তদন্তের উদ্দেশ্য আসামি বানানো নয়; সত্য বের করা।

পুলিশের হাতে ক্ষমতা আছে, গ্রেফতারের ক্ষমতা আছে, সংবাদ সম্মেলনের মাইকও আছে। কিন্তু সত্যের মালিকানা নেই।

সত্য কোনও ব্রিফিং মেনে চলে না। বিশেষ করে যে প্রশ্নগুলো সংবাদ সম্মেলনেই উঠেছে, সেগুলোর উত্তর প্রকাশ্যে দেওয়া জরুরি। কোনও আলামত সত্যিই কীভাবে আসামিদের কাছে পৌঁছালো, হত্যার সময় তাদের অবস্থান কী ছিল, এবং ঘটনাস্থলের প্রতিটি বস্তু তাদের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত—এসবের নিরপেক্ষ ব্যাখ্যাই তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করবে। এখানে অনুমান নয়, দরকার পরীক্ষিত তথ্য ও স্বচ্ছতা।

রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডে তাই এখন সবচেয়ে জরুরি—পুলিশের গল্প নয়, প্রমাণের গল্প। প্রমাণ যদি পুলিশের বক্তব্যকে সমর্থন করে, আমরা পুলিশের পাশেই থাকবো। কিন্তু প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত প্রশ্ন করবো। আরও প্রশ্ন করবো। কারণ প্রশ্ন করা পুলিশের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়— ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
এআই ব্যবহারে আরও দক্ষ হবে সরকার, সহজ হবে নাগরিক সেবা: জনপ্রশাসন উপদেষ্টা
এআই ব্যবহারে আরও দক্ষ হবে সরকার, সহজ হবে নাগরিক সেবা: জনপ্রশাসন উপদেষ্টা
কীভাবে মিলে গেলো পুলিশ কর্মকর্তা ও আসামির শার্ট?
কীভাবে মিলে গেলো পুলিশ কর্মকর্তা ও আসামির শার্ট?
‘শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষকদের শেখার মানসিকতা রাখতে হবে’ 
‘শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষকদের শেখার মানসিকতা রাখতে হবে’ 
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার ফরম পূরণ কবে থেকে, ফি কত
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার ফরম পূরণ কবে থেকে, ফি কত
সর্বশেষসর্বাধিক