ক্ষমতা, ক্ষমতা প্রদর্শন ও অক্ষমতা! 

ক্ষমতা জিনিসটা ভারী মজার। যার আছে, সে মনে করে— আরও একটু থাকলে ভালো হতো। যার নেই, সে মনে করে— আহা, যদি একটু থাকতো! আর যার অনেক আছে, সে মনে করে— পৃথিবীর সবাইকে জানানো দরকার যে তার আছে। অর্থাৎ ক্ষমতা থাকার চেয়েও বড় বিষয় হলো ক্ষমতা দেখানো।

কবি শঙ্খ ঘোষ অনেক আগেই ক্ষমতা নিয়ে সতর্ক করে গেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, ক্ষমতা থাকা আর ক্ষমতা দেখানো এক জিনিস নয়। ক্ষমতাবান হওয়া দোষের নয়, কিন্তু ক্ষমতার দেখনদারি বিপজ্জনক। তবে কবি বোধহয় আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে গেলে কথাটা আরও একটু সংশোধন করতেন। বলতেন, ক্ষমতা দেখানোই যদি না হলো, তাহলে ক্ষমতা রাখলেন কেন?

আমাদের দেশে ক্ষমতা অনেকটা নতুন জামার মতো। ঈদের দিন নতুন জামা পরে ঘরে বসে থাকলে তো আর নতুন জামার মান থাকে না। অন্তত তিনজনকে বলতে হবে, ‘কেমন লাগছে?’ ক্ষমতার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। ক্ষমতা আছে, এটা গোপন রাখলে চলবে না। ট্রাফিক পুলিশকে জানাতে হবে, অফিসের পিয়নকে জানাতে হবে, থানাকে জানাতে হবে, প্রতিবেশীকে জানাতে হবে। সুযোগ পেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও জানাতে হবে। কারণ ক্ষমতা এমন এক বস্তু, যা ব্যবহার না করলে মরিচা ধরে।

আমাদের সমাজে অবশ্য সবাই ক্ষমতাবান নন। এই সৌভাগ্য সবার কপালে জোটে না। কেউ ক্ষমতাবান, কেউ ক্ষমতাহীন। আর ক্ষমতাহীন মানুষের আরেকটি চমৎকার পরিচয় আছে, সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষ আবার বড় বিপজ্জনক প্রাণী। সে আইন মানে, ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়ায়, লাইনে দাঁড়ায়, বিদ্যুৎ বিল দেয়, কর দেয়, বাসে ভাড়া দেয়। ফলে তাকে খুব একটা ভয় পাওয়ার কারণ নেই। কিন্তু ক্ষমতাবান মানুষ? তিনি লাইনে দাঁড়াবেন কেন? লাইন তো সাধারণ মানুষের জন্য। লাল বাতিতে গাড়ি থামাবেন কেন? লাল বাতি তো অন্যদের জন্য। ট্রাফিক পুলিশকে সালাম দেবেন কেন? সালাম নেওয়ার মানুষ তো তিনি নিজেই!

এই যে ক্ষমতার সঙ্গে আচরণের পরিবর্তন, এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় রম্যরস। যদিও রসটা ভুক্তভোগীর কাছে সাধারণত খুব একটা রম্য লাগে না। কেউ ট্রাফিক পুলিশকে ক্ষমতা দেখান। কেউ সরকারি অফিসে গিয়ে বলেন, ‘উপর থেকে কথা হয়েছে।’ ওপরটা কোথায়, তা কেউ জানে না। কিন্তু ‘ওপর থেকে’ কথাটার এমন এক অলৌকিক ক্ষমতা আছে যে, নিচের সব দরজা সঙ্গে সঙ্গে খুলে যায়।

কেউ আবার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরতদের ওপর লাঠি চালিয়ে ক্ষমতার প্রমাণ দেন। কেউ রাজনৈতিক পরিচয়কে এমনভাবে ব্যবহার করেন, যেন দলীয় পদটি রাষ্ট্রের আজীবন লাইসেন্স। কেউ সাংবাদিকতার পরিচয় দেন। কেউ আমলাতন্ত্রের। কেউ ব্যবসায়িক পরিচয়ের। কেউ আবার শুধু ‘ভাইয়ের লোক’। এটাও আমাদের দেশে যথেষ্ট শক্তিশালী একটি পদ।

‘আপনি জানেন আমি কে?’ এই প্রশ্নটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল প্রশ্নগুলোর একটি। এর উত্তর না জানলেও সমস্যা নেই। প্রশ্নকারী নিজেই উত্তর দিয়ে দেন, ‘আমি অমুকের লোক।’ ব্যস। আইন তখন একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। সমস্যাটা এখানেই। ক্ষমতা যখন দায়িত্ব না থেকে পরিচয়ের অলংকার হয়ে যায়, তখন মানুষ ক্ষমতা দিয়ে কাজ করার চেয়ে ক্ষমতা দেখিয়ে কাজ আদায় করতে বেশি আগ্রহী হয়।

ফলে সমাজে একটা অদ্ভুত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, কে কত বড় ক্ষমতা দেখাতে পারেন। রাজনীতিবিদ দেখাচ্ছেন রাজনৈতিক ক্ষমতা। আমলা দেখাচ্ছেন প্রশাসনিক ক্ষমতা। ব্যবসায়ী দেখাচ্ছেন অর্থনৈতিক ক্ষমতা। সাংবাদিক দেখাচ্ছেন পরিচিতির ক্ষমতা। মাস্তান দেখাচ্ছেন পেশিশক্তি। আর ফেসবুক ব্যবহারকারী দেখাচ্ছেন কমেন্ট করার ক্ষমতা।

ফেসবুকের কমেন্টবক্স অবশ্য আলাদা এক রাষ্ট্র। সেখানে সবাই প্রধানমন্ত্রী, সবাই বিচারপতি, সবাই সেনাপ্রধান, সবাই অর্থমন্ত্রী এবং সবাই জাতীয় দলের নির্বাচক। তবে বাস্তব জীবনে ক্ষমতার এই প্রদর্শনী কখনও কখনও হাস্যকর থেকে ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

ক্ষমতার গণিতটাও বেশ চমৎকার। আপনার কণ্ঠস্বর যত দুর্বল, আপনার অপরাধ তত বড়। আর আপনার হাত যত শক্তিশালী, আপনার যুক্তি তত সঠিক। আর ক্ষমতা যখন যুক্তির জায়গা দখল করে, তখন যুক্তির সঙ্গে লাঠির প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে লাঠি অনেক সময় বিতর্কে জয়ী হয়।

অপরদিকে, ঢাকার রাজপথে উল্টোপথে চলা এক ‘ক্ষমতাবান ব্যক্তির গাড়ির’ প্রতি ট্রাফিক পুলিশের আচরণও ক্ষমতার আরেকটি সংস্করণ দেখিয়েছে। উল্টোপথে গাড়ি চালানো হয়েছে, এটা সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, পুলিশ সেটা কেন ধরলো! আমাদের সমাজে আইন ভাঙার চেয়ে আইন প্রয়োগ করার চেষ্টা করাটাই অনেক সময় বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়।

এখানে কবি সাহিত্যিকদের ত্রিকালদর্শী বলা হয়। তাঁরা অনেক সময় এমন কিছু দেখতে পান, যা আমরা দেখতে পাই না। শঙ্খ ঘোষের ক্ষমতা নিয়ে সতর্কবাণীও যেন আজকের বাংলাদেশের জন্য লেখা কোনও ব্যঙ্গ রচনা। তিনি হয়তো ভাবেননি, তাঁর কথাকে একদিন এত মানুষ এত নিষ্ঠার সঙ্গে বাস্তবায়ন করবে!

তবে ক্ষমতারও একটা ভালো দিক আছে। ক্ষমতা দিয়ে অনেক ভালো কাজ করা যায়। একজন ক্ষমতাবান মানুষ চাইলে অন্যের অক্ষমতা দূর করতে পারেন। কারও চিকিৎসা করাতে পারেন, কারও চাকরি দিতে পারেন, কারও অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারেন, অন্যায় থামাতে পারেন।

কিন্তু ক্ষমতার মালিকানা আর ক্ষমতার চরিত্র এক জিনিস নয়। একজন ক্ষমতা পেয়ে নিজেকে ‘সক্ষম’ ভাবতে পারেন। আরেকজন ক্ষমতা পেয়ে নিজেকে ‘ক্ষমতাশালী’ ভাবতে পারেন। প্রথমজন ক্ষমতা ব্যবহার করেন। দ্বিতীয়জন ক্ষমতা প্রদর্শন করেন। প্রথমজনের কাছে ক্ষমতা দায়িত্ব। দ্বিতীয়জনের কাছে ক্ষমতা মাইক। আর মাইক হাতে পেলে আমাদের দেশের মানুষ সাধারণত ভলিউম কমান না। এই সত্যটি বোঝানোর জন্য রেললাইনের সেই বিখ্যাত গল্পটি মনে করা যাক।

রেললাইনের একজন লাইনম্যান বা গেটকিপার ডিউটিতে ছিলেন। তাঁর শ্যালক গ্রাম থেকে বেড়াতে এসেছে। ওই লাইনে দিনে মাত্র দুটি ট্রেন চলে। দীর্ঘ সময় দুলাভাইকে কর্মহীন বসে থাকতে দেখে শ্যালক একদিন জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কাজটা কী?’

দুলাভাই মুচকি হেসে বললেন, ‘জানিস, আমার অনেক ক্ষমতা। চাইলেই আমি এই বিশাল ট্রেনটাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিতে পারি।’

অর্থাৎ ট্রেন যাবে কি যাবে না, সেটা তাঁর ওপর নির্ভর করে। ফাজিল শ্যালক দুলাভাইকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল, ‘তাহলে ট্রেন থামিয়ে দেখাও।’ মাথামোটা দুলাভাইও চ্যালেঞ্জ লুফে নিলেন। ট্রেন আসছে। দুলাভাই সবুজ পতাকা দেখিয়ে চলে যাওয়ার সংকেত দেওয়ার পরিবর্তে লাল পতাকা দেখালেন। যথারীতি ট্রেন থেমে গেল।

দুলাভাইয়ের ক্ষমতা দেখে শ্যালক তো অবাক! কিন্তু ট্রেনে যাচ্ছিলেন পুলিশের এক বড়কর্তা। তিনি নেমে এসে ট্রেন থামানোর কারণ জানতে চাইলেন। সত্যি কথাটা জানার পর কর্মকর্তা ক্ষিপ্ত হলেন এবং দুলাভাইরূপী লাইনম্যানকে কষে একটা থাপ্পড় লাগিয়ে ট্রেনে উঠে চলে গেলেন।

হতবিহ্বল শ্যালক তার ‘ক্ষমতাধর’ দুলাভাইয়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। দুলাভাই তখন একটা কঠিন, শুষ্ক হাসি দিয়ে বললেন, ‘বুঝলে কি না, আমি আমার ক্ষমতা দেখিয়েছি আর ওই স্যার তাঁর ক্ষমতা দেখিয়েছেন!’

গল্পটি শুনে হাসি পায়। কিন্তু একটু ভেবে দেখলে হাসিটা কোথায় যেন আটকে যায়। কারণ এই দুনিয়ায় যার যেখানে যতটুকু ক্ষমতা, সে তা একটু বেশি করেই প্রয়োগ করতে চায়। লাইনম্যান ট্রেন থামান। বড়কর্তা লাইনম্যান থামান। ট্রাফিক পুলিশ গাড়ি থামান। গাড়ির মালিক পুলিশ থামাতে চান।

রাজনীতিবিদ প্রশাসন থামান। প্রশাসন সাধারণ মানুষ থামায়। আর সাধারণ মানুষ? সাধারণ মানুষ সব দেখে চুপ করে থাকে। কারণ তার হাতে লাল পতাকা নেই। তবে তার হাতে মোবাইল ফোন আছে। তাই সে রাতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়, ‘দেশটা কোথায় যাচ্ছে?’ পরদিন সকালে আবার সবাই যার যার ক্ষমতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় রসিকতা।

আমরা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে, যতক্ষণ পর্যন্ত ক্ষমতাটা আমাদের হাতে না আসে। ক্ষমতা পেলে আমরা খুব দ্রুত নীতিবাদী থেকে ব্যবহারিক, ব্যবহারিক থেকে বাস্তববাদী, আর বাস্তববাদী থেকে ক্ষমতাবাদী হয়ে যাই। তাই আসল সমস্যা ক্ষমতায় নয়। সমস্যা হলো, ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর আমরা আয়নায় কাকে দেখতে পাই। একজন মানুষকে? নাকি একজন ক্ষমতাবানকে?

কারণ মানুষ ক্ষমতা ব্যবহার করলে সমাজ বাঁচে। আর ক্ষমতা মানুষকে ব্যবহার করতে শুরু করলে সমাজকে শুধু লাল পতাকা দেখিয়ে থামিয়ে রাখা যায় না। তখন পুরো ট্রেনটাই লাইনচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট